চুলের যত্নে তেল ব্যবহার নতুন কিছু নয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মা-দাদিদের পরামর্শ, নিয়মিত তেল মালিশ করলে চুল ঘন, মজবুত ও উজ্জ্বল থাকে। কিন্তু প্রশ্ন হলো— চুলে তেল দেওয়ার সবচেয়ে ভালো সময় কোনটি? রাতে, নাকি সকালে? এ নিয়ে অনেকের মধ্যেই দ্বিধা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু তেল মাখলেই হবে না; সঠিক সময়, সঠিক তেল এবং সঠিক পদ্ধতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
চুলে তেল মালিশ কেন উপকারী?
তেল সরাসরি চুল গজানোর ওষুধ নয়, তবে এটি চুল ও মাথার ত্বককে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। মাথার ত্বকে হালকা মালিশ করলে রক্তসঞ্চালন কিছুটা বাড়ে, ফলে চুলের গোড়ায় পুষ্টি পৌঁছাতে সুবিধা হয়। পাশাপাশি তেল চুলের আর্দ্রতা ধরে রাখে, রুক্ষতা কমায় এবং ভাঙা চুলের সমস্যা কমাতে সাহায্য করে।
বিশেষ করে নারকেল, আমলকি, বাদাম, আর্গান ও জোজোবা তেলে থাকা ফ্যাটি অ্যাসিড, ভিটামিন-ই এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট চুলের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে ভূমিকা রাখে।
রাতে তেল মাখলে কী উপকার?
অনেকেই রাতে ঘুমানোর আগে হালকা গরম তেল দিয়ে মাথায় মালিশ করেন। এতে মাথার ত্বক কিছুটা আরাম পায় এবং অনেকের ঘুমও ভালো হয়। রাতে তেল মাখলে আরো যেসকল উপকারিতা রয়েছে-মাথার ত্বকে আরাম দেয়, শুষ্ক চুলে আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে, হালকা মালিশ মানসিক চাপ কমাতেও সহায়ক হতে পারে।
তবে সারারাত তেল রেখে দেওয়ার অভ্যাস সবার জন্য উপযুক্ত নয়। অতিরিক্ত তেল ধুলাবালি আটকে দিতে পারে, তৈলাক্ত মাথার ত্বকে খুশকি বা চুলকানির সমস্যাও বাড়তে পারে।
সকালে তেল দেওয়া কি ভালো?
চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করেন, শ্যাম্পুর ৩০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা আগে তেল লাগানোই সবচেয়ে কার্যকর। এতে তেল চুলকে একটি সুরক্ষামূলক স্তর দেয় এবং শ্যাম্পুর সময় অতিরিক্ত শুষ্ক হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমে। যাদের মাথার ত্বক খুব তৈলাক্ত, তাদের জন্য রাতে তেল রেখে দেওয়ার চেয়ে এই পদ্ধতি বেশি উপযোগী হতে পারে।
কতক্ষণ তেল রাখবেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, চুলে তেল ৩০ মিনিট থেকে ২ ঘণ্টা রাখাই যথেষ্ট। সারারাত তেল রেখে দিলে অতিরিক্ত উপকার পাওয়া যায়—এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
২০১৫ সালে International Journal of Trichology-এ প্রকাশিত এক পর্যালোচনায় বলা হয়, মাথার ত্বকে নিয়মিত হালকা ম্যাসাজ রক্তসঞ্চালন বাড়াতে সাহায্য করতে পারে, যা চুলের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে। অন্যদিকে, নারকেল তেল নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এটি চুলের প্রোটিন ক্ষয় কমাতে অন্যান্য অনেক তেলের তুলনায় বেশি কার্যকর।
তবে বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট করে বলেন, তেল একাই নতুন চুল গজাতে পারে—এমন প্রমাণ এখনও নেই। চুল পড়ার কারণ যদি হরমোন, থাইরয়েড, রক্তস্বল্পতা বা পুষ্টির ঘাটতি হয়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।
কোন চুলে কোন তেল?
কোন চুলে কোন তেল মাখা উচিত তার একটি ধরণা দেওয়া হলো। শুষ্ক ও রুক্ষ চুল: নারকেল তেল, অলিভ অয়েল বা আর্গান অয়েল। কেমিক্যাল ট্রিটমেন্ট করা চুল: আর্গান বা বাদাম তেল। খুশকিপ্রবণ মাথার ত্বক: টি ট্রি অয়েল কয়েক ফোঁটা ক্যারিয়ার অয়েলের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করা যেতে পারে (সরাসরি নয়)। তৈলাক্ত মাথার ত্বক: অল্প পরিমাণ তেল ব্যবহার করুন এবং বেশিক্ষণ রাখবেন না।
তেল মাখার সময় যেসব ভুল করবেন না।
তা হলো-খুব বেশি তেল ব্যবহার করবেন না, নখ দিয়ে জোরে মাথা চুলকাবেন না। নোংরা মাথার ত্বকে তেল লাগাবেন না, তেল লাগানোর পর খুব শক্ত করে চুল বাঁধবেন না। প্রতিদিন শ্যাম্পু করার প্রয়োজন নেই; চুলের ধরন অনুযায়ী পরিষ্কার রাখুন।
শুধু তেল নয়, আরও যেগুলোও জরুরি আপনার চুলের জন্য
চুল ভালো রাখতে শুধু তেল নয়, খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনও গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত ডিম, মাছ, দুধ, ডাল ও বাদাম খান। আপনার খাবারে পর্যাপ্ত আয়রন, জিঙ্ক, বায়োটিন ও ভিটামিন-ডি নিশ্চিত করুন। প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান করুন। মানসিক চাপ কমান এবং পর্যাপ্ত ঘুমান।
চুলের যত্নে তেল অবশ্যই উপকারী, তবে এটি কোনো জাদুকরী সমাধান নয়। আপনার মাথার ত্বক ও চুলের ধরন অনুযায়ী তেল বেছে নিন। যদি মাথার ত্বক তৈলাক্ত হয়, তাহলে শ্যাম্পুর আগে স্বল্প সময়ের জন্য তেল লাগানো ভালো। আর শুষ্ক চুল হলে রাতে হালকা তেল লাগিয়ে কয়েক ঘণ্টা রাখা যেতে পারে। তবে চুল পড়া অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে বা মাথার ত্বকে সমস্যা দেখা দিলে অবশ্যই চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর