ধূমপানের তুলনায় কম ক্ষতিকর এমন ধারণা থেকেই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভেপ বা ইলেকট্রনিক সিগারেটের ব্যবহার বিশ্বজুড়ে দ্রুত বেড়েছে। কেউ ধূমপান ছাড়ার বিকল্প হিসেবে, আবার কেউ বিভিন্ন স্বাদের আকর্ষণে ভেপ ব্যবহার শুরু করছেন। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা ও বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা বলছে, ভেপকে নিরাপদ মনে করার সুযোগ নেই। এতে থাকা নিকোটিন, বিষাক্ত রাসায়নিক ও ভারী ধাতু দীর্ঘমেয়াদে ফুসফুস, হৃদ্যন্ত্রসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষতি করতে পারে।
একসময় সীমিত পরিসরে ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে ইংল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভেপের জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকীর তথ্য অনুযায়ী, শুধু ইংল্যান্ডেই প্রায় ৪৫ লাখ মানুষ নিয়মিত বা অনিয়মিতভাবে ভেপ ব্যবহার করেন। যুক্তরাষ্ট্রে বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এর ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বাংলাদেশেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষার্থী জীবনে অন্তত একবার ভেপ ব্যবহার করেছেন অথবা নিয়মিত ব্যবহার করছেন। একই গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, অনেক ব্যবহারকারী ভেপের প্রকৃত স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা রাখেন না।
কীভাবে কাজ করে ভেপ?
ভেপের ভেতরে থাকা একটি বিশেষ তরল (ই-লিকুইড) ব্যাটারিচালিত যন্ত্রের মাধ্যমে গরম হয়ে বাষ্পে পরিণত হয়। ব্যবহারকারী সেই বাষ্প শ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে টেনে নেন। এই তরলে সাধারণত নিকোটিন, বিভিন্ন স্বাদের রাসায়নিক উপাদান এবং আরও কিছু রাসায়নিক মিশ্রণ থাকে।
কেন বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেপে থাকা নিকোটিন অত্যন্ত আসক্তিকর। এটি হৃদ্স্পন্দন ও রক্তচাপ বাড়াতে পারে। দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে হৃদ্যন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি হৃদ্রোগের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
এছাড়া ভেপে ব্যবহৃত বিভিন্ন ফ্লেভারিং কেমিক্যাল ফুসফুসের কোষে প্রদাহ ও জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করতে পারে। ফলে দীর্ঘদিন ব্যবহারকারীদের কাশি, শ্বাসকষ্ট, বুকব্যথা এবং ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
গবেষণায় আরও জানা গেছে, ভেপ ব্যবহারের সময় নিকেল, সীসাসহ বিভিন্ন ভারী ধাতু শরীরে প্রবেশ করতে পারে। এসব ধাতু দীর্ঘমেয়াদে ফুসফুসের ক্ষতি, কোষের অস্বাভাবিক পরিবর্তন এবং ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। দীর্ঘ সময় ভেপ ব্যবহারে এসব ক্ষতিকর ধাতুর সংস্পর্শও বাড়তে থাকে।
ক্যানসারের ঝুঁকি কতটা?
ভেপের সঙ্গে ক্যানসারের সম্পর্ক নিয়ে এখনও গবেষণা চলছে। প্রাণীর ওপর পরিচালিত কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে, ভেপের বাষ্প গ্রহণকারীদের মধ্যে ফুসফুস ও মূত্রথলির ক্যানসারের প্রবণতা বেশি ছিল। তবে মানুষের ক্ষেত্রে একই ধরনের প্রভাব নিশ্চিত করতে আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা।
ধূমপান ছাড়তে ভেপ কি কার্যকর?
কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে ভেপ ব্যবহার করে কিছু মানুষ ধূমপান ছাড়তে সক্ষম হয়েছেন। তবে অন্যদিকে অনেকেই ভেপ ব্যবহারের পাশাপাশি আবার সিগারেটেও আসক্ত হয়ে পড়েছেন। তাই চিকিৎসকদের পরামর্শ, ধূমপান ছাড়ার উপায় হিসেবে ভেপ ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সচেতনতাই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেপকে নিরীহ বা সম্পূর্ণ নিরাপদ বিকল্প হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। নিকোটিননির্ভর এই পণ্যের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব শরীরে স্থায়ী ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই সাময়িক কৌতূহল, স্বাদের আকর্ষণ বা বিনোদনের জন্য ভেপ ব্যবহার না করে স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ধূমপান ছাড়ার নিরাপদ পদ্ধতি অনুসরণ করাই সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত।
রোহান/সা.এ.
সর্বশেষ খবর