কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন শুধু লেখা, ছবি কিংবা কোড তৈরির প্রযুক্তি নয়; জীববিজ্ঞানের জটিল ক্ষেত্রেও এর ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। আর সেই অগ্রগতিই নতুন করে তৈরি করেছে নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন। গবেষকরা এআই ব্যবহার করে এমন ১৬টি নতুন ভাইরাস তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন, যেগুলো ল্যাবরেটরিতে পুনরুৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে।
গবেষকদের দাবি, এই প্রযুক্তি অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, একই প্রযুক্তির অপব্যবহার হলে ভবিষ্যতে গুরুতর জৈবনিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
কীভাবে এআই দিয়ে ভাইরাস তৈরি হলো?
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির গবেষণায় ‘ইভো১’ (Evo1) ও ‘ইভো২’ (Evo2) নামের এআই মডেল ব্যবহার করা হয়েছে। সাধারণ ভাষাভিত্তিক এআই মডেলের মতো এগুলো মানুষের ভাষা বিশ্লেষণের জন্য তৈরি নয়। বরং ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, উদ্ভিদ ও মানুষের জেনেটিক কোডের মতো জৈবিক তথ্য বিশ্লেষণ ও অনুমানের জন্য মডেলগুলোকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
‘সায়েন্স’ জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, গবেষকরা এআইয়ের মাধ্যমে ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমিত করতে পারে এমন ব্যাকটেরিওফাজের শত শত জিনোম নকশা তৈরি করেন। সেগুলোর মধ্যে ১৬টি ল্যাবরেটরিতে কার্যকর হিসেবে প্রমাণিত হয়।
ব্যাকটেরিওফাজ হলো এমন এক ধরনের ভাইরাস, যা ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমিত করে। অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে ব্যাকটেরিওফাজ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণা চলছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন সম্ভাবনা: গবেষকদের মতে, এআইয়ের সাহায্যে নতুন ব্যাকটেরিওফাজ তৈরি করার সক্ষমতা ভবিষ্যতে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী সংক্রমণের চিকিৎসায় নতুন পথ দেখাতে পারে।
স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক ব্রায়ান হি বলেন, জেনারেটিভ এআই দিয়ে এমন জটিল জৈবিক নকশা তৈরি করা প্রযুক্তির সক্ষমতার একটি নতুন ধাপ। তাঁর মতে, সম্পূর্ণ একটি জিনোমের নকশা তৈরি করে সেটিকে এমন পর্যায়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে, যেখানে তা প্রতিলিপি তৈরি করতে এবং কোষের ভেতরে নির্দিষ্ট কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে। তবে এই সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হয়েছে বিপরীত আশঙ্কাও।
‘নতুন প্রাণ’ তৈরির ঝুঁকি কতটা?
সিন্থেটিক বায়োলজি বা কৃত্রিম জীববিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে বিজ্ঞানীরা এমন জীব বা জৈবিক কাঠামো তৈরির সক্ষমতা অর্জন করছেন, যার প্রাকৃতিক অস্তিত্ব আগে ছিল না। এআই এই প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত ও সহজ করে তুলতে পারে—এমন সম্ভাবনাই বিশেষজ্ঞদের উদ্বিগ্ন করছে।
‘সায়েন্স’ জার্নালে গবেষণাটির সঙ্গে প্রকাশিত এক মন্তব্যে জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর হেলথ সিকিউরিটির ডা. টমাস ইংলেসবি ও ডা. মরিটজ হাঙ্কে বিষয়টিকে জরুরি জৈবনিরাপত্তা ও বায়োসিকিউরিটি প্রশ্ন হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তাদের মতে, এখন প্রশ্ন শুধু জেনারেটিভ এআই দিয়ে ভাইরাসের জিনোম নকশা করা সম্ভব কি না—তা নয়। বরং এই প্রযুক্তি কীভাবে এমনভাবে ব্যবহার করা যায়, যাতে তা মানুষের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ না হয়, সেটিই বড় বিষয়।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, রোগ সৃষ্টি করতে সক্ষম নতুন ভাইরাস নিয়ে এ ধরনের পরীক্ষা করা উচিত নয়।
গবেষক ব্রায়ান হি জানিয়েছেন, তাঁদের এআই প্রশিক্ষণের তথ্যভান্ডার থেকে জটিল জীবকে সংক্রমিত করতে সক্ষম ভাইরাসগুলো বাদ দেওয়া হয়েছিল। গবেষণার ক্ষেত্রও ব্যাকটেরিওফাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়।
তাঁর দাবি, পুরো গবেষণা একটি সুরক্ষিত ল্যাবরেটরিতে পরিচালিত হয়েছে এবং প্রযুক্তির ব্যবহার যেন ইতিবাচক উদ্দেশ্যেই হয়, তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে এআই যত বেশি শক্তিশালী হচ্ছে, ততই এর নিয়ন্ত্রণ ও অপব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে।
জৈবপ্রযুক্তির পাশাপাশি এআইয়ের অন্যান্য ক্ষেত্রেও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের নজির রয়েছে। সম্প্রতি চ্যাটজিপিটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই একটি অভ্যন্তরীণ সাইবার নিরাপত্তা পরীক্ষার ঘটনা প্রকাশ করে। সেখানে একটি পরীক্ষামূলক মডেল নির্ধারিত পরিবেশের বাইরে গিয়ে অন্য একটি এআই ডেভেলপারের সিস্টেমে প্রবেশের চেষ্টা করেছিল বলে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে।
ওপেনএআইয়ের ওই পরীক্ষায় ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিষ্ক্রিয় রাখা হয়েছিল। পরীক্ষামূলক মডেলটি সেই সুযোগে নির্ধারিত ডিজিটাল পরিবেশের বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করে। ঘটনাটিকে প্রতিষ্ঠানটি নজিরবিহীন বলে উল্লেখ করে এবং ভবিষ্যৎ এআই মডেলের সক্ষমতা ও ঝুঁকি মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেয়।
একদিকে এআই যদি অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী সংক্রমণের বিরুদ্ধে নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি তৈরিতে সহায়তা করতে পারে, অন্যদিকে একই প্রযুক্তি অনিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যবহৃত হলে তা জৈবনিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
তাই বিজ্ঞানীদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এআইয়ের ক্ষমতা কতটা বাড়ানো সম্ভব, তা নয়; বরং সেই ক্ষমতা কীভাবে নিরাপদ ও দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করা যাবে।
সূত্র: নিউইয়র্ক পোস্ট, বিবিসি
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর