উপসাগরীয় অঞ্চলে আপাতত থেমে আছে পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ। বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত ‘ভঙ্গুর’ যুদ্ধবিরতি ভেঙে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান নতুন করে সরাসরি সংঘর্ষে জড়ায়নি। তবে লেবাননে হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েল, যা মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।
এ পরিস্থিতির মধ্যেই সম্ভাব্য শান্তি আলোচনার জন্য ইসলামাবাদে বৈঠকের প্রস্তুতি চলছে। আজ শুক্রবার বা শনিবার ওয়াশিংটন ও তেহরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও এখনো চূড়ান্ত সময়সূচি নিশ্চিত হয়নি। পাকিস্তানে নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূত সামাজিক মাধ্যমে প্রতিনিধিদের আগমনের কথা জানালেও পরে সেই পোস্ট মুছে দেওয়া হয়। অন্যদিকে সম্ভাব্য মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে থাকা ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বর্তমানে হাঙ্গেরি সফরে রয়েছেন।
ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের দেওয়া ১০ দফা প্রস্তাব আলোচনায় তোলা হবে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রও ১৫ দফা দাবি উপস্থাপন করতে পারে। তবে আলোচনার আগেই বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘মিত্রদের সুরক্ষা’ ইস্যু। তেহরান চায় তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর হামলা বন্ধ হোক, কিন্তু ইসরায়েল লেবাননে হামলা অব্যাহত রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দাবি, যুদ্ধবিরতির আওতায় লেবানন অন্তর্ভুক্ত নয়।
লেবাননভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর গত ২ মার্চ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে যুদ্ধে যুক্ত হয় গোষ্ঠীটি। ফলে লেবাননে হামলা চালানোকে যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে তেহরান।
এ নিয়ে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য এসেছে। গালিবাফ সতর্ক করে বলেছেন, হামলা অব্যাহত থাকলে শান্তি আলোচনা অর্থহীন হয়ে পড়বে। অন্যদিকে ভ্যান্সের দাবি, যুদ্ধবিরতিতে লেবানন অন্তর্ভুক্ত নয়।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। তুরস্ক, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন লেবাননকে যুদ্ধবিরতির আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছে। চীন লেবাননের সার্বভৌমত্ব রক্ষার ওপর জোর দিয়েছে।
ইসলামাবাদ বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হতে যাচ্ছে হরমুজ প্রণালি এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। তেহরান চায় প্রণালিতে তাদের নিয়ন্ত্রণ এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পাক। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেছেন, ইরানের কাছে কোনো পারমাণবিক অস্ত্র থাকতে দেওয়া হবে না এবং হরমুজ প্রণালি সবার জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে।
ইরানের পারমাণবিক শক্তি সংস্থার প্রধান মোহাম্মদ এসলামি যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থান প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছেন, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচিতে কোনো সীমাবদ্ধতা মানবে না তেহরান।
দুই পক্ষের প্রস্তাব বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থানে রয়েছে। ইরান যেখানে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, সেনা প্রত্যাহার এবং ক্ষতিপূরণ দাবি করছে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে সীমা আরোপ এবং আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সমর্থন বন্ধের মতো শর্ত দিচ্ছে। ফলে আলোচনায় সমঝোতা অর্জন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে শান্তি আলোচনার উদ্যোগের মধ্যেই নতুন করে উত্তেজনা বাড়িয়েছে ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি। তিনি বলেছেন, কার্যকর চুক্তি না হলে ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের হামলা চালানো হবে। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, লেবাননে হামলা চলতে থাকলে আলোচনা অর্থহীন এবং ইরান তাদের মিত্রদের ছেড়ে দেবে না।
সম্ভাব্য এই বৈঠক ঘিরে ইসলামাবাদে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। শহরজুড়ে তল্লাশি বাড়ানো হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। বিলাসবহুল সেরেনা হোটেল কেন্দ্র করে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে, যেখানে প্রতিনিধি দলগুলোর অবস্থানের কথা রয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় শহরটিতে দুই দিনের ছুটিও ঘোষণা করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, যুদ্ধবিরতির ভঙ্গুর অবস্থা, লেবানন ইস্যু এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে তীব্র মতপার্থক্যের মধ্যেই ইসলামাবাদ বৈঠককে ঘিরে অনিশ্চয়তা ও উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে।
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর