ময়মনসিংহের গৌরীপুর খাদ্য গুদাম (এলএসডি)-এর ধারণক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নতুন খাদ্য গুদাম নির্মাণের কার্যাদেশের মেয়াদ শেষ হয়েছে গত জানুয়ারিতে। কিন্তু মেয়াদ শেষ হওয়ার পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পের অগ্রগতি মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ। এর মধ্যেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বরাদ্দের প্রায় ৬০ শতাংশ বিল উত্তোলন করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে নির্মাণকাজ স্থবির হয়ে পড়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয় চালকল মালিক ও কৃষকেরা।
খাদ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়,“দেশের বিভিন্ন কৌশলগত স্থানে নতুন খাদ্য গুদাম ও আনুষঙ্গিক সুবিধাদি নির্মাণ” শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় প্যাকেজ নম্বর WD-11-এর অধীনে ময়মনসিংহের মুন্সীরহাট এলএসডি ও গৌরীপুর এলএসডিতে নতুন খাদ্য গুদাম নির্মাণের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ই-টেন্ডারের মাধ্যমে কিশোরগঞ্জের মেসার্স স্বপ্না ট্রেডার্স এবং গৌরীপুরের মেসার্স হাফেজ এন্টারপ্রাইজ যৌথভাবে কাজটি পায়। প্রকল্পটির মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ৫ কোটি ৩০ লাখ ৭০ হাজার ৩০০ টাকা। এর মধ্যে গৌরীপুর এলএসডিতে ৫০০ মেট্রিক টন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন একটি নতুন খাদ্য গুদাম নির্মাণের দায়িত্ব পায় মেসার্স হাফেজ এন্টারপ্রাইজ। সরকারি নথি অনুযায়ী,২০২৫ সালের ৫ জানুয়ারি খাদ্য অধিদপ্তরের প্রকল্প পরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম স্বাক্ষরিত পত্রে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্ত কার্যাদেশ দেওয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী, কার্যাদেশ পাওয়ার সাত দিনের মধ্যে কাজ শুরু করে ২০২৬ সালের ৫ জানুয়ারির মধ্যে সম্পূর্ণ নির্মাণকাজ শেষ করে ভবনটি খাদ্য অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তরের বাধ্যবাধকতা ছিল।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, প্রকল্প এলাকায় মাটির নিচের ফাউন্ডেশন ও গ্রেড বিমের কাজ শেষ করে কেবল কলামের রড দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। ভবনের দেয়াল গাঁথুনি কিংবা ছাদ ঢালাইয়ের কোনো কাজ শুরু হয়নি। দীর্ঘদিন খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকায় রডে মরিচাও ধরতে শুরু করেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, শুরু থেকেই নির্মাণকাজ ছিল অত্যন্ত ধীরগতির। বর্তমানে মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন করেই নানা কৌশলে মোট বরাদ্দের প্রায় ৬০ শতাংশ বিল উত্তোলন করা হয়েছে। এরপর কাজ বন্ধ রেখে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান কার্যত নিষ্ক্রিয় রয়েছে। তারা প্রকল্পের আর্থিক ও কারিগরি বিষয় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। নির্মাণকাজের ধীরগতির কারণে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় চালকল মালিক ও ব্যবসায়ীরাও।
তারা জানান,গৌরীপুর খাদ্য গুদামে ধারণক্ষমতার সংকট আগে থেকেই রয়েছে। নতুন গুদামটি সময়মতো নির্মাণ হলে স্থানীয়ভাবে চাল সংরক্ষণ ও সরবরাহে সুবিধা হতো। এখন বাধ্য হয়ে দূরবর্তী স্থানে চাল পাঠাতে হচ্ছে,ফলে পরিবহন ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। এতে ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি কৃষকেরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।গৌরীপুর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা মো. রুবাইদুর রানা গণমাধ্যমকে বলেন,“গৌরীপুর খাদ্য গুদামে ধারণক্ষমতার তীব্র সংকট রয়েছে। স্থানীয় চালকল মালিকদের চাহিদা সামাল দিতে আমাদের আরও অন্তত ১০টি গুদাম প্রয়োজন। নতুন গুদামটি সময়মতো সম্পন্ন হলে বড় ধরনের সুবিধা পাওয়া যেত। বর্তমানে জায়গার স্বল্পতার কারণে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে।”অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মেসার্স হাফেজ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী হাফেজ আজিজুল হক সাংবাদিকদের বলেন,আমাদের একাধিক প্যাকেজের কাজ একসঙ্গে চলায় একটির পর একটি ধাপ ধরে এগোতে হচ্ছে। কাজ ফেলে রাখা হয়নি, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই গৌরীপুরের গুদাম নির্মাণের কাজ আবার পুরোদমে শুরু হবে।
কাজ না করে ৬০ শতাংশ বিল তুলে নেওয়ার অভিযোগটি পুরোপুরি নাকচ করে দিয়ে তিনি বলেন, সরকারি কাজে অগ্রিম (অ্যাডভান্স) বিল পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। নিয়ম অনুযায়ী মাঠে যে পরিমাণ কাজ হয়, তদারকি শেষে সরকার তার চেয়েও কম বিল দেয়। এমনকি কাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার পরও ১০ শতাংশ টাকা জামানত (সিকিউরিটি মানি) হিসেবে আটকে রাখে। এখানে উল্টো আমার নিজের টাকা বিনিয়োগ হয়ে আছে।
এ বিষয়ে ময়মনসিংহ আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের আঞ্চলিক রক্ষণাবেক্ষণ কর্মকর্তা (আরএমও) আবু হুরায়রা গণমাধ্যমকে বলেন, “গৌরীপুরের নতুন খাদ্য গুদাম নির্মাণকাজ দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। স্থানীয় কর্মকর্তারা বিষয়টি আমাদের অবহিত করেছেন। আমরা লিখিত ও মৌখিকভাবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত কাজ সম্পন্ন করার নির্দেশনা দিয়েছি এবং বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও জানিয়েছি।” তবে প্রকল্পটির মূল তদারকির দায়িত্বে থাকা আঞ্চলিক রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলী তপন কুমার দাসের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য একাধিকবার মুঠোফোনে কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর