চীনের তৈরি পঞ্চম প্রজন্মের জে-৩৫ স্টেলথ যুদ্ধবিমান পাকিস্তানের হাতে গেলে নতুন ধরনের হুমকি তৈরি হতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ভারত। তবে এই হুমকি মোকাবিলায় ভারতীয় বিমানবাহিনীর প্রয়োজনীয় সক্ষমতা রয়েছে বলে দাবি করেছেন বাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল এ পি সিং।
একই সঙ্গে পঞ্চম প্রজন্মের নিজস্ব যুদ্ধবিমান তৈরি, নতুন যুদ্ধবিমান সংগ্রহ এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, আগামী ৮ অক্টোবর ভারতীয় বিমানবাহিনীর ৯৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এ উপলক্ষে গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন এ পি সিং।
তিনি জানান, যুদ্ধবিমান স্কোয়াড্রনের সংখ্যা কমে যাওয়া ঠেকাতে ভারতীয় বিমানবাহিনীতে বছরে ৩৬ থেকে ৪০টি নতুন যুদ্ধবিমান যুক্ত করা প্রয়োজন। পরিকল্পনা অনুযায়ী সবকিছু এগোলে বছরে ৩০ থেকে ৩৫টি যুদ্ধবিমান যুক্ত করা শুরু হতে পারে।
হিন্দুস্তান অ্যারোনটিকস লিমিটেড (এইচএএল) বছরে সর্বোচ্চ ২৪টি এলসিএ মার্ক-১এ যুদ্ধবিমান সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এ পি সিং বলেন, এইচএএল বছরে ২০টি বিমান তৈরি করলেও এবং মাল্টি-রোল ফাইটার এয়ারক্রাফট (এমআরএফএ) চুক্তি চলতি বছরের শেষ নাগাদ চূড়ান্ত হলেও বছরে প্রায় ৩২টি যুদ্ধবিমান যুক্ত হতে পারে।
এমআরএফএ কর্মসূচির আওতায় বছরে প্রায় ১২টি যুদ্ধবিমান পাওয়ার কথা রয়েছে ভারতের। এই কর্মসূচিতে ১১৪টি রাফাল যুদ্ধবিমান কেনার প্রস্তাব রয়েছে। এর সঙ্গে অতিরিক্ত ১২টি সুখোই-৩০ যুদ্ধবিমান কেনার প্রস্তাবও রয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী সরবরাহ শুরু হলে বছরে নতুন যুদ্ধবিমান যুক্ত করার সংখ্যা ৩০ থেকে ৩৫-৪০টিতে পৌঁছাতে পারে।
ভারতীয় বিমানবাহিনী প্রধান বলেন, বাহিনীর বহরে তিন থেকে চার ধরনের যুদ্ধবিমান থাকা সুবিধাজনক। এতে বিভিন্ন ধরনের সামরিক দায়িত্ব কার্যকরভাবে পালন করা সম্ভব হবে। ভবিষ্যতে এলসিএ তেজস মার্ক-১এ, এলসিএ মার্ক-২, রাফাল এবং দেশীয় পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান অ্যাডভান্সড মিডিয়াম কমব্যাট এয়ারক্রাফট বা এএমসিএকে বহরে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
পাকিস্তান চীনের তৈরি জে-৩৫ যুদ্ধবিমান কেনার পথে এগোচ্ছে—এমন খবরের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে এ পি সিং বলেন, বিষয়টি ভারতের জন্য উদ্বেগের।
তবে শুধু একটি নতুন যুদ্ধবিমান হাতে পেলেই প্রতিপক্ষ বড় সুবিধা পেয়ে যাবে—এমনটা মনে করেন না তিনি। তাঁর মতে, কোনো যুদ্ধবিমান কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করে পুরো সামরিক ব্যবস্থার সঙ্গে সেটিকে কীভাবে সমন্বয় করা হচ্ছে তার ওপর।
এ পি সিং বলেন, অতীতেও পাকিস্তানের হাতে বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধবিমান ছিল। কিন্তু অপারেশন সিন্দুরের সময় সেগুলো দিয়ে তারা উল্লেখযোগ্য কিছু করতে পারেনি। একইভাবে ভারত নিজেদের যুদ্ধবিমান ও অন্যান্য সামরিক সক্ষমতাকে কার্যকরভাবে সমন্বয় করতে পারলে নতুন ধরনের হুমকিও মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।
তবে প্রতিপক্ষ পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান পেয়ে গেলে ভারতেরও পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের প্রয়োজনীয়তা আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে বলে জানান তিনি।
এদিকে ভারতীয় বিমানবাহিনী দূরপাল্লার আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ার আর-৩৭এম এবং ফ্রান্সের মিটিওর ক্ষেপণাস্ত্রের আরও চালান কেনার বিষয়টি ভারত বিবেচনা করছে।
গত বছর পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘাতের পর ভারতীয় বিমানবাহিনীর ‘বিয়ন্ড ভিজ্যুয়াল রেঞ্জ’ বা বিভিআর সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। এ পি সিং বলেন, অ্যাস্ট্রা ক্ষেপণাস্ত্রের বিভিন্ন সংস্করণের পাশাপাশি বিদেশি ক্ষেপণাস্ত্রের অতিরিক্ত চালানও বিমানবাহিনীর তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটাতে সহায়তা করবে।
অ্যাস্ট্রা মার্ক-১-এর পাল্লা ৮০ থেকে ১১০ কিলোমিটার। উন্নত অ্যাস্ট্রা মার্ক-২-এর পাল্লা প্রায় ২০০ কিলোমিটার করা হয়েছে। এর পরবর্তী সংস্করণ অ্যাস্ট্রা মার্ক-৩-এর পাল্লা ৩৫০ কিলোমিটারের বেশি হতে পারে। চলতি বছরের শুরুতে এর জন্য সলিড ফুয়েল ডাক্টেড র্যামজেট প্রযুক্তির উড্ডয়ন পরীক্ষা চালিয়েছে ভারতের প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা (ডিআরডিও)।
ড্রোন ও লইটারিং মিউনিশনের সংখ্যাও বাড়াতে চায় ভারতীয় বিমানবাহিনী। তবে এ জন্য আলাদা কোনো ড্রোন বাহিনী গঠনের প্রয়োজন নেই বলে জানিয়েছেন এ পি সিং।
তিনি বলেন, আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক শক্তির বড় অংশ এখন আকাশ ও মহাকাশভিত্তিক প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল। উন্নত যুদ্ধবিমান, দূরপাল্লার নির্ভুল অস্ত্র, সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষা, কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং চালকবিহীন আকাশযান—সব মিলিয়ে ভবিষ্যতের যুদ্ধ সক্ষমতা গড়ে উঠবে এসব প্রযুক্তির সমন্বয়ে।
এ পি সিংয়ের মতে, নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরা নিতে এবং অন্যের চাপ মোকাবিলা করতে হলে একটি দেশের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী থাকা জরুরি। আর সাম্প্রতিক সংঘাতগুলো দেখিয়েছে, সেই সামরিক শক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে বিমান শক্তি।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর