২০২৪ সালের ২৮ অক্টোবর বান্দরবানের লামায় বিভাগীয় কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন মোস্তাফিজুর রহমান। এর মধ্যেই তার বিরুদ্ধে ব্যক্তি মালিকানাধীন প্লটের জোত পারমিট দেখিয়ে হাজার হাজার ঘনফুট গাছ পাচার করাসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।
সংশ্লিষ্ট ভুক্তভোগীরা সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে প্রধান বন সংরক্ষকসহ দুদকে নানা অনিয়মের অভিযোগ দেন। ফলে তার বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটিসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাকে ভর্ৎসনা কিংবা সাবধান করলেও তিনি শোধরাননি বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
তারা বলেন, উল্টো গাছ পাচার চক্রের সঙ্গে হাত মিলিয়ে নামে-বেনামে জোত পারমিট দেখিয়ে গাছ পাচার করাতেই সবচেয়ে বেশি পারদর্শী হয়ে উঠেছেন তিনি। ওই কর্মকর্তা অদৃশ্য শক্তিবলে সবসময় থেকেছেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় বনকর্মকর্তা কিংবা প্রধান বন সংরক্ষকের আশীর্বাদপুষ্ট। এই কারণে গত দুই বছর ধরে লামার বনাঞ্চল ধ্বংস করে চললেও একবারের জন্যও তাকে বদলি কিংবা শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়নি। ফলে নিজস্ব একটি গাছ পাচার চক্রের সঙ্গে হাত মিলিয়ে নীরবে লুটপাট করে যাচ্ছেন তিনি। তার ক্ষমতার ভয়ে কেউ প্রকাশ্যে প্রতিবাদ না জানালেও আড়ালে-আবডালে তাকে 'গাছ চোর' বলে সম্বোধন করেন তার সহকর্মীসহ বনের সঙ্গে জড়িত লোকজন।
অনুসন্ধান ও বন বিভাগের বর্তমান-সাবেক কর্মকর্তা-কর্মচারী, মাঠপর্যায়ের বনকর্মী এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, অনিয়ম দুর্নীতির মাধ্যমে মোস্তাফিজুর রহমান এখন কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। ফলে গাছ রক্ষাকারী ব্যক্তিটিই হয়ে উঠেছেন গাছ পাচারকারী হিসেবে!
লামার ইয়াংছা মৌজার একটি ব্যক্তি মালিকানাধীন জোত পারমিট ঘিরে বন বিভাগের নথি ও মাঠের বাস্তবতার মধ্যে বড় ধরনের অমিলের অভিযোগ উঠেছে।
প্রতিবেদকের হাতে আসা নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২২ জুন জোতটির জন্য ফ্রি পারমিট নম্বর ৫০/লামা অব ২০২২-২৩ ইস্যু করা হয়। জোতের মালিক ইয়াংছা মৌজার আব্দুল কাদেরের ছেলে মো. নেজাম উদ্দিন (হোল্ডিং নম্বর আর/৪৩৮)। জোতের শিডিউলে সেগুন ও গামারী মিলিয়ে মোট ২ হাজার ৬৬০টি গাছের অনুমোদন দেওয়া হয়, যা থেকে ২১ হাজার ৬৩০ দশমিক ৮২ ঘনফুট কাঠ আহরণের হিসাব রাখা হয়।
নথিতে থাকা হস্তান্তরপত্রে দেখা যায়, জোত মালিক নেজাম উদ্দিন তার নামে ইস্যু করা এই পুরো পরিমাণ বনজদ্রব্য কর্তন, আহরণ, মজুদ, চলাচল পাশ গ্রহণ ও বাজারজাতকরণের ক্ষমতা আব্বাস আহাম্মদের কাছে হস্তান্তর করেন। ফলে জোতটির কর্তন থেকে পরিবহন-বাজারজাতকরণ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় সরাসরি ভূমিকা তৈরি হয় আব্বাস আহাম্মদের। এই হস্তান্তরের সময় জোতের প্রকৃত অবস্থা ও আগে কোনো গাছ কাটা হয়েছিল কি না- তা বন বিভাগ কীভাবে যাচাই করেছিল, তার কোনো উত্তর মেলেনি।
৫০ নম্বর এফএল জোতের দায়িত্বে থাকা আব্বাস আহাম্মদের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
বন বিভাগের নথিতে ২ হাজার ৬৬০টি গাছের মধ্যে ১ হাজার ৭৯৪টি গাছ কর্তনের কথা বলা হয়েছে, যা থেকে ১৯ হাজার ৯৫৫ দশমিক ১৮ ঘনফুট কাঠ পাওয়ার হিসাব রয়েছে। অথচ পরবর্তী আরেকটি নথিতে কর্তন করা গাছের সংখ্যা দেখানো হয়েছে ২ হাজার ৩৮৮টি, যেখানে কাঠের পরিমাণ ১৬ হাজার ৮৮৫ দশমিক ৫০ ঘনফুট। একই জোতের ক্ষেত্রে কর্তন করা গাছের সংখ্যায় দুই নথিতে পার্থক্য ৫৯৪টি।
প্রথম হিসাব অনুযায়ী কর্তনের পর জোতে ৮৬৬টি গাছ অবশিষ্ট থাকার কথা, দ্বিতীয় হিসাব অনুযায়ী অবশিষ্ট থাকার কথা ২৭২টি। ফলে অতিরিক্ত ৫৯৪টি গাছ কখন কাটা হলো এবং তার মাঠপর্যায়ের প্রমাণ কী- এ নিয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্যবসায়ী বলেন, কোনো নথিতে অবশিষ্ট গাছের সংখ্যা ১৭২টি উল্লেখ থাকলে মূল নথি দেখে তা যাচাই করা দরকার, কারণ গাণিতিক হিসাবে তা মেলে না। তবে সংখ্যাগত অসঙ্গতির চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, নথিতে যে গাছ কাটার হিসাব দেখানো হয়েছে, বাস্তবে সেই গাছ গেল কোথায়?
২ হাজার ৩৮৮টি গাছের সাইজলিস্টের বিপরীতে প্রায় ১৬ হাজার ৮৮৫ দশমিক ৫০ ঘনফুট কাঠ পরিবহনের জন্য প্রায় ৪৮টি ট্রানজিট পারমিট (টিপি) নেওয়া হয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ আছে।
নথি অনুযায়ী, এসব টিপি ইস্যু হয়েছে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে। অভিযোগ আছে, জোতের গাছ বাস্তবে না কেটেই এই কাগজপত্র ব্যবহার করে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও আশপাশের এলাকা থেকে সংগ্রহ করা কাঠকে জোতের বৈধ কাঠ দেখিয়ে টিপির মাধ্যমে পরিবহন করা হয়েছে। এতে জোত পারমিট একধরনের 'বৈধতার কাগজ' হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় কাঠ ব্যবসায়ী ওমর ফারুক বলেন, যে জোত থেকে কাঠ পরিবহনের কথা বলা হচ্ছে, সেখানে গাছ কাটার দৃশ্যমান কোনো চিহ্ন নেই। অথচ প্রায় ৪৮টি টিপির মাধ্যমে ট্রাকে করে বিপুল পরিমাণ কাঠ পরিবহন করা হয়েছে। জোতের গাছ না কাটা হয়ে থাকলে এসব কাঠের প্রকৃত উৎস কোথায়?
তিনি আরও বলেন, জোতের ফিলিং রেজিস্টারসহ প্রয়োজনীয় নথিপত্র যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে কি না, তা তদন্ত করলেই টিপি ইস্যু ও কাঠের উৎস সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য মিলতে পারে।
স্থানীয় কাঠ ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, অর্থ লেনদেনের বিনিময়ে জোতমালিকদের কাছ থেকে ফ্রি চলাচলের অনুমতিপত্র, ডি-ফরমসহ বিভিন্ন খালি ফরমে আগাম স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে, যার একটি নমুনা তাদের কাছে রয়েছে। পরে এসব ফরম ব্যবহার করেই অন্য উৎসের কাঠকে জোতের বৈধ কাঠ দেখিয়ে পরিবহনের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হয়েছে।
২০২৩ সালে ইস্যু হওয়া এই ফ্রি পারমিটের মেয়াদ পরবর্তীতে বাড়ানো হয়েছে বলেও নথিতে উল্লেখ আছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বিভিন্ন অজুহাতে জোতের কার্যক্রম দীর্ঘায়িত করা হয়েছে।
৫০ নম্বর এফএল জোতের এই অনিয়মের সময়কালে লামা বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তার দায়িত্বে ছিলেন আতা এলাহী। জোতের কাগজপত্রে টিপি ইস্যু, কাঠ পরিবহন অনুমোদন ও মাঠপর্যায়ের তদারকির মূল দায়িত্ব রেঞ্জ কার্যালয়েরই থাকার কথা। ফলে হাজার হাজার গাছ কর্তনের কাগুজে হিসাব আর মাঠের বাস্তবতার এত বড় ফারাক তার তত্ত্বাবধানেই কীভাবে দীর্ঘদিন ধরা পড়েনি, সেই প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয় কাঠ ব্যবসায়ীরা।
তাদের অভিযোগ, রেঞ্জ কর্মকর্তার সরাসরি সংশ্লিষ্টতা ছাড়া এত বিপুল পরিমাণ কাঠ ভুয়া টিপির মাধ্যমে পরিবহন করা সম্ভব ছিল না। আতা এলাহীর বিরুদ্ধে কাঠ পাচার সিন্ডিকেটের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার আরও একটি প্রমাণ উঠে এসেছে গত ২৯ জুন প্রকাশিত একটি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে।
ওই প্রতিবেদনে ব্যবহৃত একটি ছবিতে দেখা যায়, বন বিভাগের ডাইনিং রুমে রিজার্ভ এলাকার কাঠ ব্যবসায়ী সেলিম ও খোকনসহ কয়েকজনকে নিয়ে নৈশভোজের আয়োজন করেছেন আতা এলাহী, এবং সেখানে তিনি নিজেই তাদের খাবার পরিবেশন করছেন। ছবির ক্যাপশনে বিষয়টিকে 'জামাই আদর' বলে উল্লেখ করা হয়।
পরিবেশকর্মী ও স্থানীয়দের অভিযোগ, বন রক্ষার দায়িত্বে থাকা একজন কর্মকর্তার এমন ঘনিষ্ঠতা প্রশ্ন তোলে তার নিরপেক্ষতা নিয়ে। ওই প্রতিবেদনে আলতাফ, আতা ও সেলিম চক্রের বিরুদ্ধে জনরোষের কথা উল্লেখ করে পিবিআই তদন্তের দাবি জানিয়েছেন পরিবেশকর্মীরা।
অভিযোগের বিষয়ে ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ওই জোত ইস্যু আমি আসার আগে হয়েছিল। তাকে জানানো হয়, তার দায়িত্বকালেই এই জোত-সংক্রান্ত কার্যক্রম ও টিপি ইস্যুর তথ্য নথিতে রয়েছে। এরপর তিনি আর কোনো মন্তব্য করেননি।
চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক মিহির কুমার দে বলেন, ওটির বিষয়ে আমি তেমন অবগত নই। সেটি ভালো বলতে পারবেন লামার ডিএফও।
লামা বন বিভাগের তৎকালীন রেঞ্জ কর্মকর্তা আতা এলাহী অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ওটার তদন্ত চলছে। ওখান থেকে কোনো গাছ কাটা হয়নি- একথা সত্য নয়।
স্থানীয় কাঠ ব্যবসায়ীদের দাবি, এ ধরনের অনিয়মের বিষয়ে এর আগেও ডিএফওর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ ও তদন্ত হয়েছিল, কিন্তু অর্থের বিনিময়ে সেসব বিষয় মীমাংসা করে ফেলা হয়েছে। ফলে তার বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
অভিযোগ খতিয়ে দেখতে বন বিভাগ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটির প্রধান চট্টগ্রামের উপ-বন সংরক্ষক এম এ হাসান। সদস্য হিসেবে রয়েছেন সহকারী বন সংরক্ষক দেলোয়ার হোসেন ও বান্দরবানের সহকারী বন সংরক্ষক রিটা আক্তার।
কমিটির প্রধান এম এ হাসান বলেন, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করা যাবে না। তদন্ত শেষে আপনাদের সব জানানো হবে।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর