বাংলাদেশের জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে প্রযুক্তিনির্ভর ও সহজলভ্য করা স্বাস্থ্য প্রযুক্তিভিত্তিক স্টার্টআপ ‘নিওসেভার’ নতুন এক মাইলফলক স্পর্শ করেছে। জরুরি মুহূর্তে দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স সেবা নিশ্চিত করতে তৈরি এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সম্প্রতি বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের DEIED প্রকল্পের আওতায় সরকারি সিড ফান্ডিং অর্জন করেছে।
১৪ জুলাই ঢাকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট হলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বাংদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। এসময় বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের DEIED প্রকল্পের আওতায় ১ লাখ টাকার সরকারি সিড ফান্ডিং গ্রহণ করে প্রতিষ্ঠানটি। অনুষ্ঠানে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতের নীতিনির্ধারক এবং সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ধিলন রায়, যিনি নর্দান ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি, খুলনার প্রাক্তন শিক্ষার্থী।
ধিলন রায় জানান, নিওসেভারের যাত্রা শুরু হয় একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে। পরিবারের একজন সদস্যের জরুরি চিকিৎসার সময় দ্রুত উপযুক্ত অ্যাম্বুলেন্স খুঁজে না পাওয়ার অভিজ্ঞতা ধিলন রায়কে ভাবতে বাধ্য করে। সেই উপলব্ধি থেকেই এমন একটি প্রযুক্তিনির্ভর প্ল্যাটফর্ম তৈরির উদ্যোগ নেন, যা জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য অ্যাম্বুলেন্স সেবা পাওয়ার প্রক্রিয়াকে সহজ করবে।
তিনি আরও জানান, প্ল্যাটফর্মটি চালুর আগে নিওসেভার দল এক বছরেরও বেশি সময় ধরে হাসপাতাল, অ্যাম্বুলেন্স মালিক, চালক, রোগী এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে মাঠপর্যায়ে গবেষণা পরিচালনা করে। গবেষণায় উঠে আসে, দেশের অধিকাংশ অ্যাম্বুলেন্স সেবা এখনও ফোনকলনির্ভর ও সমন্বয়হীন ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। ফলে জরুরি মুহূর্তে রোগী ও স্বজনদের মূল্যবান সময় নষ্ট হয়।
এই সমস্যার সমাধানে নিওসেভার একটি ব্যবহারবান্ধব ডিজিটাল বুকিং সিস্টেম তৈরি করেছে। ব্যবহারকারীরা মাত্র তিনটি ধাপে লোকেশন নির্বাচন, গন্তব্য নির্ধারণ এবং বুকিং নিশ্চিত করার মাধ্যমে অ্যাম্বুলেন্স সেবা গ্রহণ করতে পারেন। এতে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার প্রক্রিয়া আরও দ্রুত, সহজ ও কার্যকর হয়েছে। স্টার্টআপটির প্রাথমিক যাত্রা শুরু হয় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের University Innovation Hub Program (UIHP)-এর মাধ্যমে। সেখানে প্রতিষ্ঠানটি ৪০ হাজার টাকার প্রি-সিড অনুদান এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন বিষয়ক মেন্টরশিপ লাভ করে। এই সহায়তা ধারণাটিকে একটি কার্যকর প্রযুক্তি পণ্যে রূপ দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরবর্তীতে বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের DEIED প্রকল্পের আওতায় সরকারি সিড ফান্ডিংয়ের জন্য নির্বাচিত হয় নিওসেভার। মাত্র পাঁচজন সদস্য নিয়ে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ বর্তমানে ১০০-এর বেশি সদস্যের একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, মেডিকেল ও নার্সিং শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন খাতের পেশাজীবীরা এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলা ও মহানগরে কার্যক্রম সম্প্রসারণের কাজও চলছে। বর্তমানে ২৫টির বেশি অ্যাম্বুলেন্স প্ল্যাটফর্মটির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পরীক্ষামূলক সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। পাশাপাশি বিভিন্ন আঞ্চলিক অ্যাম্বুলেন্স সংগঠনের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে সেবার মানোন্নয়নে কাজ করছে নিওসেভার।
অ্যাম্বুলেন্স বুকিং সেবার পাশাপাশি স্বাস্থ্য প্রযুক্তি খাতে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতেও কাজ করছে নিওসেভার। DEIED প্রকল্পের সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠানটি ইন্টার্নশিপ ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করেছে, যেখানে তরুণদের স্বাস্থ্য প্রযুক্তি, জরুরি সেবা সমন্বয় এবং ডিজিটাল অপারেশন ব্যবস্থাপনা বিষয়ে বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। একটি ব্যক্তিগত সংকট থেকে জন্ম নেওয়া এই উদ্যোগ আজ জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃত একটি স্বাস্থ্য প্রযুক্তি স্টার্টআপে পরিণত হয়েছে। ভবিষ্যতে দেশের বৃহত্তম ডিজিটাল জরুরি সেবা প্ল্যাটফর্ম হিসেবে অ্যাম্বুলেন্স ও ইমার্জেন্সি রেসপন্স ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, সমন্বিত ও প্রযুক্তিনির্ভর করে তোলাই নিওসেভারের প্রধান লক্ষ্য।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর