জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) একমাত্র ছাত্রী আবাসিক হল নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী হলে খাবার ও রান্নার গ্যাস সংকটে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন আবাসিক শিক্ষার্থীরা। গ্যাসের অভাবে নিজেদের রান্না করতে না পারার পাশাপাশি হলের একমাত্র ক্যান্টিনের খাবারের মান নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ। ফলে খাবারের কথা ভাবলেই আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন অনেক শিক্ষার্থী। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে খাবার কিনে খাচ্ছেন, আবার অনেকে না খেয়েই থাকছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
হল সূত্রে জানা গেছে, ১৬ তলা ভবনের পঞ্চম তলা থেকে আবাসিক কার্যক্রম শুরু হলেও সেখানে রয়েছে তীব্র আবাসন সংকট। মূল নকশায় চারজনের থাকার ব্যবস্থা থাকা কক্ষগুলোতে বর্তমানে প্রায় আটজন করে ছাত্রীকে থাকতে হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রতি ফ্লোরে গড়ে শতাধিক শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছে মাত্র চারটি গ্যাসের চুলা ও সাতটি বাথরুম।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, দিনের অধিকাংশ সময় হলে গ্যাস থাকে না। কখনো রাত ২টা বা ৩টার দিকে অল্প সময়ের জন্য গ্যাস এলেও সারাদিন ক্লাস, পরীক্ষা ও টিউশন শেষে তখন রান্না করার মতো শক্তি থাকে না। এর মধ্যে হলে ইলেকট্রিক কুকার ব্যবহারেরও অনুমতি নেই। ফলে চারটি চুলায় ৮৮ থেকে ১০০ জন শিক্ষার্থীকে রান্না করতে হচ্ছে।
দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও অনেকে রান্নার সুযোগ পাচ্ছেন না। এমনকি বাড়ি থেকে রান্না করে আনা খাবারও গ্যাসের অভাবে গরম করে খেতে পারছেন না শিক্ষার্থীরা।
কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের ১৬তম আবর্তনের শিক্ষার্থী সুইটি বলেন, “জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র ছাত্রী হলের ক্যান্টিনে এখন তিন বেলা খেয়ে বেঁচে থাকাই দায় হয়ে গেছে। একদিকে গ্যাসের সমস্যা, মেয়েরা যে নিজে রান্নাবান্না করবে তার কোনো সুযোগ নেই। রাত দুইটা বা তিনটায় গ্যাস আসে। তার ওপর ক্যান্টিনের মামারা যা ইচ্ছা তাই রান্না করে, সে খাবার শিক্ষার্থীরা কোনোভাবেই খেতে পারে না। খাবারগুলো মুখে তোলা যায় না। মেয়েদের সেমিস্টার পরীক্ষা থাকে, ক্লাস থাকে; খেয়ে না খেয়ে সবাই অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। মানুষের মৌলিক প্রয়োজন হচ্ছে খাবার, কিন্তু এই খাবারটাই তারা এখানে পাচ্ছে না। প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, দ্রুত এ বিষয়ে কাজ করা হোক।”
গ্যাস সংকটের কারণে ক্যান্টিনের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়লেও খাবারের মান নিয়ে সন্তুষ্ট নন শিক্ষার্থীরা। তাদের অভিযোগ, খাবারের মধ্যে প্রায়ই মাছি ও পোকামাকড় পাওয়া যায়। শাকসবজি ঠিকমতো পরিষ্কার বা কাটা হয় না। অনেক সময় মাছ-মাংস ও ভাত আধাসিদ্ধ থাকে এবং খাবার থেকে দুর্গন্ধ বের হয়।
অর্থনীতি বিভাগের ১৬তম আবর্তনের এক শিক্ষার্থী বলেন, “আমাদের হলের সবচেয়ে বড় সমস্যা খাবারের মান। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দিকটা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। কারণ খাবারের মধ্যে প্রায়ই পোকামাকড় পাওয়া যায়। ক্যান্টিনে খাবার খুবই অল্প পরিমাণে পরিবেশন করা হয়। আমাদের দাবি, খাবারের পরিমাণ বাড়ানো হোক। যেহেতু গ্যাসের সমস্যার জন্য আমরা নিজেরা রান্না করতে পারছি না, তাই আমাদের বাধ্য হয়েই ক্যান্টিনে খেতে হচ্ছে।”
১৮তম ব্যাচের শিক্ষার্থী সনিয়া বলেন, “সবচেয়ে বড় সমস্যা রান্নাঘরে যাওয়া যায় না। গ্যাসের সংকটের কারণে রান্না করা সম্ভব হয় না। এর পাশাপাশি হলে কোনো ইলেকট্রিক কুকারও ব্যবহার করতে দেওয়া হয় না। ক্যান্টিনের খাবারের মান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তারা শুধু বলে ‘ঠিক করব, ঠিক করব’। হয়তো দুই-তিন দিন একটু ভালো থাকে, পরবর্তীতে আবার আগের মতো হয়ে যায়। খাবার কোনোভাবেই মুখে দেওয়া যায় না এবং বিভিন্ন খাবারে সবসময় পোকামাকড় পাওয়া যায়। ঠিকমতো খেতে না পারায় আমরা শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছি।”
দীর্ঘ তিন বছর ধরে হলে অবস্থানরত এক শিক্ষার্থী বলেন, “তিন বছর ধরে এই হলে আছি, কিন্তু সবচেয়ে বাজে খাবারের কারণে চরম দুর্ভোগ ইদানীং টের পাচ্ছি। ক্যান্টিনের খাবারের মান এত নিম্ন পর্যায়ে নেমেছে যে, ওই খাবার আমাকে খেতে হবে ভাবতেই আতঙ্ক লাগে। বাইরে থেকে বাধ্য হয়ে খাবার কিনে খাচ্ছি, যা আমার আর্থিক সংকট আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। ক্যান্টিনে এত কম পরিমাণ রান্না করা হয় যে খাবার দ্রুত শেষ হয়ে যায় এবং ইদানীং আমাদের না খেয়ে থাকতে হচ্ছে।”
খাবারের মান নিয়ে শিক্ষার্থীদের অসন্তোষের বিষয়ে হল সংসদের সহসভাপতি (ভিপি) জান্নাতুল উম্মি তারিন বলেন, “আমাদের হলের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি ছিল ক্যান্টিনের খাবারের মান। বিষয়টি নিয়ে ভিপি, জিএস ও এজিএস মিলে কাজ শুরু করি। হল প্রভোস্টের উপস্থিতিতে হল সংসদ ও দুইজন হাউস টিউটরের সমন্বয়ে ক্যান্টিন কমিটি গঠন করা হয় এবং নিয়মিত কাঁচাবাজার ও ক্যান্টিন মনিটরিং করা হয়।”
তিনি বলেন, “এরপরও গত এক মাসে খাবারের মান ক্রমাগত খারাপ হওয়ায় হল সংসদের উদ্যোগে গণস্বাক্ষর কর্মসূচি পালন করা হয়। এতে প্রায় সব ছাত্রীই খাবারের মান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং অধিকাংশই বর্তমান ক্যান্টিন মামাকে পরিবর্তনের পক্ষে মত দেন। পরে ক্যান্টিন কমিটি ও হল সংসদের জরুরি সভায় তাকে পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে খাবারের মান উন্নয়নের জন্য ১৫ দিনের সময় দেওয়া হয়েছে।”
শিক্ষার্থীদের অভিযোগের বিষয়ে হল প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. আঞ্জুমান আরা বলেন, “ক্যান্টিনের ক্যাটারারকে আজ সকালে আমি ১৫ দিন সময় দিয়েছি। তাকে বলেছি, ১৫ দিনের মধ্যে খাবারের মানসহ সার্বিক বিষয়ে প্রয়োজনীয় সংশোধন না হলে টেন্ডারের মাধ্যমে নতুন ক্যাটারার নিয়োগ দেওয়া হবে।”
তিনি আরও বলেন, “হল সংসদ গণস্বাক্ষর জমা দিয়েছে। তবে মেয়েদের একটি বড় অংশ বর্তমান ক্যাটারারকে বাদ দিতে চায় না; তারা মূলত খাবারের মান উন্নত করার দাবি জানিয়েছে। এখন দেখা যাক, ১৫ দিনের মধ্যে সে কী করে।”
শিক্ষার্থীদের দাবি, আবাসন সংকটের পাশাপাশি রান্নার গ্যাস ও খাবারের এ সমস্যা দ্রুত সমাধান করা না হলে তাদের পড়াশোনা ও স্বাভাবিক জীবনযাপন আরও ব্যাহত হবে। নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর খাবার নিশ্চিত করার পাশাপাশি রান্নার গ্যাস সংকট নিরসনে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর
ক্যাম্পাস এর সর্বশেষ খবর