কেউ বিড়ালকে ভালোবাসেন তার নরম লোমের জন্য, কেউ মুগ্ধ হন তার রহস্যময় চোখে। আবার কারও কাছে বিড়াল মানেই ঘরের এক দুষ্টু সদস্য—যে কখনো আদর চায়, কখনো আবার নিজের মতো করে দূরে বসে থাকে। মানুষের সঙ্গে বিড়ালের এই অদ্ভুত সম্পর্কই তাকে অন্য অনেক পোষা প্রাণী থেকে আলাদা করেছে।
প্রতি বছর ৮ আগস্ট পালিত হয় আন্তর্জাতিক বিড়াল দিবস (International Cat Day)। বিড়ালের প্রতি মানুষের ভালোবাসা উদযাপনের পাশাপাশি তাদের কল্যাণ, নিরাপত্তা ও দায়িত্বশীলভাবে পালনের বিষয়ে সচেতনতা তৈরিই এ দিবসের অন্যতম উদ্দেশ্য।
বিশ্বের বহু দেশে বিড়াল অন্যতম জনপ্রিয় পোষা প্রাণী। বাংলাদেশেও দিন দিন বাড়ছে বিড়াল পালনের প্রবণতা। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে অনেক পরিবার এখন বিড়ালকে শুধু পোষা প্রাণী হিসেবে নয়, পরিবারের একজন সদস্য হিসেবেই দেখে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিড়াল নিয়ে নানা ভিডিও ও ছবি ব্যাপক জনপ্রিয়। বিড়ালের দুষ্টুমি, ঘুমানোর অদ্ভুত ভঙ্গি কিংবা মালিকের সঙ্গে তাদের মজার আচরণ সহজেই মানুষের মন জয় করে।
তবে বিড়াল পালনের সঙ্গে শুধু আদর নয়, দায়িত্বও জড়িত। নিয়মিত খাবার, পরিষ্কার পানি, নিরাপদ আশ্রয়, টিকা, চিকিৎসা এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা একজন দায়িত্বশীল মালিকের কর্তব্য।
এখানেই রয়েছে মজার ব্যাপার।
গবেষণা ও প্রাণী আচরণবিষয়ক পর্যবেক্ষণ থেকে জানা যায়, বিড়াল মানুষের সঙ্গে এমনভাবে যোগাযোগ করে, যা অনেক সময় আমাদের চোখে অদ্ভুত মনে হয়। বিড়াল হয়তো আপনাকে ‘মালিক’ হিসেবে নয়, বরং নিজের সামাজিক গোষ্ঠীর একজন সদস্য হিসেবে বিবেচনা করে।
আপনার দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করা বা slow blink করা বিড়ালের বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের অন্যতম নিদর্শন। অনেক প্রাণীবিশেষজ্ঞের মতে, বিড়ালের এই আচরণকে মানুষের ভাষায় এক ধরনের ‘আমি তোমাকে বিশ্বাস করি’ সংকেত হিসেবে দেখা যায়।
আপনার বিড়াল যদি আপনার পাশে এসে ঘুমায়, আপনাকে অনুসরণ করে বা আপনার কাছে এসে মাথা ঘষে—তাহলেও সেটি আপনার প্রতি তার স্বাচ্ছন্দ্য ও সামাজিক বন্ধনের ইঙ্গিত হতে পারে।
অর্থাৎ, বিড়াল হয়তো মানুষের মতো করে ভালোবাসা প্রকাশ করে না; কিন্তু নিজের ভাষায় সে যে আপনাকে আপন করে নিয়েছে, তার অনেক সংকেতই দেয়।
বিড়াল কেন মানুষের গায়ে গা ঘষে?
এটি বিড়ালের সবচেয়ে পরিচিত আচরণগুলোর একটি। অনেকেই মনে করেন, বিড়াল শুধু আদর পাওয়ার জন্য গা ঘষে। বিষয়টি আসলে আরও মজার।
বিড়ালের মুখ, গাল ও শরীরের বিভিন্ন অংশে সুগন্ধি গ্রন্থি থাকে। মানুষের পায়ে বা শরীরে গা ঘষার মাধ্যমে বিড়াল নিজের গন্ধ ছড়িয়ে দিতে পারে। এটি তাদের সামাজিক যোগাযোগ ও পরিচিতি তৈরির একটি উপায়।
তাই আপনার বিড়াল এসে পায়ে গা ঘষলে সেটি শুধু ‘আদর চাই’ এমন নয়; সে হয়তো আপনাকে নিজের পরিচিত ও নিরাপদ সামাজিক পরিবেশের অংশ হিসেবেও চিহ্নিত করছে।
তবে গা ঘষার কারণ সব সময় এক নয়। খাবার চাওয়া, মনোযোগ আকর্ষণ কিংবা অভ্যাস থেকেও বিড়াল এমন আচরণ করতে পারে।
বিড়ালকে দিনের বড় একটি অংশ ঘুমাতে দেখা যায়। প্রাপ্তবয়স্ক বিড়াল সাধারণত দিনে প্রায় ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত ঘুমাতে পারে, আর ছোট বিড়ালছানা আরও বেশি ঘুমায়।
এর পেছনে রয়েছে তাদের শিকারি প্রাণী হিসেবে বিবর্তনীয় বৈশিষ্ট্য। বন্য পরিবেশে শিকার ধরতে প্রচুর শক্তির প্রয়োজন হয়। তাই বিশ্রাম ও ঘুমের মাধ্যমে তারা শক্তি সঞ্চয় করে।
তবে ঘরের বিড়ালকে সারাদিন ঘুমাতে দেখে ভাবার কারণ নেই যে সে অলস। এটি তাদের স্বাভাবিক আচরণেরই অংশ।
বিড়াল আদর পেলে অনেক সময় ‘পিউরিং’ বা গরগর শব্দ করে। সাধারণত এটি আরাম, নিরাপত্তা ও সন্তুষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত।
তবে সব সময় আনন্দের কারণেই বিড়াল পিউর করে না। কখনো কখনো ভয়, উদ্বেগ, ব্যথা বা অসুস্থতার সময়ও তারা এই শব্দ করতে পারে। তাই আচরণের সঙ্গে পরিস্থিতিটিও বিবেচনা করা জরুরি।
বিড়াল কি সত্যিই মানুষের কথা বোঝে?
বিড়াল মানুষের ভাষা পুরোপুরি বোঝে না, কিন্তু তারা মানুষের কণ্ঠস্বর, শব্দ, আচরণ ও দৈনন্দিন রুটিনের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যায়।
নাম ধরে ডাকলে সাড়া দেওয়া, খাবারের প্যাকেটের শব্দ শুনে ছুটে আসা কিংবা দরজার শব্দ শুনে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে চিনে ফেলা—এসবই তাদের শেখার ক্ষমতার উদাহরণ।
অনেক বিড়াল তাদের মালিকের কণ্ঠস্বরও আলাদা করে চিনতে পারে। তবে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সাড়া না দেওয়াটা বিড়ালের স্বভাবের অংশ হতে পারে!
কুকুরের মতো বিড়াল সব সময় মালিকের মনোযোগের জন্য ছুটে আসে না। কখনো সে কোলে উঠে আদর নেবে, আবার কিছুক্ষণ পরই নিজের মতো করে জানালার পাশে বসে থাকবে।
এই স্বাধীনচেতা আচরণই সম্ভবত বিড়ালকে এত আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
এক মুহূর্তে সে আপনার কোলে ঘুমাচ্ছে, পরের মুহূর্তেই টেবিলের ওপর থাকা কোনো জিনিস মেঝেতে ফেলে দিচ্ছে—তারপর এমনভাবে তাকাবে, যেন কিছুই ঘটেনি!
দিবসটি কেন গুরুত্বপূর্ণ?
আন্তর্জাতিক বিড়াল দিবস শুধু বিড়ালের ছবি পোস্ট করার দিন নয়। এর মাধ্যমে প্রাণীর প্রতি মানবিক আচরণ, দায়িত্বশীল পোষ্য পালন এবং পরিত্যক্ত বা অসহায় বিড়ালের প্রতি সহানুভূতির কথাও মনে করিয়ে দেওয়া হয়।
রাস্তায় থাকা বিড়ালদের অনেকেই খাবার, চিকিৎসা ও নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবে নানা সমস্যায় পড়ে। তাদের প্রতি নিষ্ঠুরতা না করে সম্ভব হলে খাবার, পানি ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। আর কেউ বিড়াল পোষার সিদ্ধান্ত নিলে সেটি যেন সাময়িক শখ না হয়ে দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
বিড়াল হয়তো আপনার ডাকে প্রতিবার ছুটে আসবে না। আপনার কথা শুনেও কখনো এমন ভাব করবে, যেন সে কিছুই শোনেনি। কিন্তু তার নিজের ভাষায় সে হয়তো আপনাকে অনেক কিছুই বলছে।
আপনার পায়ে গা ঘষা, ধীরে চোখ বন্ধ করা, পাশে এসে ঘুমানো কিংবা আপনার কাছেই নিশ্চিন্তে বসে থাকা—এসব ছোট ছোট আচরণের মধ্যেই লুকিয়ে থাকতে পারে তার বিশ্বাস ও আপন করে নেওয়ার গল্প।
তাই আন্তর্জাতিক বিড়াল দিবসে শুধু একটি ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট নয়—ঘরের কিংবা রাস্তায় থাকা এই প্রাণীগুলোর প্রতিও একটু মানবিক হওয়াই হতে পারে দিবসটির সবচেয়ে সুন্দর উদযাপন।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর