রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোছা. তাজমুন্নাহার সরকারি ছুটির নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে ঈদের ছুটির আগে থেকেই কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন। ঈদের ছুটির পর মাত্র দুই দিনের ছুটি মঞ্জুর করিয়ে নিলেও, সেই ছুটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও তিনি এখনও কর্মস্থলে ফেরেননি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিষয়টি অবগত থাকলেও তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় সাধারণ শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগ, তদন্ত হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। সাধারণ শিক্ষকদের দাবি, কতিপয় শিক্ষক নেতাকে নিয়ে তিনি একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন এবং ডিপিইও (জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস) অফিসেও তার প্রভাব রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার রহস্যজনক যোগসাজশ ও আশ্রয়-প্রশ্রয়ে কর্মস্থলে দিনের পর মাস অনুপস্থিত থেকেও তিনি পার পেয়ে যাচ্ছেন।
এদিকে, কর্মস্থলে অনুপস্থিতির পাশাপাশি এই শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্য, বিল অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে কোটি টাকার অনিয়মের পাহাড়সম অভিযোগ ক্রমশ প্রকাশ্যে আসছে। এর আগে তাঁর এ সীমাহীন দুর্নীতির বিরুদ্ধে শিক্ষকরা মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করলেও রহস্যময় কারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নির্বিকার ভূমিকা পালন করছে।
সম্প্রতি শিক্ষা কর্মকর্তা তাজমুন্নাহারের ঘুষ লেনদেন সংক্রান্ত দুটি চাঞ্চল্যকর অডিও কথোপকথন এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। একটি অডিও রেকর্ডে এক ভুক্তভোগীকে বলতে শোনা যায়, "আমাদের টিও (উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা) অত্যন্ত ঘাগু...। আমি টাকা না দেওয়ায় ডিপিইও অফিস থেকে আমার ফাইল ফেরত এনেছেন। এরপর আমার নিকট হতে তাজমুন্নাহার ৫ হাজার টাকা নেন, জেলা শিক্ষা অফিসের উজ্জ্বল নেন ৩ হাজার টাকা।" ক্ষোভ প্রকাশ করে ওই ব্যক্তি আরও বলেন, "মুখে পাউরুটি দিয়ে যদি মুক্তি পাওয়া যায়, তাহলে সেটাই করি। আমাদের শিক্ষকদের মধ্যে একতা নেই।" অপর একটি অডিও রেকর্ডে আরেক ভুক্তভোগী শিক্ষককে আক্ষেপ করে বলতে শোনা যায়, "৫ হাজার দিতে হয়েছে, কিছু বলার নাই। ভোট কেন্দ্র সংস্কার বিল বাবদ দিতে হয়েছে কয়েক হাজার। উজ্জ্বলও (জেলা শিক্ষা অফিসের কর্মচারী) নিয়েছে ৩ হাজার। কয়ডা পয়সা নিয়ে যদি মুক্তি দেয় তাও ভালো, কোনো প্রকার মানবিকতা নেই, আল্লাহর উপর ভরসা করে দিছি। ডাইরেক্ট দিছি, দিতে হবে বলছে তাই দিছি।" মোবাইলের অপর প্রান্ত থেকে অন্য একজন শিক্ষক জেলা শিক্ষা অফিসারের (ডিপিইও) ভূমিকা নিয়ে জানতে চাইলে ভুক্তভোগী শিক্ষক স্পষ্ট বলেন, "যে টিই (উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা), সেই ডিপিইও। উজ্জ্বল নিছে ৩ হাজার, কেউ বাদ নাই। অন্যরা দু'জনকে ৮ হাজার টাকা করে দিছে।"
উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ১০ মে বালিয়াকান্দি উপজেলায় যোগদানের পর থেকেই শিক্ষা প্রশাসনে নানা জটিলতা তৈরি করেন তাজমুন্নাহার। শিক্ষকদের অভিযোগ, যোগদানের পর থেকেই তিনি প্রাতিষ্ঠানিক বা একাডেমিক তদারকির চেয়ে ফাইল আটকে রাখা ও বিল-ভিত্তিক কার্যক্রমে অনৈতিক সুবিধা নিতে বেশি মনোযোগী ছিলেন। চলতি ২০২৬ সালের প্রাথমিক স্তরের মূল্যায়ন নির্দেশনা অনুযায়ী ধারাবাহিক ও সামষ্টিক মূল্যায়নের সমন্বয়ে ফলাফল প্রস্তুতের নিয়ম থাকলেও, এ বিষয়ে উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। কো-কারিকুলামভিত্তিক বিষয়গুলো শতভাগ ধারাবাহিক মূল্যায়ন করার কথা থাকলেও, তিনি নিয়ম বহির্ভূতভাবে সেগুলো প্রান্তিক মূল্যায়নের রুটিনে ঢুকিয়ে ২ দিন পাঠ দিবস কমিয়ে দেন। পরিপত্র অনুযায়ী প্রান্তিক মূল্যায়ন স্কুল ভিত্তিক বা পাশাপাশি কয়েকটি স্কুল মিলে নেওয়ার কথা থাকলেও, তিনি সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে উপজেলাব্যাপী অভিন্ন প্রশ্নে পরীক্ষা নেন। শিক্ষকদের দাবি, এই অভিন্ন প্রশ্নপত্রের প্রান্তিক মূল্যায়ন খাত থেকে তিনি কৌশলে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা নিজের পকেটস্থ করেছেন।
সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে ৫০ নম্বর ধারাবাহিক ও ৫০ নম্বর সামষ্টিক এবং তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে ৩০ নম্বর ধারাবাহিক ও ৭০ নম্বর সামষ্টিক মূল্যায়নের নিয়ম রয়েছে। কিন্তু এই শিক্ষা কর্মকর্তার স্বেচ্ছাচারিতা ও অস্পষ্টতার কারণে অনেক বিদ্যালয়ে ফলাফল প্রস্তুত করতে গিয়ে চরম বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে এবং কোথাও কোথাও "গোজামিল" দিয়ে ফলাফল প্রস্তুত করার বিষয়টি জানান শিক্ষকরা। নাম না প্রকাশের শর্তে একজন শিক্ষক বলেন, উপজেলা শিক্ষা অফিসের ল্যাপটপ ও নারুয়া ইউনিয়নের পাটকিয়াবাড়ী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি ল্যাপটপ তিনি তার টাঙ্গাইলের বাসায় নিয়েছেন সন্তানদের ব্যবহারের জন্য। এছাড়া বেজলাইন সার্ভে, দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ পরিকল্পনা কিংবা পাঠঘাটতি পূরণের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেননি তিনি।
অভিযোগ রয়েছে, গত জাতীয় নির্বাচনের ভোট কেন্দ্র সংস্কার প্রকল্পের আওতায় উপজেলার ৩২টি বিদ্যালয়ে সরকারি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) এবং ইউএনও’র তদারকি কমিটি কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর প্রত্যয়নপত্র দিলেও, অবৈধ ক্ষমতার অপব্যবহার করে সেই বিল আটকে রেখেছেন তাজমুন্নাহার। বিল অনুমোদনের জন্য শিক্ষকদের কাছে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ। এর ফলে বিদ্যালয়গুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষক রাশিদুল ইসলামের এক লিখিত অভিযোগ থেকে জানা গেছে, শুধু বেতন সমতাকরণের ফাইল ছাড়ানোর জন্যই তাজমুন্নাহার ৭৫ হাজার টাকা ঘুষ গ্রহণ করেছেন। এছাড়া পিআরএল, অবসরকালীন সুবিধা এবং শিক্ষকদের বিভিন্ন ভাতা অনুমোদন প্রক্রিয়াতেও নিয়মিত অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক শিক্ষক বলেন, "কাজের অগ্রগতির চেয়ে ফাইল আটকে রাখার বিষয়টাই উনার প্রধান যোগ্যতা।"
অনুসন্ধানে জানা যায়, মোছা. তাজমুন্নাহার এর আগেও যেসকল উপজেলায় দায়িত্ব পালন করেছেন, সবখানেই বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। এর আগে শিবপুর, ধামরাই এবং ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলায় দায়িত্ব পালনকালে ওয়াশব্লক ও ক্ষুদ্র মেরামত প্রকল্প, প্রাথমিক শিক্ষা তহবিল ব্যবস্থাপনা এবং ঠিকাদারি বিল অনুমোদন নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল, যা বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এমনকি পূর্ববর্তী কর্মস্থলে শিক্ষকদের তীব্র আন্দোলন ও মানববন্ধনের মুখে পড়েও পরে নানা চাতুর্যের আশ্রয় নিয়ে ও 'লিখিত সমঝোতা'র মাধ্যমে পরিস্থিতি ধামাচাপা দেন। এছাড়া বাসা ভাড়া বকেয়া রাখা এবং প্রশাসনিক ব্যয়ে অনিয়মের অভিযোগও তাঁর পিছু ছাড়েনি।
ঈদের ছুটির আগে থেকেই কর্মস্থল ত্যাগ করা এবং বর্তমানে অনুমোদনহীন অনুপস্থিতির বিষয়ে বক্তব্য জানতে শিক্ষা কর্মকর্তা মোছা. তাজমুন্নাহারের অফিসে বৃহস্পতিবার সকালে গেলেও তাকে পাওয়া যায়নি। মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। রাজবাড়ী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান বলেন, আমি নিজেই বালিয়াকান্দি প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা তাজমুন্নাহারের কর্মকাণ্ডে বিব্রত। তার বিরুদ্ধে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে একটি রিপোর্ট প্রেরণ করেছি। আমি তাকে নিয়ে আর একটি কথাও বলতে চাই না। স্থানীয় সচেতন মহল ও প্রাথমিক শিক্ষকরা এই "ঘুষখোর" ও "স্বেচ্ছাচারী" কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অবিলম্বে বিভাগীয় তদন্তপূর্বক কঠোর আইনানুগ ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর