পঞ্চেন্দ্রিয়ের মধ্যে চোখ যেন স্রষ্টার সবচেয়ে বিস্ময়কর সৃষ্টি। রহস্যের নীলাভ আবরণে মোড়া এই দুটি জানালা শুধু আলোই দেখে না, দেখে স্বপ্ন, অনুভব করে আবেগ, পাঠ করে হৃদয়ের অগণিত অপ্রকাশিত ভাষা। মানুষের মনের গোপনতম কথাগুলোও অনেক সময় ঠোঁটের আগেই চোখে ধরা পড়ে। একেকটি দৃষ্টি যেন একেকটি কবিতা, একেকটি চাহনি যেন অনুচ্চারিত অনুভূতির দীর্ঘ উপাখ্যান।
মাতৃগর্ভে মানবদেহের প্রায় সব অঙ্গই নিজ নিজ কর্মযজ্ঞে ব্যস্ত থাকে, কিন্তু চোখ যেন অপেক্ষা করে এক বিশেষ মুহূর্তের জন্য—পৃথিবীর আলোকে প্রথমবারের মতো বরণ করে নেওয়ার জন্য। জন্মের পর শিশুর চোখ মেলে তাকানো তাই কেবল দেখার শুরু নয়, বরং এক নতুন জগতের সঙ্গে তার প্রথম পরিচয়, প্রথম বিস্ময়, প্রথম সংলাপ।
সম্ভবত এই কারণেই ভাস্কর কিংবা শিল্পীরা তাঁদের সৃষ্টিকর্মের শেষ পরশটি দেন চোখে। মূর্তির দেহ, অবয়ব, রূপ সবই আগে সম্পূর্ণ হয়, কিন্তু প্রাণের স্পন্দন যেন আসে চোখ আঁকার মধ্য দিয়েই। সেই মুহূর্তে নিথর শিল্পকর্মও যেন প্রাণ পায়, নীরবতা ভেঙে কথা বলতে শুরু করে। শিল্পের ভাষায় এ পর্বের নাম ‘আঁখি উন্মীলন’ আর জীবন যেন ঠিক সেখান থেকেই শুরু হয়।
আসলে চোখ শুধু ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য কোনো অঙ্গ নয়; চোখ এক বিস্ময়কর অনুভূতির নাম। কখনও তা উচ্ছল প্রেমের কবিতা, কখনও নীরব বিষাদের দীর্ঘ উপাখ্যান। জন কীটসের রোমান্টিক কবিতার সুধাও অনেক সময় একটি গভীর চোখের ভাষার কাছে ম্লান হয়ে যেতে পারে।
শল্যবিদের ডিসেকশন টেবিলে চোখের গঠন, স্নায়ু কিংবা কার্যকারিতা বিশ্লেষণ করা সম্ভব, কিন্তু তার অন্তর্নিহিত রহস্যের ব্যাখ্যা দেওয়া যায় না। কারণ মানুষের চোখের গভীরে লুকিয়ে থাকে অগণিত অদৃশ্য প্রশ্ন, অনুচ্চারিত আকাঙ্ক্ষা আর নীরব আর্তি। সেই জিজ্ঞাসার উত্তর খুঁজতে গিয়ে কবির কল্পনাও অনেক সময় ক্লান্ত হয়ে পড়ে। চোখের ভাষার কোনো অভিধান নেই, নেই তার কোনো নির্দিষ্ট মাপকাঠি।
এ কথা সত্য যে, মানুষের দৈহিক সৌন্দর্যে চোখ নিজেই এক স্বতন্ত্র অলংকার। সুন্দর চোখের দিকে তাকালে যেন চোখই জুড়িয়ে যায়। কারণ চোখ শুধু দেখার মাধ্যম নয়, ভালোবাসারও এক অনন্ত প্রতীক। তার সৌন্দর্যকে যত উপমাতেই বাঁধা হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত সব ব্যাখ্যার সারমর্ম একটাই চোখ সুন্দর।
সাহিত্যিক, কবি ও শাস্ত্রকারেরা যুগে যুগে নারীর চোখ নিয়ে এমন সব উপমা সৃষ্টি করেছেন, যা কল্পনার সীমানাকেও অতিক্রম করে যায়। কেউ বলেছেন পটলচেরা আঁখি, কেউ তুলনা করেছেন আকাশের নীল বিস্তারের সঙ্গে, কেউবা নারকেলবীথি ঘেরা শান্ত দীঘির জলের সঙ্গে। কারও কাছে সে চোখ তীরভর্তি তূণীর, যার এক চাহনিতেই হৃদয় বিদ্ধ হয়। আবার কারও ভাষায় ‘আঁখিবাণে হিয়া জর জর’।
নারীর চোখের বাঁকা চাহনির মতো শক্তিশালী কটাক্ষ বোধহয় আর কিছু নেই। সেই চোখ কখনও প্রেম ছুড়ে দেয়, কখনও অভিমান, কখনও আনন্দ, আবার কখনও গভীর বেদনা। সেই চোখই অশ্রুর মুক্তো গাঁথে, সেই চোখের জলেই কেউ কেউ ভাসিয়ে দেন সমগ্র জীবন। তাই তো রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, অশ্রুও কখনও কখনও ফুল হয়ে ফুটে ওঠে।
কবিরা বলেন, নারীর চোখের গভীরতা মাপার সাধ্য তাদেরও নেই। সাত সাগরের অতল রহস্য যেন সেখানে আশ্রয় নেয়। চোখের পাপড়িগুলো যেন পদ্মপুকুরের তীরে দাঁড়িয়ে থাকা ঝাউ-মহুয়ার সারি, আর ভ্রুদ্বয় বাঁকা চাঁদের মতো, কখনও বা ধারালো তরবারির মতো তীক্ষ্ণ। ইংরেজ নাট্যকার শেক্সপিয়ারের ভাষায়, নারীর চোখে রয়েছে প্রমিথিউসের আগুন—যে আগুন কাউকে উষ্ণতা দেয়, কাউকে আবার দগ্ধ করে ছাই করে ফেলে।
তবু সবচেয়ে বিস্ময়কর সত্য হলো, নারী তার গভীর দৃষ্টিতে পুরুষের মনের অগণিত গোপন ছবি পড়ে নিতে পারে। কিন্তু পুরুষ আজও সেই রহস্যময় চোখের সহজ অনুবাদ খুঁজে ফিরেছে যুগের পর যুগ।
যৌবনে এসে নারীর চোখ যেন নিজেই এক শিল্পকর্মে পরিণত হয়। কখনও তা পূর্ণিমার আলোয় ধোয়া শান্ত রাত্রির মতো স্নিগ্ধ, কখনও রূপালি রোদের মতো দীপ্ত, কখনও প্রশান্ত হ্রদের জলের মতো স্থির, আবার কখনও পাহাড়ি ঝরনার মতো কলকল করে কথা বলে। আর সেই কারণেই চোখ শুধু সৌন্দর্যের নয়, মানুষের অনুভূতি, প্রেম, বেদনা ও জীবনের সবচেয়ে গভীর রহস্যেরও এক অনন্ত প্রতীক।
রোহান/সা.এ.
সর্বশেষ খবর