একসময় পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য নগরীর স্বীকৃতিতে দেশজুড়ে প্রশংসিত হয়েছিল রাজশাহী। ২০১৬ সালের সেই সুনাম এখন অনেকটাই ম্লান। নগরীর বিভিন্ন স্থানে যত্রতত্র বর্জ্য, সড়ক ও ফুটপাত দখল, নির্মাণকাজের ধুলাবালি এবং যানবাহনের ধোঁয়ায় বাড়ছে দূষণ। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে নগরীর বিনোদনকেন্দ্রগুলোও।
সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় রাজশাহীর বিভিন্ন পার্ক, নদীতীর ও বিনোদনকেন্দ্রে অস্বাস্থ্যকর মাত্রার বায়ুদূষণের চিত্র উঠে এসেছে। ‘রাজশাহী নগরীর বিনোদনমূলক স্থানগুলো বায়ুর গুণমান: আদর্শ একিউআই মাত্রা অতিক্রমকারী পার্টিকুলেট ম্যাটার ও গ্যাসীয় দূষকবিষয়ক একটি সমীক্ষা’ শীর্ষক গবেষণায় এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
গবেষণার ফল অনুযায়ী, পদ্মা গার্ডেন, শহীদ জিয়া শিশু পার্ক, রাজশাহী কেন্দ্রীয় বোটানিক্যাল গার্ডেন ও চিড়িয়াখানা, মুক্তমঞ্চ, গোদাগাড়ীর সরমংলা ইকো পার্ক এবং সাফিনা পার্ক—এই ছয়টি বিনোদনকেন্দ্রের বায়ুর মান অস্বাস্থ্যকর পর্যায়ে রয়েছে। ফলে নির্মল বাতাস ও শরীরচর্চার আশায় এসব স্থানে যাওয়া মানুষও সূক্ষ্ম কণাসহ বিভিন্ন দূষকের সংস্পর্শে পড়ছেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, বিনোদনকেন্দ্রের ভেতরের কর্মকাণ্ডই শুধু দূষণের জন্য দায়ী নয়। বাতাসের গতিপথ ও ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গেও দূষণের মাত্রার সম্পর্ক রয়েছে। তাঁর মতে, অপরিকল্পিত নির্মাণ, যানবাহনের ধোঁয়া, শিল্পকারখানার নির্গমন এবং নগরীর সবুজ এলাকা ও জলাশয় কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে রাজশাহীতে সড়ক, ফ্লাইওভার ও ভবন নির্মাণসহ নানা অবকাঠামোগত কাজ বেড়েছে। এসব কর্মকাণ্ড থেকে বিপুল পরিমাণ ধুলা ও সূক্ষ্ম কণা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে। গবেষণার সঙ্গে যুক্ত রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সুমাইয়া তাবাসসুম জানান, প্রতিটি এলাকায় সম্ভাব্য দূষণের উৎস আলাদাভাবে চিহ্নিত ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, পদ্মা আবাসিক এলাকার আরডিএ পার্কের পাশ দিয়ে চলাচলকারী বাসের ধোঁয়া সরাসরি পার্ক এলাকায় প্রবেশ করছে। এর কাছাকাছি একটি বর্জ্য ফেলার স্থান থাকায় সেখান থেকেও দূষণের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
তবে গবেষণায় কার্বন ডাইঅক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, মিথেন ও সালফার ডাইঅক্সাইডসহ কয়েকটি গ্যাসীয় দূষক পরিমাপ করা হয়নি বলেও জানান তিনি। ফলে গবেষণার ফল বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে ঋতুভেদে বায়ুর পরিবর্তন বিবেচনায় নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু বিনোদনকেন্দ্র পরিষ্কার রাখলেই সমস্যার সমাধান হবে না; আশপাশের সড়ক, যানবাহন, নির্মাণকাজ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকেও একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। গবেষণায় ব্যস্ত সময়ে বিনোদনকেন্দ্রের আশপাশে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত ধুলা দমন এবং ঘন ও বহুস্তরীয় বৃক্ষবেষ্টনী গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি বায়ুর মান নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং দূষণের উৎস চিহ্নিত করতে আরও বিস্তৃত গবেষণার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
একসময় যে নগরী পরিচ্ছন্নতা ও বাসযোগ্যতার উদাহরণ হয়ে উঠেছিল, সেই রাজশাহীর বিনোদনকেন্দ্রগুলোতেই যদি দূষণের মাত্রা অস্বাস্থ্যকর পর্যায়ে পৌঁছে, তাহলে নগরীর পরিবেশগত ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
সালাউদ্দিন/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর