সারাদিনের কাজের পর ক্লান্ত লাগা স্বাভাবিক। কিন্তু পর্যাপ্ত ঘুমের পরও যদি সকালে উঠে শরীর অবসন্ন লাগে, কাজে মনোযোগ না থাকে কিংবা সারাক্ষণ দুর্বল মনে হয়, তাহলে বিষয়টি অবহেলা করা ঠিক নয়। এমন উপসর্গ অনেক সময় শরীরে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিন, খনিজ ও পুষ্টি উপাদানের ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীরের শক্তি উৎপাদন, পেশির কার্যক্ষমতা, মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা এবং রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা সচল রাখতে বিভিন্ন মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এসব উপাদানের ঘাটতি হলে দীর্ঘমেয়াদে ক্লান্তি, দুর্বলতা, মনোযোগের অভাব, এমনকি মানসিক অবসাদও দেখা দিতে পারে।
কেন ঘুমিয়েও ক্লান্ত লাগে?
শরীরের প্রতিটি কোষ শক্তি উৎপাদনের জন্য ভিটামিন, খনিজ ও প্রোটিনের ওপর নির্ভরশীল। পর্যাপ্ত পুষ্টি না পেলে কোষগুলো স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারে না। ফলে শরীরে শক্তি কমে যায় এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামের পরও ক্লান্তি কাটে না।
তবে শুধু পুষ্টির ঘাটতিই নয়, থাইরয়েডের সমস্যা, রক্তস্বল্পতা, ডায়াবেটিস, স্লিপ অ্যাপনিয়া, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ বা বিষণ্নতার কারণেও এমন সমস্যা হতে পারে। তাই ক্লান্তি দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
যেসব পুষ্টি উপাদানের ঘাটতিতে ক্লান্তি বাড়ে
১. ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স: ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স শরীরে কার্বোহাইড্রেট, চর্বি ও প্রোটিনকে শক্তিতে রূপান্তর করতে সাহায্য করে। বিশেষ করে ভিটামিন বি১২ ও ফলেটের অভাবে দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া এবং রক্তস্বল্পতা দেখা দিতে পারে।
যেসব খাবারে পাওয়া যায়: দুধ ও দই, পনির, ডিম, মাছ ও মাংস, ডাল, বিভিন্ন ধরনের বাদাম।
২. প্রোটিন: পেশি গঠন ও মেরামতের পাশাপাশি শরীরের শক্তি ধরে রাখতে প্রোটিন অপরিহার্য। পর্যাপ্ত প্রোটিন না খেলে পেশি ক্ষয় হতে শুরু করে, ফলে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে।খাবারের উৎস: মাছ, মুরগির মাংস, ডিম, ডাল, সয়াবিন, ছোলা, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার।
৩. ইলেকট্রোলাইট: শরীরে সোডিয়াম, পটাশিয়াম ও অন্যান্য ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য নষ্ট হলে ক্লান্তি, মাথা ঘোরা, পেশিতে টান এবং দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। অতিরিক্ত ঘাম, পর্যাপ্ত পানি না খাওয়া বা ডায়রিয়ার কারণে এই সমস্যা হতে পারে। যা খেতে পারেন: ডাবের পানি, কলা, তরমুজ, শসা, কমলা, লেবুর শরবত।
৪. ম্যাগনেশিয়াম: ম্যাগনেশিয়াম শরীরের শত শত জৈব-রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়। এটি পেশি ও স্নায়ুর স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখে এবং ভালো ঘুমেও সাহায্য করে।
উৎস: কাঠবাদাম, কাজুবাদাম, কুমড়ার বীজ, পালং শাক, তিল।
৫. আয়রন: আয়রনের অভাবে রক্তস্বল্পতা হয়, ফলে শরীরে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছায় না। এতে অল্প কাজেই হাঁপিয়ে যাওয়া, মাথা ঘোরা এবং সারাক্ষণ ক্লান্ত লাগতে পারে। বিশেষ করে নারীদের মধ্যে এ সমস্যা বেশি দেখা যায়। উৎস: কলিজা, লাল মাংস, পালং শাক, ডাল, খেজুর।
৬. ভিটামিন ডি: সূর্যালোকের অভাব বা ভিটামিন ডি কমে গেলে দীর্ঘদিন ধরে ক্লান্তি, শরীর ব্যথা এবং পেশির দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। উৎস: সকালের রোদ, সামুদ্রিক মাছ, ডিমের কুসুম, ফোর্টিফায়েড দুধ।
প্রতিদিন কী খেলে উপকার পাবেন?
ভারতীয় পুষ্টিবিদ লভনীত বাত্রার পরামর্শ অনুযায়ী দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন- এক কাপ টক দই বা প্রায় ১০০ গ্রাম পনির, অঙ্কুরিত ছোলা বা মুগ ডাল, প্রতিদিন অন্তত একটি ডিম, মাছ বা মাংস, একটি কলা, পর্যাপ্ত পানি ও ডাবের পানি, এক মুঠো বাদাম, কুমড়ার বীজ।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
যদি এমন হয়—দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ক্লান্তি থাকে, পর্যাপ্ত ঘুমের পরও অবসন্ন লাগে, ওজন কমতে থাকে, শ্বাসকষ্ট, বুক ধড়ফড় বা মাথা ঘোরা থাকে, বা দৈনন্দিন কাজকর্ম ব্যাহত হয়। তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় রক্ত পরীক্ষা (যেমন—CBC, আয়রন, ভিটামিন বি১২, ভিটামিন ডি, থাইরয়েড ও রক্তে শর্করার পরীক্ষা) করানো উচিত।
জীবনযাপনে আনুন ছোট কিছু পরিবর্তন: প্রতিদিন ৭–৯ ঘণ্টা ঘুমান। পর্যাপ্ত পানি পান করুন। অতিরিক্ত চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খান। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটুন বা ব্যায়াম করুন। মানসিক চাপ কমাতে ধ্যান বা শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করতে পারেন। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ভিটামিন বা সাপ্লিমেন্ট খাওয়া থেকে বিরত থাকুন।
রাতভর ঘুমিয়েও ক্লান্ত লাগা সব সময় সাধারণ বিষয় নয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি শরীরের গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদানের ঘাটতির লক্ষণ হতে পারে। তবে একই উপসর্গ বিভিন্ন রোগের কারণেও দেখা দিতে পারে। তাই দীর্ঘদিন ধরে এমন সমস্যা থাকলে নিজে থেকে ওষুধ না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে কারণ নির্ণয় করাই সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর উপায়।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর
লাইফ স্টাইল এর সর্বশেষ খবর