সন্তানের পড়াশোনা, খাওয়াদাওয়া, স্কুল, টিউশন, খেলাধুলা—সবকিছুর খেয়াল রাখতে গিয়ে বাবা-মায়ের দিনের বড় একটা সময় কেটে যায় সন্তানের পেছনেই। তবু অনেক বাবা-মায়ের অভিযোগ, সন্তান আগের মতো কথা শুনছে না, অল্পতেই রেগে যাচ্ছে কিংবা ক্রমশ একগুঁয়ে হয়ে উঠছে। কিন্তু সন্তানের সঙ্গে সারাদিন থাকা আর তার সঙ্গে মানসম্মত সময় কাটানো—দুটি এক বিষয় নয়। বাবা-মা পাশে থাকলেও যদি সেই সময়ের বড় অংশ চলে যায় মোবাইল, অফিসের কাজ, ঘরের দায়িত্ব বা পড়াশোনার তাগাদায়, তাহলে সন্তানের সঙ্গে গভীর যোগাযোগ তৈরি নাও হতে পারে।
শিশু বা কিশোরের আচরণে নানা কারণ কাজ করতে পারে। বয়সের পরিবর্তন, স্কুলের চাপ, বন্ধুত্ব, পারিবারিক পরিবেশ কিংবা নিজের আবেগ প্রকাশে অসুবিধা—সবই এর পেছনে থাকতে পারে। তবে সন্তানের সঙ্গে নিয়মিত মনোযোগী যোগাযোগ তার মানসিক নিরাপত্তা ও পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করতে সহায়ক।
এই জায়গাতেই আলোচনায় আসে ‘৭-৭-৭’ পদ্ধতি।
৭-৭-৭ কোনো জাদুকরী ফর্মুলা নয়। এটি মূলত সন্তানের সঙ্গে প্রতিদিন অল্প সময় হলেও নিয়মিত, মনোযোগী ও ইতিবাচক যোগাযোগ তৈরি করার একটি সহজ কাঠামো।
এর ধারণাটি হলো—৭ মিনিট কথা বলা, ৭ মিনিট একসঙ্গে কিছু করা, ৭ মিনিট মন দিয়ে শোনা।
অর্থাৎ মোট ২১ মিনিট সন্তানের জন্য আলাদা করে রাখা। এই সময়ে বাবা-মায়ের মনোযোগ থাকবে সন্তানের দিকে। মোবাইল দেখা, অফিসের কাজ করা বা অন্য কোনো বিষয়ে ব্যস্ত থাকার বদলে সন্তানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করাই হবে মূল লক্ষ্য। তবে এর অর্থ এই নয় যে ২১ মিনিট পালন করলেই শিশুর জেদ বা আচরণগত সমস্যা নিশ্চিতভাবে দূর হয়ে যাবে। বরং নিয়মিত এমন সময় কাটানোর মাধ্যমে বাবা-মা সন্তানের অনুভূতি, চিন্তা ও প্রয়োজন সম্পর্কে আরও ভালোভাবে জানতে পারেন এবং সম্পর্কের ভিত শক্ত করতে পারেন।

কেন ‘কোয়ালিটি টাইম’ এত গুরুত্বপূর্ণ?
সন্তানের সঙ্গে সময় কাটানোর সময় শুধু তাকে পড়তে বসানো, খেতে বলা বা গোসল করানোর মতো দায়িত্ব পালন করাই যথেষ্ট নয়। কোয়ালিটি টাইমে সন্তানের সঙ্গে এমনভাবে যোগাযোগ করা হয়, যাতে সে অনুভব করে—তার কথা শোনা হচ্ছে এবং তাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এই সময় শিশুকে প্রশ্ন করা, তার কথা মন দিয়ে শোনা, তার পছন্দ-অপছন্দ নিয়ে আলোচনা করা কিংবা একসঙ্গে কোনো ছোট কাজ করাও হতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সন্তানের কথা বলার সময় সঙ্গে সঙ্গে বকাঝকা, বিচার বা সমাধান চাপিয়ে না দেওয়া।
সকালে ৭ মিনিট: দিনের শুরুটা হোক ইতিবাচকভাবে
সকালের ব্যস্ততায় দূর থেকে চিৎকার করে নির্দেশ দেওয়ার বদলে কয়েক মিনিট সন্তানের পাশে বসতে পারেন।
জিজ্ঞেস করতে পারেন—আজ স্কুলে কী আছে? কোনো বিশেষ পরিকল্পনা আছে? কোন বিষয়টি নিয়ে সে সবচেয়ে বেশি আগ্রহী? সকালে তার মন কেমন?
সন্তানের বয়স অনুযায়ী হালকা গল্প করতে পারেন। ছোট্ট একটি আলিঙ্গন, উৎসাহের কথা কিংবা মন দিয়ে তার কথা শোনাও দিনের শুরুটা ইতিবাচক করে তুলতে পারে।
স্কুল থেকে ফেরার পর ৭ মিনিট: প্রশ্নের বদলে শুনুন
স্কুল থেকে ফিরে অনেক শিশুই ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত বা বিরক্ত থাকতে পারে। এ সময় দরজা খুলতেই ‘আজ কী পড়ালে?’, ‘হোমওয়ার্ক করেছ?’, ‘পরীক্ষায় কত পেয়েছ?’—এমন একের পর এক প্রশ্ন করলে সে আরও বিরক্ত হতে পারে। তার বদলে কিছুক্ষণ স্বাভাবিক হতে দিন। পছন্দের খাবার দিতে পারেন, পাশে বসে গল্প করতে পারেন এবং স্বাভাবিকভাবে জানতে পারেন তার দিনটি কেমন গেল। সে যদি কোনো খারাপ অভিজ্ঞতার কথা বলে, সঙ্গে সঙ্গে ‘এটা তো কিছুই হয়নি’ বা ‘তোমারই ভুল’ না বলে আগে তার অনুভূতিটা বোঝার চেষ্টা করুন।
রাতে ৭ মিনিট: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে এই সময়
ঘুমানোর আগে পরিবেশ সাধারণত তুলনামূলক শান্ত থাকে। তাই দিনের এই সময়টিতে অনেক শিশু বা কিশোর নিজের কথা সহজে বলতে পারে। বিছানার পাশে বসে দিনের ভালো-মন্দ নিয়ে গল্প করতে পারেন। সে কোনো সমস্যা, বন্ধুত্ব, ভয়, ভবিষ্যতের স্বপ্ন কিংবা স্কুলের কোনো ঘটনা শেয়ার করলে মন দিয়ে শুনুন। সব কথার সমাধান সঙ্গে সঙ্গে করে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। অনেক সময় সন্তান শুধু চায়, বাবা-মা তার কথা শুনুক।
৭-৭-৭ পদ্ধতিতে যা করা উচিৎ হবে না, তা হলো-
এই ২১ মিনিটকে আবার পড়াশোনা, শাসন বা উপদেশ দেওয়ার সময়ে পরিণত করলে উদ্দেশ্যটাই নষ্ট হতে পারে।
তাই এ সময়—বারবার মোবাইল দেখবেন না। সন্তানের কথা মাঝপথে থামাবেন না। প্রতিটি সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করবেন না। অন্য শিশুর সঙ্গে তুলনা করবেন না। সামান্য ভুলের জন্য বকাঝকা করবেন না। সন্তানের অনুভূতিকে ‘অযথা আবেগ’ বলে উড়িয়ে দেবেন না। বরং তার বয়স ও পরিস্থিতি অনুযায়ী তাকে নিজের কথা বলার সুযোগ দিন।

তাহলে, একসঙ্গে যেসকল কাজ করতে পারি।
৭ মিনিটের ‘একসঙ্গে কিছু করার’ অংশটি খুব সহজ হতে পারে। শিশুর বয়স ও পছন্দ অনুযায়ী—বোর্ড গেম খেলতে পারেন, ছবি আঁকতে পারেন, গল্পের বই পড়তে পারেন, ঘরের ছোট কোনো কাজে তাকে সঙ্গে নিতে পারেন, বারান্দায় বা বাইরে একটু হাঁটতে পারেন, তার পছন্দের কোনো বিষয় নিয়ে গল্প করতে পারেন, একসঙ্গে গান শুনতে পারেন ইত্যাদি।
মূল বিষয় কাজটি কী, তা নয়; সেই সময়ে বাবা-মায়ের মনোযোগ কতটা সন্তানের দিকে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুর জেদ বা অবাধ্যতার পেছনে সবসময় বাবা-মায়ের সঙ্গে দূরত্ব দায়ী নয়। বয়স অনুযায়ী স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, ক্ষুধা, ঘুমের অভাব, স্কুলের চাপ, বন্ধুদের সঙ্গে সমস্যা কিংবা আবেগ নিয়ন্ত্রণে অসুবিধাও আচরণ পরিবর্তনের কারণ হতে পারে। তাই আচরণে পরিবর্তন দেখলেই সন্তানকে ‘জেদি’ বা ‘খারাপ’ বলে চিহ্নিত না করে তার আচরণের পেছনের কারণ বোঝার চেষ্টা করা জরুরি।
যদি দীর্ঘদিন ধরে শিশুর আচরণে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়, সে অতিরিক্ত রেগে থাকে, নিজেকে গুটিয়ে নেয়, ঘুম বা খাওয়ার ধরনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে কিংবা স্কুল ও দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হয়, তাহলে শিশু বিশেষজ্ঞ বা শিশু-কিশোর মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
সন্তানের সঙ্গে প্রতিদিন ২১ মিনিট কাটানো কোনো ‘ম্যাজিক’ সমাধান নয়। তবে প্রতিদিন নির্দিষ্ট কিছু সময় সন্তানের জন্য আলাদা করে রাখা বাবা-মায়ের সঙ্গে তার সম্পর্ককে আরও উষ্ণ ও যোগাযোগপূর্ণ করে তুলতে পারে। কারণ সন্তানকে শুধু ভালো স্কুল, ভালো খাবার বা প্রয়োজনীয় জিনিস দেওয়াই যথেষ্ট নয়। তার কথা শোনা, অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া এবং তাকে বোঝার চেষ্টা করাও সুস্থ বেড়ে ওঠার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তাই ঘড়ির কাঁটা ধরে ঠিক ২১ মিনিট না হলেও, প্রতিদিন কিছুটা সময় পুরোপুরি সন্তানের জন্য রাখুন। হয়তো এই ছোট্ট অভ্যাসেই বদলাবে আপনার সঙ্গে সন্তানের কথোপকথন—আর ধীরে ধীরে আরও সুন্দর হবে সম্পর্ক।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর