কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার ষোলনল ইউনিয়নের খাড়াতাইয়া পূর্বপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জরাজীর্ণ টিনশেড ভবনের ছাদ ফুটো ও বিভিন্ন অংশ ভেঙে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। সামান্য বৃষ্টি হলেই শ্রেণিকক্ষে পানি পড়ে বই-খাতা ভিজে যায়। আবার প্রচণ্ড গরমে বিদ্যালয়ের বৈদ্যুতিক পাখা চুরি হয়ে যাওয়ায় গাছতলায় বসেই পাঠদান চলছে। বৃষ্টি নামলে শিক্ষকদের ছাতা মাথায় নিয়ে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করাতে হচ্ছে। বিদ্যালয়ের এমন বেহাল অবস্থায় গত এক বছরে প্রায় ২০ জন শিক্ষার্থী অন্যত্র ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে প্রায় ১০০ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে।
সোমবার (২৭ জুলাই) দুপুরে সরেজমিনে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, বাঁশ ও টিন দিয়ে তৈরি প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ ফুট দীর্ঘ এবং ১২ থেকে ১৫ ফুট প্রশস্ত একটি একচালা টিনশেড ভবনে প্রাক-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ছয়টি শ্রেণির পাঠদান চলছে। জরাজীর্ণ ভবনের ঝুঁকির মধ্যেই শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
জানা যায়, গত শুক্রবার রাতে বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় মালামাল ও বৈদ্যুতিক পাখা চুরি হয়। এরপর থেকে প্রচণ্ড গরমে কখনো গাছতলায়, আবার কখনো শ্রেণিকক্ষে ছাতা মাথায় নিয়ে পাঠদান করতে হচ্ছে। বৃষ্টি শুরু হলেই টিনের ছাদের ফাঁক দিয়ে পানি পড়ে শিক্ষার্থীদের গায়ে, ভিজে যায় বই-খাতা এবং শ্রেণিকক্ষের মেঝেতে জমে পানি।
চুরির ঘটনার খবর পেয়ে বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেন বুড়িচং উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এ কে এম সাইফুল ইসলাম টিপু। তিনি বলেন, গ্রামের মানুষের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণের কাজ দীর্ঘদিন ধরে আটকে আছে। এর মধ্যেই বিদ্যালয়ে চুরির ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। দ্রুত তদন্ত করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি বিদ্যালয়ের ক্ষয়ক্ষতি পূরণ এবং শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা ও অভিভাবক জানান, কিছু ব্যক্তির দায়ের করা মামলার কারণে বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করা যাচ্ছে না। নতুন ভবনের অনুমোদন ও টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেও আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে। ফলে বছরের পর বছর ধরে জোড়াতালি দিয়ে জরাজীর্ণ ভবনেই শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাছরিন আক্তার ছাতা মাথায় দিয়ে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করাচ্ছেন। শিক্ষকরা জানান, প্রচণ্ড গরমে শিক্ষার্থীরা যেমন কষ্ট পাচ্ছে, তেমনি বৃষ্টি ও বজ্রপাতের সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কাও রয়েছে।
প্রধান শিক্ষক নাছরিন আক্তার বলেন, খাড়াতাইয়া গ্রামের বাসিন্দা ও ফকিরবাজার ইসলামিয়া সুন্নিয়া সিনিয়র মাদ্রাসার শিক্ষক মাহফুজুর রহমান বিদ্যালয়ের নির্মাণস্থলে তাদের জায়গা রয়েছে দাবি করে আদালতে মামলা করেছেন। সেই মামলার কারণে নতুন ভবনের কাজ বন্ধ রয়েছে। তিনি আরও বলেন, বিদ্যালয়টিতে শিক্ষক সংকট, জরাজীর্ণ ভবন, চুরিসহ নানা সমস্যা রয়েছে। বর্তমানে মাত্র তিনটি কক্ষে সব শ্রেণির পাঠদান পরিচালনা করতে হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, "এটি সম্ভবত বাংলাদেশের সবচেয়ে সমস্যাগ্রস্ত একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।"
শিক্ষকেরা জানান, বিদ্যালয়ের অব্যাহত দুরবস্থার কারণে গত এক বছরে প্রায় ২০ জন শিক্ষার্থী অন্যত্র চলে গেছে। বিদ্যালয়ের পরিবেশ অনুকূল না থাকায় অনেক অভিভাবক সন্তানদের এখানে ভর্তি করাতে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
এ বিষয়ে বুড়িচং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফওজিয়া আক্তার বলেন, বিদ্যালয়ের নতুন ভবনের টেন্ডার হয়েছিল। কিন্তু স্থানীয়দের দায়ের করা মামলার কারণে নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যায়। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং নতুন ভবনের জন্য পুনরায় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। চুরির ঘটনায় থানায় অভিযোগও করা হয়েছে।
বুড়িচং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানভীর হোসেন বলেন, "বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবহিত আছি এবং আজ বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেছি। জায়গা-সংক্রান্ত মামলার কারণে নতুন ভবনের টেন্ডারটি বাতিল হয়ে যায়। স্থানীয়দের আন্তরিক সহযোগিতা থাকলে নতুন ভবনের জন্য আবার আবেদন করা হবে। যেহেতু বর্তমান টিনশেড ভবনটি জরাজীর্ণ এবং বৃষ্টির কারণে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে, তাই সমস্যা সমাধানে এক মাস আগে বিদ্যালয়ের জন্য ৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ওই বরাদ্দ দিয়ে নতুন ঘর নির্মাণসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সংস্কারকাজ করা সম্ভব হবে।"
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর