মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের সামরিক অভিযান শিগগিরই শেষ হচ্ছে না বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তাঁর ভাষায়, এ অঞ্চলে ইসরাইলের যুদ্ধের ‘কোনো শেষ নেই’।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) ইসরাইলের টেলিভিশন চ্যানেল ১৪ নিউজকে দেওয়া এক দীর্ঘ ও বিরল সাক্ষাৎকারে তিনি এ মন্তব্য করেন।
সাক্ষাৎকারে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের যুদ্ধ শেষ হওয়ার পথে কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে নেতানিয়াহু ইঙ্গিত দেন, দেশটির সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকবে।
হামাস ও হিজবুল্লাহর শীর্ষ নেতাদের হত্যার পাশাপাশি গাজা, লেবানন ও সিরিয়ার বিভিন্ন এলাকায় ইসরাইলের সামরিক উপস্থিতির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমরা অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছি।’
সাম্প্রতিক ইরান-ইসরাইল উত্তেজনার প্রসঙ্গ টেনে নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমরা ভয়ের দেয়াল ভেঙে দিয়েছি। ৪৭ বছর ধরে কেউ ইরানে হামলা চালানোর সাহস করেনি।’
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে পরিচালিত হামলার পর ঘোষিত ‘নিশ্চিত বিজয়’ অর্জনের লক্ষ্য এখনো বাস্তবসম্মত কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এর কোনো শেষ নেই।’
নেতানিয়াহুর দাবি, মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বে টিকে থাকতে হলে শক্তিশালী হওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। তাঁর মতে, ‘ইসরাইল এখন অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি শক্তিশালী।’
সাক্ষাৎকারের একপর্যায়ে তিনি বলেন, ইসরাইল যে যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে, তা অনেকেই বিশ্বাস করেননি। এ সময় তিনি উপস্থিত দর্শকদের উদ্দেশে বলেন, ‘কেউ কি হাততালি দিচ্ছেন না?’ এরপর দর্শকদের হাততালি দিতে দেখা যায়।
গাজার বাসিন্দাদের দেশত্যাগের প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে নেতানিয়াহু ‘দেশান্তর’ শব্দটি সংশোধন করে ‘স্বেচ্ছায় দেশান্তর’ শব্দ ব্যবহার করেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য না করে তিনি বলেন, ‘আমি কথা কম বলতে এবং কাজ বেশি করতে পছন্দ করি।’
গাজায় ইহুদি বসতি স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলেও তিনি সরাসরি উত্তর দেননি। বরং বলেন, ‘বড় প্রশ্ন হলো—আপনি কাজ করবেন, নাকি শুধু কথাই বলবেন।’
নেতানিয়াহু আরও বলেন, বিভিন্ন দেশের চাপের মুখে রয়েছে ইসরাইল। তবে তাঁর ভাষায়, ‘প্রতি মুহূর্তে এবং প্রতিটি বিষয়ে পুরো বিশ্বকে আমার চ্যালেঞ্জ জানানোর প্রয়োজন নেই।’
ইসরাইলি শিক্ষার্থীরা এখন আরও বেশি বর্ণবাদী: জরিপ
গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর প্রথমবারের মতো আগামী অক্টোবরে জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে যাচ্ছে ইসরাইলের নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা। এ প্রেক্ষাপটে ইসরাইলি দৈনিক হারেৎস-এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বর্তমান প্রজন্মের স্নাতক শিক্ষার্থীরা তাদের পূর্বসূরিদের তুলনায় অনেক বেশি বর্ণবাদী মনোভাব পোষণ করছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরাইলি কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গির উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। এ প্রবণতার সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যুবকর্মী ও শিক্ষাবিদরা।
ইসরাইলের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিচালিত ২০২৫ সালের এক জরিপের তথ্য অনুযায়ী, এমন শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে যারা মনে করে, ইসরাইলের কিছু জনগোষ্ঠী—যেমন দেশটির ফিলিস্তিনি নাগরিকরা—সমাজের অংশ হওয়ার অধিকার রাখে না।
জরিপে দেখা গেছে, ধর্মীয় ঘরানার স্কুলের ৫২ শতাংশ এবং ধর্মনিরপেক্ষ স্কুলের ৩৫ শতাংশ শিক্ষার্থী এই মতের সঙ্গে একমত। আরবি ভাষার স্কুলগুলোর শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ হার ৩৪ শতাংশ।
হারেৎসকে এক যুব আন্দোলনের কর্মকর্তা বলেন, ইহুদি শিক্ষার্থীদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী আবেগ আগের তুলনায় আরও তীব্র হয়েছে। একই সঙ্গে শক্তিশালী ইহুদি পরিচয়ের প্রতি আগ্রহ এবং সামরিক সংঘাতে অংশ নেওয়ার মানসিকতাও বেড়েছে।
আরেক যুব সংগঠক বলেন, ইহুদি শিক্ষার্থীদের মধ্যে আরবদের প্রতি ভয় বৃদ্ধি পেলেও আরও বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি তাদের আস্থা কমে যাচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থা থেকে উঠে আসা অনেক ইহুদি স্নাতক এখন আর ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বা রাজনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনায় বিশ্বাস করেন না।
একটি ইহুদি হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক হারেৎসকে বলেন, বর্তমান প্রজন্মের অনেক শিক্ষার্থী শান্তি প্রতিষ্ঠা কিংবা দুই জাতির মধ্যে সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধানের ধারণায় আর আস্থা রাখে না।
মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার ‘সুনামি’
ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেট বুধবার (১ জুলাই) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, নতুন এক গবেষণায় রিজার্ভ সেনাদের সন্তানদের ওপর দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের গুরুতর মানসিক প্রভাবের বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।
রাইখম্যান ইউনিভার্সিটির পরিচালিত এ গবেষণায় প্রায় আড়াই হাজার রিজার্ভ সেনা পরিবারের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, সাত বছরের কম বয়সী বিপুলসংখ্যক শিশুর মধ্যে পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি) বা যুদ্ধ-পরবর্তী মানসিক আঘাতের লক্ষণ দেখা দিচ্ছে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, রিজার্ভ সেনাদের ৭৫ শতাংশ শিশু প্রাথমিক পর্যায়ের (সাব-ক্লিনিক্যাল) পিটিএসডির লক্ষণ বহন করছে। আর যেসব শিশুর মধ্যে লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছে, তাদের প্রায় ৩২ শতাংশ ক্লিনিক্যাল বা গুরুতর পিটিএসডিতে আক্রান্ত।
গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে, এসব শিশু মানসিক ও শারীরিক উভয় দিক থেকেই মারাত্মক চাপের মধ্যে রয়েছে। সময়মতো প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সহায়তা না পেলে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ইসরাইলি সমাজকে বহন করতে হতে পারে।
রাইখম্যান ইউনিভার্সিটির তথ্যমতে, শুধু শিশুরাই নয়, জরিপে অংশ নেওয়া বাবাদের ৩৫ শতাংশ এবং মায়েদের ৪২ শতাংশও বিভিন্ন মাত্রার মানসিক আঘাতের মধ্যে রয়েছেন।
গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রায় তিন বছর ধরে চলা যুদ্ধের ফলে ইসরাইল ক্রমেই মানসিক আঘাতে জর্জরিত একটি সমাজে পরিণত হচ্ছে। বিশেষ করে ছোট শিশু থাকা রিজার্ভ সেনাদের পরিবারগুলো দীর্ঘ সময় ধরে কঠিন মানসিক ও সামাজিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়, অনেক রিজার্ভ সেনা পরিবারের দৈনন্দিন জীবন প্রায়ই বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ছে এবং দেশটি ক্রমবর্ধমান মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের মুখোমুখি।
শিশুদের মধ্যে ঘুমের সমস্যা, বিছানা ভিজিয়ে ফেলা, আক্রমণাত্মক আচরণসহ বিভিন্ন মানসিক ও আচরণগত জটিলতা দেখা যাচ্ছে। একই সঙ্গে জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৮০ শতাংশ অভিভাবক জানিয়েছেন, যুদ্ধ তাদের জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
সূত্র: মিডেল ইস্ট আই
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর
সারাবিশ্ব এর সর্বশেষ খবর