গরমের দিনে কিংবা আনন্দের মুহূর্তে শিশুদের হাতে এক কাপ আইসক্রিম তুলে দেওয়া যেন অনেক পরিবারেরই পরিচিত ছবি। কিন্তু আপনি যে খাবারটি কিনছেন, সেটি সত্যিই আইসক্রিম তো? নাকি সেটি আসলে ফ্রোজেন ডেসার্ট? দেখতে, স্বাদে এমনকি প্যাকেটেও অনেক সময় এ দুটির মধ্যে তফাত বোঝা কঠিন। অথচ উপাদান ও পুষ্টিগুণের দিক থেকে পার্থক্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
আইসক্রিম আর ফ্রোজেন ডেসার্টের মূল পার্থক্য কী?
সাধারণত আইসক্রিম তৈরি হয় দুধ, দুধের ফ্যাট (মিল্ক ফ্যাট), মিল্ক সলিড, চিনি এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক স্বাদের উপাদান যেমন চকোলেট, ভ্যানিলা, ফল বা বাদাম দিয়ে। অন্যদিকে, ফ্রোজেন ডেসার্টে দুধের ফ্যাটের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয় উদ্ভিজ্জ তেল—যেমন পাম অয়েল, পাম কার্নেল অয়েল বা সানফ্লাওয়ার অয়েল। এছাড়া এতে স্টেবিলাইজার, ইমালসিফায়ার, কৃত্রিম ফ্লেভার ও রংও বেশি ব্যবহৃত হতে পারে। এ কারণেই ফ্রোজেন ডেসার্টের উৎপাদন খরচ কম এবং বাজারমূল্যও সাধারণত আইসক্রিমের তুলনায় কম হয়।
পণ্য কেনার সময় কিছু বিষয়ের দিকে নজর রাখা উচিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে সহজ উপায় হলো প্যাকেটের গায়ে লেখা "Ice Cream" অথবা "Frozen Dessert" শব্দটি খেয়াল করা। কেনার আগে আরও যেসব বিষয় দেখবেন: উপাদানের তালিকায় প্রথমে Milk Fat নাকি Vegetable Oil লেখা আছে। অতিরিক্ত কৃত্রিম রং, ফ্লেভার বা স্টেবিলাইজারের পরিমাণ।পুষ্টিগুণের তথ্য (Nutrition Facts), উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ।
শিশুদের জন্য কোনটি বেশি নিরাপদ?
পুষ্টিবিদদের মতে, পরিমিত পরিমাণে ভালো মানের আইসক্রিম খাওয়া যেতে পারে। তবে ফ্রোজেন ডেসার্ট নিয়মিত খাওয়ানো ঠিক নয়। কারণ এতে অনেক সময় অতিরিক্ত চিনি, স্যাচুরেটেড ফ্যাট এবং আল্ট্রা-প্রসেসড উপাদান থাকে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) পরামর্শ দেয়, শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক—সবারই দৈনিক ফ্রি সুগার গ্রহণ মোট ক্যালোরির ১০ শতাংশের নিচে রাখা উচিত, আর ৫ শতাংশের নিচে রাখতে পারলে তা আরও উপকারী। অতিরিক্ত চিনি স্থূলতা, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, দাঁতের ক্ষয় এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, Ultra-Processed Foods (UPFs)—যার মধ্যে অনেক ধরনের ফ্রোজ়েন ডেসার্টও পড়ে—নিয়মিত খেলে স্থূলতা, হৃদ্রোগ, উচ্চ রক্তচাপ এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষজ্ঞরা তাই শিশুদের খাদ্যতালিকায় এ ধরনের প্রক্রিয়াজাত মিষ্টি খাবার সীমিত রাখার পরামর্শ দেন।
শিশুর মিষ্টি খাওয়ার ইচ্ছা পূরণ করতে ঘরেই সহজ কিছু স্বাস্থ্যকর বিকল্প তৈরি করা যায়। টক দই বা গ্রিক ইয়োগার্টের সঙ্গে আম, কলা বা বেরি ব্লেন্ড করে ফ্রিজে রেখে ফ্রোজেন ইয়োগার্ট। পাকা আম, তরমুজ বা স্ট্রবেরি দিয়ে ফলের পপসিকল। চিনি ছাড়া ফলের স্মুদি।কলা, খেজুর ও দুধ দিয়ে তৈরি ঠান্ডা শেক। মৌসুমি ফলের সালাদ বা দইয়ের সঙ্গে ফলের মিশ্রণ।
আইসক্রিম বা ফ্রোজেন ডেসার্ট—যাই কিনুন না কেন, শুধু মোড়কের ছবি দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন না। প্যাকেটের গায়ে কী লেখা আছে, উপাদান কী এবং কতটা চিনি রয়েছে—এসব দেখে তবেই কিনুন। শিশুদের জন্য মাঝে মধ্যে অল্প পরিমাণ ভালো মানের আইসক্রিম গ্রহণ করা যেতে পারে, তবে প্রতিদিনের অভ্যাসে পরিণত করা উচিত নয়। আর ফ্রোজেন ডেসার্ট খাওয়ার ক্ষেত্রে যতটা সম্ভব সংযমই সবচেয়ে নিরাপদ।
মনে রাখবেন, খাবারের স্বাদ যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার উপাদান ও পুষ্টিগুণও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। সচেতন সিদ্ধান্তই আপনার শিশুর সুস্থ ভবিষ্যৎ গড়তে সাহায্য করবে।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর