বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের আখাউড়া ও শায়েস্তাগঞ্জের বিভিন্ন দপ্তরে প্রশাসনিক কার্যক্রম, জনবল ব্যবস্থাপনা, দায়িত্ব বণ্টন এবং কর্মচারীদের বেতন-ভাতা সংক্রান্ত নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এরই ধারাবাহিকতায় আখাউড়া দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উচ্চমান সহকারী মো. ইছরাইল মিয়ার বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, ক্ষমতার অপব্যবহার, কর্মচারীদের হয়রানি, নিয়মবহির্ভূতভাবে দায়িত্ব গ্রহণ এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ এনে রেলপথ মন্ত্রণালয়সহ সরকারের ১৭টি দপ্তরে লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, মো. ইছরাইল মিয়ার মূল পদ টাইমকিপার। তিনি প্রথমে এসএসএই/ওয়ে/শ্রীমঙ্গল দপ্তরে টাইমকিপার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরে তাঁকে আখাউড়া দপ্তরে অফিস সহকারী (ভারপ্রাপ্ত) এবং পরবর্তীতে উচ্চমান সহকারী (ভারপ্রাপ্ত) হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
অভিযোগে বলা হয়েছে, কমন পদ বিধিমালা-২০১৯ অনুযায়ী একজন টাইমকিপারকে উচ্চমান সহকারীর দায়িত্ব দেওয়ার সুযোগ নেই। অথচ বিভাগীয় প্রকৌশলী-২, ঢাকা-এর নিয়ন্ত্রণাধীন তিনজন উচ্চমান সহকারী ও ১০ জন অফিস সহকারী থাকা সত্ত্বেও টাইমকিপারকে ওই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে প্রশাসনিক বিধি লঙ্ঘনের পাশাপাশি অবৈধ আর্থিক লেনদেনের কথাও উল্লেখ করেছেন।
ফিক্সেশন, পেনশন ও টিএ বিল নিয়ে ঘুষের অভিযোগ অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, সার্ভিস বুক সংরক্ষণ, পে-ফিক্সেশন, উচ্চতর গ্রেড নির্ধারণ, বদলি, টিএ বিল, ছুটি, অবসর ও পারিবারিক পেনশনের ফাইল নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে নিয়মিত অর্থ দাবি করা হতো।
নবনিয়োগপ্রাপ্ত ওয়েম্যানদের সার্ভিস বুক সংরক্ষণের জন্য জনপ্রতি ৫০০ টাকা এবং পে-ফিক্সেশনের জন্য ৩ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে,২০১৪ সালে নিয়োগপ্রাপ্ত ওয়েম্যানদের ১০ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেড নির্ধারণের জন্য জনপ্রতি ৫ হাজার টাকা দাবি করা হয়েছে, টিএ বিল প্রক্রিয়াকরণের ক্ষেত্রে মোট প্রাপ্য অর্থের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত অগ্রিম নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ,চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের টিএ বিল পাসে ৩০ শতাংশ কমিশন এবং এলএপি ছুটি অনুমোদনের ক্ষেত্রেও অর্থ আদায়ের অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, যারা অর্থ দিয়েছেন তাদের ফাইল দ্রুত নিষ্পত্তি হলেও অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানানো কর্মচারীদের ফাইল দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।হেমারম্যানের বেতন ফিক্সেশন ঝুলে থাকার অভিযোগ
হেমারম্যান মো. তাজুল ইসলাম অভিযোগ করেন, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে পদোন্নতি পেয়ে ১৮তম গ্রেডে যোগদান করলেও প্রায় আড়াই বছর ধরে তাঁর বেতন ফিক্সেশন সম্পন্ন হয়নি। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র একাধিকবার জমা দেওয়ার পরও বিষয়টি নিষ্পত্তি না হওয়ায় তিনি এখনো ২০তম গ্রেড অনুযায়ী বেতন পাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন। এতে তিনি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলেও দাবি করেন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, এলএপি ছুটি অনুমোদনের জন্য তাঁর কাছে ৫ হাজার টাকা দাবি করা হয়েছিল। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের পর তাঁকে বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করেন।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ভারপ্রাপ্ত কার্পেন্টার হেলপার বাদল মিয়াকে দীর্ঘ ছয় মাস ২০ দিন অনুপস্থিত থাকার পরও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সনদ ছাড়া যোগদান করানো হয়েছে।
এ ছাড়া ওয়েম্যান মো. মাহবুব আহমেদের চাকরি ছাড়ার সময় ৩০ হাজার টাকা দাবি করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে অবসরপ্রাপ্ত ও মৃত কর্মচারীদের পারিবারিক পেনশনের কাগজপত্র প্রস্তুত ও নিষ্পত্তির ক্ষেত্রেও অর্থ দাবি করার অভিযোগ রয়েছে।
মো. ইছরাইল মিয়ার বিরুদ্ধে চাকরির আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে আখাউড়া এলাকায় জমি ক্রয়, বাড়ি নির্মাণ এবং বাজারে দোকানঘর নির্মাণের অভিযোগও আনা হয়েছে। অভিযোগকারীরা তাঁর সম্পদের উৎস অনুসন্ধানের দাবি জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ঐক্য পরিষদ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া শাখার পক্ষ থেকে রেলপথ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক, পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক, প্রধান প্রকৌশলী, প্রধান সংস্থাপন কর্মকর্তা, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জেলা প্রশাসক, বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপকসহ মোট ১৭টি দপ্তরে অভিযোগের অনুলিপি পাঠানো হয়েছে। অভিযোগে বিভাগীয় তদন্ত, সম্পদের উৎস অনুসন্ধান এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে।
এদিকে পৃথক অভিযোগে ওয়েম্যান মো. জুনায়েদ মিয়া দাবি করেন, দক্ষ অফিস সহকারী থাকা সত্ত্বেও একজন টাইমকিপারকে উচ্চমান সহকারীর দায়িত্ব দেওয়ায় দাপ্তরিক কাজ, বেতন-ভাতা সংক্রান্ত ফাইল নিষ্পত্তি এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে বিলম্ব ও হয়রানি বাড়ছে। পাশাপাশি টাইমকিপারের সংকট থাকা সত্ত্বেও তাঁকে অন্য দায়িত্বে রাখায় জনবল ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী, আখাউড়া মো. আবু হানিফ পাশা বলেন, মো. ইছরাইল মিয়াকে কীভাবে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানেন না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এ সংক্রান্ত দপ্তরাদেশ বিভাগীয় প্রকৌশলী-২, ঢাকা জারি করেছেন।
বিভাগীয় প্রকৌশলী-২, ঢাকা আহসান হাবিব বলেন, টাইমকিপার ব্লক পদ নয়। আমরা তাকে পদোন্নতি দিইনি। নিজ দায়িত্বের অতিরিক্ত হিসেবে উচ্চমান সহকারীর দায়িত্ব পালন করতে বলা হয়েছে। এ দায়িত্ব পালনের জন্য তিনি কোনো অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা পাবেন না।
অন্যদিকে, মো. ইছরাইল মিয়া তাঁর বিরুদ্ধে আনা ঘুষ গ্রহণ, ক্ষমতার অপব্যবহার, কর্মচারী হয়রানি ও অন্যান্য সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর