শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা, প্রবেশগম্যতা, ন্যায়বিচার, দুর্যোগ সুরক্ষা, সহিংসতা প্রতিরোধ, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং সব ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সমান অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ১০ দফা দাবি জানিয়ে "প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ছায়া সংসদের আত্মপ্রকাশ" করলো। সোমবার সকাল ১১টায় জাতীয় প্রেসক্লাবে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হল-এ "প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ছায়া সংসদের আত্মপ্রকাশ ও ১০-দফা ঘোষণা” শীর্ষক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ছায়া সংসদের ব্যানারে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা এই সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করেন। সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন অটিজম বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন তরুণ তাসীন খান জীম-এর মাতা নাজরীন হাই। মূল-বক্তব্য উপস্থাপন করেন বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি আবু হুরায়রা সাদ এবং চট্টগ্রাম থেকে আগত অটিজম বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন তরুণ ইলহাম-এর মাতা সালমা নুর। সঞ্চালনা এবং সম্পূর্ণ প্রোগ্রামটি সহযোগিতা করে সুপ্রীমকোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ রেজাউল করিম সিদ্দিকী।
তারা বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিগণ সারাদেশের ৩০০টি সংসদীয় আসন থেকে যোগ্য প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নির্বাচিত করে একটি ছায়া সংসদ গঠন করতে যাচ্ছেন। ইতিমধ্যেই ৬০টি জেলার ১৩৭টি সংসদীয় আসন থেকে ২৮৫ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও তাদের অভিভাবক ছায়া সংসদের সদস্য হওয়ার ফরম পূরণ করেছেন। ২০২৬ সালের ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই ৩০০টি আসন থেকে যোগ্য নেতাদের ছায়া সংসদের সদস্য হিসেবে নির্বাচন করা হবে মর্মে সংবাদ সম্মেলনে অবগত করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ছায়া সংসদের পক্ষ থেকে ১০-দফা দাবি ঘোষণা করে সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের অনুরোধ জানানো হয়।
ছায়া সংসদের পক্ষ থেকে উপস্থাপিত দাবিসমূহ হলো:
১. সকল ধরণের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবনব্যাপী শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।
২. সকল ধরণের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে নিম্নোক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
৩. সকল ধরণের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির কর্মসংস্থান নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে অবিলম্বে নিম্নোক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
৪. সকল ধরণের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে অবিলম্বে নিম্নোক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
৫. নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য থেরাপি, পুনর্বাসন ও নিরাপদ আবাসন নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে অবিলম্বে নিম্নোক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অভিভাবকগণ যাতে এই আস্থা রাখতে পারেন যে তাদের অবর্তমানে তাদের প্রতিবন্ধী সন্তান নিরাপদ থাকবে, বাণের জলে ভেসে যাবে না।
৬. সকল ধরণের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য নিরাপদ যাতায়াত ও ব্যবহারযোগ্য যানবাহন নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে নিম্নোক্ত পদক্ষেপ অবিলম্বে গ্রহণ করতে হবে।
৭. সকল ধরণের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ক্রীড়া ও বিনোদনের অধিকার বাস্তবায়নে অবিলম্বে নিম্নোক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
৮. সকল ধরণের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও তাদের অধিকারের বিষয়ে সার্বজনীন সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে নিম্নোক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
৯. সংসদে আসন সংরক্ষণ, পৃথক মন্ত্রণালয় ও সিআরপিডি কমপ্লায়েন্ট বাজেট প্রণয়ন ব্যতিত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার বাস্তবায়ন করতে হবে।
১০. সরকারি ও বেসরকারি কার্যক্রমে শারীরিক ও দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিষয়েই বেশি গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে। প্রবেশগম্যতা বলতে শুধু র্যাম্প ও লিফট কিংবা ব্রেইল ও একসেসিবল ওয়েবসাইটের উপরে সকলেই গুরুত্বারোপ করছে। ফলে, নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, মনোসামাজিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, শ্রবণ-দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সহ অন্যান্য ধরণের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা স্বাস্থ্যসেবার কোনো পদক্ষেপ আমরা দেখতে পাচ্ছি না। এমতাবস্থায় সকল ধরণের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির বিষয়ে সমান গুরুত্বারোপ করে পদক্ষেপ গ্রহণের জোর দাবি জানায়।
সংবাদ কর্মীদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব প্রদান করেন শ্রবণ প্রতিবন্ধী নারী জেসমিন আক্তার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আগত সেরিব্রাল পালসি সম্পন্ন ব্যক্তি মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম নজু, পিরোজপুর থেকে আগত শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি মোঃ মিরাজ হোসেন, সেরিব্রাল পালসি বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন তরুণ লেখক সাদমান সানজিম রহমানের মাতা নাজনীন নাহার, অটিজম বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন শিশু আব্দুল ওহাব মোহাম্মদ সারাফ খান-এর মাতা আসমা সুলতানা এবং সুদূর খাগড়াছড়ি থেকে আগত অটিজম বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন শিশু জুসেফ চাকমার পিতা আলো জ্যোতি চাকমা। সংবাদ সম্মেলনটি সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন সুপ্রীমকোর্টের আইনজীবী ও শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি মোঃ রেজাউল করিম সিদ্দিকী।
সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন টাঙ্গাইল থেকে আগত রানা প্লাজা ভিকটিম সাদ্দাম হোসেন, চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি থেকে আগত দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি কামাল হোসেন ও সেরিব্রাল পালসি বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন শিশু ফারহানের মাতা নুরুন্নাহার বেগম, অটিজম বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন ব্যক্তি জাওয়াদ-এর মাতা শিখা খান, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী শাহেদ সিদ্দিকী, অটিজম বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন তরুণ আকিব খান তাজিন এবং ময়মনসিংহ থেকে আগত শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি নুরুল ইসলাম সহ আরও অনেকে। সংবাদ সম্মেলনে ইশারা ভাষায় দোভাষী হিসেবে সহযোগিতা করেন আরাফাত সুলতানা লতা।
মূল বক্তব্যে উল্লেখ করে ছায়া সংসদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, "বাংলাদেশে জনশুমারী অনুযায়ী প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংখ্যা মোট জনগোষ্ঠীর মাত্র ১.৪%! অথচ সরকারেরই অন্যান্য সংস্থার হিসেবে এই সংখ্যা ৭% এর বেশি। আমাদের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পরিসংখ্যানে প্রায় ৬% তারতম্য করার অর্থ হলো প্রায় এক কোটি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে হিসাবের বাহিরে রাখা। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সঠিক সংখ্যা নিরূপণ না করায়, রাষ্ট্রের তথা সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও উন্নয়ন পরিকল্পনাও সঠিক পথে এগুচ্ছে না।"
উদ্বেগের সাথে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিগণ বলেন, "বাংলাদেশের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা ক্রমবর্ধমান হারে সহিংসতার শিকার হচ্ছে, প্রাণহানীর শিকার হচ্ছে, সর্বশেষ আপনারা দেখেছেন নরসিংদীতে কিভাবে ৭০-ঊর্ধ্ব বাক প্রতিবন্ধী নারী ববি বেগমকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। প্রতিনিয়ত আমরা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উপর এই ধরণের নৃশংসতার সংবাদ পাচ্ছি। নিরাপত্তার অভাবে আমরা এক প্রকার স্বেচ্ছান্তরীণ অবস্থায় জীবন-যাপন করছি। বিশেষ করে নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধিতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা নিরাপত্তার কথা ভেবে তাদেরকে ঘরে আটকে রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে আমাদের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে।"
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয় তরুণ শিক্ষিত বেকার ছেলেমেয়েরা কর্মসংস্থানের অভাবে আত্মহত্যার প্রবণতায় ভুগছেন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য সহ সকল সেবাখাতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিগণ নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ছায়া সংসদের পক্ষ থেকে অবহিত করা হয়, "প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অবস্থার উন্নয়নে বেসরকারি সংস্থাগুলো কিছু কর্মকান্ড পরিচালনা করলেও সেগুলো শুধুই 'প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে' করা হয়। এ কারণে আমাদের অবস্থার কোনো দৃশ্যমান উন্নতি নেই, বরং এই সকল উন্নয়ন সংস্থা সর্বগ্রাসী টোকেনিজমের চর্চা করায় দেশের বৃহত্তর অংশজুড়ে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর মাঝে হাহাকার বৃদ্ধি পাচ্ছে।"
সালাউদ্দিন/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর