যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা বাণিজ্য উত্তেজনা এবার নতুন মোড় নিয়েছে। শেষ মুহূর্তের সমঝোতা ব্যর্থ হওয়ায় কানাডার পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হয়েছে। এর পাল্টা জবাব হিসেবে মার্কিন পণ্যে একই হারে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যত ডলারের শুল্ক আরোপ করবে, কানাডাও তত ডলারের জবাব দেবে।
শুক্রবার (২১ আগস্ট) মধ্যরাতের নির্ধারিত সময়সীমার আগমুহূর্তে দুই দেশের বাণিজ্য আলোচনা ভেস্তে যায়। এরপর কানাডা আলোচনাই স্থগিত করে। কার্নির ভাষ্য, শেষ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত শর্তে যে পরিবর্তন আনা হয়েছে, তা কানাডার জন্য অন্যায্য ও অর্থনৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য। একই সঙ্গে এসব পরিবর্তন ভবিষ্যৎ কোনো চুক্তির ওপর আস্থার প্রশ্নও তৈরি করেছে।
কার্নি বলেন, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও তা কানাডীয়দের স্বার্থ রক্ষার জন্য যথেষ্ট ছিল না। তাই কানাডীয় আলোচকদের অটোয়ায় ফিরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
২০ বিলিয়ন ডলারের পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক
চুক্তি না হওয়ায় শনিবার থেকে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের কানাডীয় পণ্যে ৫০ শতাংশ মার্কিন শুল্ক কার্যকর হয়েছে। এতে কানাডার যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা মোট পণ্যের আনুমানিক ৫ শতাংশ প্রভাবিত হবে। তালিকায় রয়েছে বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য, দুগ্ধজাত পণ্য, সিমেন্ট, পোশাক, হকি সরঞ্জামসহ নানা পণ্য।
নতুন শুল্কের বাইরে কানাডার ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, গাড়ি ও কাঠসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাত এরই মধ্যে মার্কিন শুল্কের আওতায় রয়েছে। ফলে কানাডার রপ্তানিনির্ভর শিল্পগুলোর ওপর চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জামিসন গ্রিয়ার অবশ্য আলোচনার ব্যর্থতার দায় কানাডার ওপর চাপিয়েছেন। তাঁর দাবি, চুক্তির ভিত্তি হিসেবে যেসব বিষয়ে দুই দেশ প্রায় একমত হয়েছিল, শেষ মুহূর্তে কানাডার নতুন দাবি এবং কিছু প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসার কারণে সেই সমঝোতা আর টেকেনি।
চুক্তির কাছাকাছি গিয়েও কেন ভাঙল আলোচনা
আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার ঘটনাটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ কয়েক দিন আগেও দুই দেশের কর্মকর্তারা একটি সমঝোতার ব্যাপারে বেশ আশাবাদী ছিলেন। আলোচনায় কানাডার ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর মার্কিন শুল্ক কমানো এবং গাড়ি খাতে তুলনামূলক কম শুল্ক দেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছিল।
এর বিনিময়ে ওয়াশিংটন কানাডার বাজারে মার্কিন পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানোসহ বেশ কিছু ছাড় চেয়েছিল। বিশেষ করে মার্কিন মদজাতীয় পণ্য কানাডার দোকানে ফের বিক্রির সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
কানাডার বিভিন্ন প্রদেশ ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতির প্রতিবাদে মার্কিন মদজাতীয় পণ্য দোকানের তাক থেকে সরিয়ে নিয়েছিল। ফলে বিষয়টি দুই দেশের বাণিজ্য আলোচনায় প্রতীকী ও অর্থনৈতিক—দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
‘শুল্কের জবাব শুল্কে’
কার্নির পাল্টা শুল্কের ঘোষণাকে সমর্থন জানিয়েছেন কানাডার কয়েকজন প্রাদেশিক নেতা। বিশেষ করে দেশটির সবচেয়ে জনবহুল প্রদেশ অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ড বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের জবাব ‘ট্যারিফ ফর ট্যারিফ, ডলার ফর ডলার’ হওয়া উচিত।
কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়া প্রদেশের প্রিমিয়ার ডেভিড এবিও কঠোর অবস্থানের পক্ষে কথা বলেছেন। তাঁর বক্তব্য, কানাডার নম্রতাকে যেন কোনোভাবেই দুর্বলতা হিসেবে দেখা না হয়।
তবে এই পাল্টাপাল্টি শুল্ক দুই দেশের ব্যবসা ও ভোক্তাদের জন্য কতটা ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
অর্থনীতিতে বড় ধাক্কার আশঙ্কা
কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। কানাডার মোট রপ্তানির বড় অংশই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারনির্ভর। ফলে দীর্ঘস্থায়ী বাণিজ্য সংঘাত হলে কানাডার উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগে চাপ তৈরি হতে পারে।
কানাডীয় ব্যবসায়ী মহল ইতোমধ্যে নতুন শুল্ক নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। কানাডিয়ান চেম্বার অব কমার্স এটিকে উত্তর আমেরিকার প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার জন্য বড় ধরনের আঘাত হিসেবে বর্ণনা করেছে।
অর্থনীতিবিদদের বিভিন্ন হিসাবেও সম্ভাব্য ক্ষতির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। নতুন শুল্কের কারণে কানাডায় বিপুলসংখ্যক কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়তে পারে এবং দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও কমে যেতে পারে।
বিশেষ করে অন্টারিওর গাড়ি ও উৎপাদনশিল্প, কুইবেকের শিল্প খাত এবং ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার রপ্তানিনির্ভর ব্যবসাগুলো সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়তে পারে।
সম্পর্কের নতুন অধ্যায়
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার। সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পণ্য ও অর্থের লেনদেন হয় দুই দেশের মধ্যে। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে শুল্কনীতিকে কেন্দ্র করে সেই সম্পর্ক ক্রমেই টানাপোড়েনের দিকে গেছে।
সাম্প্রতিক আলোচনার ব্যর্থতা সেই উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিল। আপাতত নতুন কোনো বাণিজ্য আলোচনা নির্ধারিত নেই। ফলে দুই দেশের মধ্যে শুল্কযুদ্ধ কতদূর গড়াবে এবং শেষ পর্যন্ত একটি নতুন সমঝোতা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
কার্নির জন্যও এটি বড় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরীক্ষা। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার প্রয়োজন, অন্যদিকে দেশের ব্যবসা ও কর্মসংস্থান রক্ষায় কঠোর অবস্থান নেওয়ার চাপ—দুই দিকই সামলাতে হবে কানাডার প্রধানমন্ত্রীকে।
এখন প্রশ্ন একটাই—‘ডলার ফর ডলার’ পাল্টা শুল্ক কি কানাডাকে আরও শক্ত অবস্থানে নিয়ে যাবে, নাকি উত্তর আমেরিকার দুই ঘনিষ্ঠ অর্থনীতিকেই ঠেলে দেবে দীর্ঘস্থায়ী বাণিজ্যযুদ্ধের দিকে?
সূত্র: বিবিসি
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর