• ঢাকা
  • ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬
  • শেষ আপডেট ৩৫ সেকেন্ড পূর্বে
শাহীন মাহমুদ রাসেল
কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ৩০ জুলাই, ২০২৬, ০২:২৪ দুপুর

ক্রিকেট মাঠ থেকে হয়ে উঠলেন ‘আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডন’

ছবি: প্রতিনিধি, বিডি২৪লাইভ

একসময় হাতে ছিল ক্রিকেট বল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা নেটে অনুশীলন করতেন। স্বপ্ন ছিল জাতীয় দলের জার্সি গায়ে চাপিয়ে দেশের হয়ে খেলার। কিন্তু কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই তরুণের হাতেই উঠে আসে অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র।

ক্রিকেট মাঠের সম্ভাবনাময় বাঁহাতি ‘চায়নাম্যান’ স্পিনার মোবারক হোসেন ইমন এখন পরিচিত চট্টগ্রামের আলোচিত সন্ত্রাসী ‘ডেভিড ইমন’ নামে। খুন, চাঁদাবাজি, অস্ত্রের মহড়া ও আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগে যার নাম উঠে এসেছে একের পর এক মামলায়। দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর অবশেষে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছেন তিনি।

বুধবার (২৯ জুলাই) ভোরে যশোর সদর উপজেলার ঝুমঝুমপুর এলাকায় যৌথ অভিযানে তিন সহযোগীসহ ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। চট্টগ্রাম জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), কোতোয়ালি মডেল থানা এবং যশোর জেলা পুলিশের সমন্বয়ে পরিচালিত অভিযানে তাকে আটক করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে তার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং প্রযুক্তিগত নজরদারির পর অবস্থান নিশ্চিত করে অভিযান চালানো হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের দাবি, ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার করা শুধু একজন আসামিকে আটক করার ঘটনা নয়, বরং চট্টগ্রামের সংগঠিত অপরাধচক্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তরে আঘাত হানা। তদন্তকারীদের মতে, তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও অনেক অপরাধী ও নেপথ্যের অর্থদাতাদের বিষয়ে নতুন তথ্য মিলতে পারে।

অনুসন্ধান ও স্থানীয়দের ভাষ্য, মোবারক হোসেন ইমনের শৈশব খুব একটা স্বচ্ছল ছিল না। পারিবারিক নানা সংকটের মধ্যেও তিনি পড়াশোনার পাশাপাশি ক্রিকেটকে আঁকড়ে ধরেছিলেন। পাড়ার মাঠে খেলতে খেলতেই তার স্পিন বোলিং নজর কাড়ে স্থানীয় কোচদের।

২০১৯ সালের দিকে তিনি ভর্তি হন চট্টগ্রামের ব্রাদার্স ক্রিকেট একাডেমিতে। নিয়মিত অনুশীলন করতেন বাকলিয়া স্টেডিয়াম ও কাজীর দেউড়ি এলাকায়। বাঁহাতি ‘চায়নাম্যান’ স্পিনার হিসেবে দ্রুত পরিচিতি পান। অনেকেই তার বোলিংয়ে ভারতের কুলদীপ যাদবের ছাপ দেখতে পেতেন। নিজেও কুলদীপকে অনুসরণ করতেন বলে জানায় তার সতীর্থরা।

ক্রিকেট-সংশ্লিষ্টদের ধারণা ছিল, পর্যাপ্ত সুযোগ পেলে জেলা কিংবা বিভাগীয় পর্যায় পেরিয়ে জাতীয় দল পর্যন্ত পৌঁছানোর সামর্থ্য ছিল তার।

ব্রাদার্স ক্রিকেট একাডেমির কোচ আমিনুল হক বলেন বলেন, ইমন ছিলেন অত্যন্ত শান্ত, ভদ্র ও স্বল্পভাষী একজন ক্রিকেটার। নিয়মিত অনুশীলন করতেন এবং নিজের উন্নতি নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন।

কোচের ভাষ্য, করোনার সময়ের পর থেকে তাকে আর অনুশীলনে দেখা যায়নি। প্রথমে ভেবেছিলাম হয়তো পড়াশোনা বা পরিবারের কারণে ক্রিকেট ছেড়ে দিয়েছে। পরে সংবাদমাধ্যমে 'ডেভিড ইমন' নামে খবর দেখে জানতে পারি, সেই ছেলেটিই মোবারক হোসেন ইমন।

একজন কোচের এই বিস্ময়ই বলে দেয়, কয়েক বছরের ব্যবধানে ইমনের জীবনে কত বড় পরিবর্তন ঘটে। ক্রিকেট থেকে অপরাধ জগতে ক্রিকেট ছেড়ে দেওয়ার পর ইমন কীভাবে অপরাধ জগতে জড়িয়ে পড়েন, সেটিই এখন তদন্তের অন্যতম বিষয়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর চট্টগ্রামের অপরাধ জগতে নতুন করে সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। একই সময়ে বিদেশে অবস্থানরত শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের গ্রুপের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার তথ্য পেতে শুরু করে গোয়েন্দারা।

তদন্ত কর্মকর্তাদের ভাষ্য, প্রথমদিকে তিনি মাঠপর্যায়ের কর্মী হিসেবে কাজ করলেও অল্প সময়ের মধ্যেই নিজেকে সাহসী ও ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে সক্ষম হিসেবে প্রমাণ করেন। এর ফলে বড় সাজ্জাদের আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন।

তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, অপরাধ জগতে প্রবেশের পর নিজের পরিচয় গোপন এবং আলাদা পরিচিতি তৈরির জন্য 'ডেভিড' নামটি ব্যবহার শুরু করেন ইমন। ধীরে ধীরে মোবারক হোসেন ইমন নামটি আড়ালে চলে যায়। অপরাধ জগৎ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এমনকি চাঁদাবাজির নেটওয়ার্কেও তিনি 'ডেভিড ইমন' নামেই পরিচিত হয়ে ওঠেন।

গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, বড় সাজ্জাদ গ্রুপ চট্টগ্রামের অন্যতম সক্রিয় সংগঠিত অপরাধচক্র। চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিপক্ষকে দমনে এই গ্রুপের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য বলছে, বায়েজিদ বোস্তামী, পাঁচলাইশ, বাকলিয়া, চান্দগাঁও, পতেঙ্গা, কোতোয়ালীসহ নগরের বিভিন্ন এলাকায় তাদের প্রভাব ছিল। জেলার রাউজান, হাটহাজারী ও ফটিকছড়িতেও সদস্যদের যাতায়াত ও যোগাযোগের তথ্য পেয়েছে গোয়েন্দারা। ছোট সাজ্জাদ ওরফে সাজ্জাদ হোসেন কারাগারে যাওয়ার পর মাঠপর্যায়ে বড় সাজ্জাদের হয়ে দায়িত্ব পালন শুরু করেন ডেভিড ইমন ও মোহাম্মদ রায়হান আলম।

পুলিশ কর্মকর্তাদের দাবি, ডেভিড ইমন অস্ত্র ব্যবহারে অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। তার কাছে বিভিন্ন সময় বিদেশি পিস্তল, শটগান ও অন্যান্য আগ্নেয়াস্ত্র দেখা গেছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, পুলিশের কাছে তার ১৫ থেকে ২০টি অস্ত্র হাতে থাকা বিভিন্ন সময়ের ছবি রয়েছে। এসব ছবি সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এগুলো থেকে তার সহযোগী, অবস্থান এবং যোগাযোগের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে।

তদন্তকারীরা বলছেন, শুধু মাঠপর্যায়ের সন্ত্রাস নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেও প্রভাব তৈরির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতেন ডেভিড ইমন। দামি পোশাক, বিলাসবহুল হোটেল, দামী ঘড়ি, গাড়ি এবং আগ্নেয়াস্ত্র হাতে ছবি ও ভিডিও নিয়মিত প্রকাশ করতেন তিনি। এসব পোস্টের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো এবং নিজের আধিপত্যের বার্তা দেওয়া হতো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পুলিশের নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট সংঘটিত আনিস ও মোহাম্মদ হাসান হত্যা মামলায় প্রথমবারের মতো তার নাম আসে। এরপর ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়া এলাকার আলোচিত জোড়া হত্যা মামলায় তাকে আসামি করা হয়। একই বছরের ২৩ মে রাতে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় সংঘটিত ঢাকাইয়া আকবর হত্যা মামলাতেও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। পরবর্তীতে নগরের চন্দনপুরা এলাকায় একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও চাঁদাবাজির অভিযোগেও তার নাম আলোচনায় আসে।

পুলিশ বলছে, এসব মামলার পাশাপাশি আরও কয়েকটি ঘটনায় তার সম্পৃক্ততার বিষয়ে তদন্ত চলছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, নির্মাণকাজ, পরিবহন এবং বিভিন্ন খাতের ব্যক্তিদের কাছ থেকে ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। যদিও এসব অভিযোগের অনেকগুলো এখনো বিচারাধীন। ফলে আদালতের চূড়ান্ত রায়ের আগে এগুলো অভিযোগ হিসেবেই বিবেচিত হবে।

পুলিশের তথ্য বলছে, চট্টগ্রামে একাধিক ঘটনার পর আত্মগোপনে চলে যান ডেভিড ইমন। অবস্থান পরিবর্তন করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় চলাফেরা করছিলেন। গোয়েন্দারা তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর, অনলাইন যোগাযোগ এবং সহযোগীদের ওপর নজরদারি চালান। কয়েক সপ্তাহ ধরে তথ্য সংগ্রহের পর নিশ্চিত হওয়া যায়, তিনি যশোরে অবস্থান করছেন। এরপর পরিকল্পনা অনুযায়ী ভোরে অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়।

তদন্ত কর্মকর্তাদের ধারণা, ডেভিড ইমনের জিজ্ঞাসাবাদে চট্টগ্রামের সংগঠিত অপরাধচক্র সম্পর্কে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে। বিশেষ করে বিদেশে অবস্থানরত অপরাধচক্রের নিয়ন্ত্রকদের সঙ্গে যোগাযোগ, অর্থের উৎস, অস্ত্র সরবরাহের রুট, সহযোগীদের পরিচয় এবং চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক সম্পর্কে তথ্য মিলতে পারে বলে আশা করছেন তারা।

একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা শুধু একজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করিনি। তার মাধ্যমে পুরো নেটওয়ার্কের চিত্র বের করে আনার চেষ্টা করছি।

স্থানীয় অনেকেই বলছেন, ইমন যদি ক্রিকেটেই থাকতেন, তাহলে হয়তো আজ অন্য পরিচয়ে পরিচিত হতেন। একসময় যিনি কুলদীপ যাদবের বোলিং নকল করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনুশীলন করতেন, সেই তরুণই কয়েক বছরের মধ্যে অস্ত্র হাতে নগরজুড়ে আতঙ্কের প্রতীক হয়ে ওঠেন।

তাদের মতে, তার এই পরিবর্তন শুধু একজন ব্যক্তির জীবনগাথা নয়। এটি সমাজের জন্যও একটি সতর্কবার্তা। খেলাধুলা, শিক্ষা কিংবা সৃজনশীল পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একজন তরুণ কীভাবে অপরাধচক্রের হাতে ব্যবহৃত হতে পারেন, সেই প্রশ্নও সামনে এনে দিয়েছে এই ঘটনা।

এখন তদন্তের পরবর্তী ধাপেই স্পষ্ট হবে, ডেভিড ইমন কেবল একটি সন্ত্রাসী গ্রুপের সক্রিয় সদস্য ছিলেন, নাকি তিনি নিজেই একটি বড় অপরাধ নেটওয়ার্কের অন্যতম পরিচালনাকারীতে পরিণত হয়েছিলেন। তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, যে হাত একসময় ক্রিকেট বলে স্পিনের জাদু দেখানোর স্বপ্ন দেখত, সেই হাতের সঙ্গে আজ যুক্ত হয়েছে খুন, চাঁদাবাজি ও সংগঠিত অপরাধের এক অন্ধকার অধ্যায়।

রোহান/সা.এ.

বিডি২৪লাইভ ডট কম’র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
পাঠকের মন্তব্য:


BD24LIVE.COM
bd24live.com is not only a online news portal. We are a family and work together for giving the better news around the world. We are here to give a nice and colorful media for Bangladesh and for the world. We are always going fast and get the live news from every each corner of the country. What ever the news we reached there and with our correspondents go there who are worked for bd24live.com.
BD24Live.com © ২০২০ | নিবন্ধন নং- ৩২
Developed by | EMPERORSOFT
এডিটর ইন চিফ: আমিরুল ইসলাম আসাদ
বাড়ি#৩৫/১০, রোড#১১, শেখেরটেক, ঢাকা ১২০৭
ই-মেইলঃ [email protected]
ফোনঃ (০২) ৫৮১৫৭৭৪৪
নিউজ রুমঃ ০৯৬০৩২০২৪৩৪
মফস্বল ডেস্কঃ ০১৫৫২৫৯২৫০২
বার্তা প্রধানঃ ০৯৬০৩১৫৭৭৪৪
ইমেইলঃ [email protected]