নয় বছর আগে প্রাণ বাঁচাতে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য ছেড়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন নজি আলম। সঙ্গে ছিল পরিবার, মাথার ওপর ছিল অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। তখন তার বিশ্বাস ছিল, পরিস্থিতি শান্ত হলে কয়েক মাসের মধ্যেই ফিরে যাবেন নিজের গ্রামে। কিন্তু সেই অপেক্ষা আর শেষ হয়নি। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর শুরু হওয়া নির্বাসন পেরিয়েছে নয় বছর। অথচ ফেরার পথ এখনো খোলেনি।
উখিয়ার বালুখালী ক্যাম্পে বসে নজি আলম বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম কয়েক মাসের মধ্যেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। তারপর দেশে ফিরে যাব। কিন্তু নয় বছর কেটে গেলেও আমরা ফিরতে পারিনি। মাঝেমধ্যে প্রত্যাবাসনের আশ্বাস এসেছে, উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ফেরার পথ খোলেনি। তারপরও আমরা আশায় আছি, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতায় যেন নিরাপদে নিজেদের মাতৃভূমিতে ফিরতে পারি।’
নজি আলমের এই অপেক্ষা এখন লাখো রোহিঙ্গার অপেক্ষা। ২০১৭ সালের সহিংসতার পর কয়েক মাসে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এরপর থেকে কক্সবাজারের পাহাড়ে গড়ে ওঠা শরণার্থীশিবিরগুলোই হয়ে উঠেছে তাদের অস্থায়ী ঠিকানা। কিন্তু ‘অস্থায়ী’ সেই ঠিকানা এখন নয় বছরের বাস্তবতা।
বাংলাদেশ সরকার ও ইউএনএইচসিআরের সর্বশেষ যৌথ হিসাব অনুযায়ী, গত ৩০ জুন পর্যন্ত দেশে নিবন্ধিত ও শনাক্ত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখ ১৭১। এর মধ্যে কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে রয়েছেন ১১ লাখ ৬৬ হাজার ৩৫২ জন। নোয়াখালীর ভাসানচরে আছেন আরও ৩৩ হাজার ৮১৯ জন।
রোহিঙ্গাদের মতে, প্রত্যাবাসন মানে শুধু সীমান্ত পেরিয়ে রাখাইনে ফিরে যাওয়া নয়। তাদের কাছে ফিরে যাওয়া মানে নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, জাতিগত পরিচয় ও নিজেদের বসতভিটায় অধিকার ফিরে পাওয়া।
রোহিঙ্গা কমিউনিটি নেতা মাওলানা সৈয়দ উল্লাহ বলেন, নাগরিকত্ব, জাতিগত পরিচয়, নিরাপত্তা এবং জায়গা-জমির অধিকার নিশ্চিত না হলে রোহিঙ্গাদের পক্ষে মিয়ানমারে ফিরে যাওয়া নিরাপদ হবে না।
তার ভাষ্য, ‘আমরা রোহিঙ্গা, আমরা বাঙালি নই। আমরা মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে নিজেদের অধিকার চাই। শুধু ফিরে গেলেই হবে না, সেখানে নিরাপদে বসবাসের নিশ্চয়তাও থাকতে হবে।’
জাতিসংঘও দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন হতে হবে স্বেচ্ছামূলক, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই। মিয়ানমারে নিরাপত্তা, আইনি মর্যাদা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করাকেও প্রত্যাবাসনের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
১৫ নম্বর ক্যাম্পের কমিউনিটি নেতা জুলফিকার হায়দার বলেন, ‘আমরা অন্য দেশে স্থায়ীভাবে থাকতে চাই না। মিয়ানমার আমাদের দেশ। আমরা আমাদের অধিকার নিয়ে সেখানে ফিরতে চাই।’
১৩ নম্বর ক্যাম্পের কমিউনিটি নেতা মোহাম্মদ আলীও দেশে ফেরার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তার প্রশ্ন, রাখাইনে সংঘাত চলতে থাকলে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা কে দেবে?
তিনি বলেন, ‘আমরা সব সময় দেশে ফিরতে চাই। কিন্তু রাখাইনে এখনো সংঘাত চলছে। এই পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ছাড়া কীভাবে ফিরে যাব?’
কুতুপালং ক্যাম্পের বাসিন্দা আলমাস খাতুনের কথাতেও একই আকাঙ্ক্ষা। বাংলাদেশ আশ্রয় দেওয়ায় তিনি কৃতজ্ঞ। তবে তার প্রত্যাশা, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এমন পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখবে, যাতে তারা নিরাপদে নিজেদের দেশে ফিরতে পারেন। প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু অগ্রগতি হলেও তাতে অনিশ্চয়তা কাটেনি।
মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্প্রতি জানিয়েছে, বাংলাদেশ সরকারের দেওয়া ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের তালিকার মধ্যে ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য যাচাই করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইন রাজ্যের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে চিহ্নিত করার কথা জানিয়েছে দেশটি। তবে একই সঙ্গে ৪ হাজার ২৪১ জনকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত’ বলে উল্লেখ করেছে মিয়ানমার। আরও ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের তথ্য যাচাই করা যায়নি বলে দাবি করেছে দেশটি।
মিয়ানমারের বক্তব্য, রাখাইনে নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে যাচাইকৃত ব্যক্তিদের ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবে। কিন্তু এখানেই বড় প্রশ্ন: সেই স্থিতিশীলতা কবে আসবে? আর প্রত্যাবাসনই বা কবে শুরু হবে? এর কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি এখনো নেই।
২০১৭ সালের পর মিয়ানমারের পরিস্থিতি বদলেছে। বদলেছে রাখাইনের ক্ষমতার সমীকরণও। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মির সংঘাতে রাজ্যের বড় অংশে নিয়ন্ত্রণের চিত্র পাল্টে গেছে। আরাকান আর্মি রাখাইনের বিস্তীর্ণ এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করলেও সংঘাত পুরোপুরি থামেনি। ফলে বাংলাদেশে থাকা রোহিঙ্গাদের জন্য প্রত্যাবাসনের প্রশ্নটি এখন শুধু ঢাকা-নেপিডোর দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে রাখাইনের নতুন রাজনৈতিক ও সামরিক বাস্তবতা। মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের উদ্বেগও রয়েছে। নিরাপত্তা, চলাচলের স্বাধীনতা, নাগরিকত্ব ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত না হলে প্রত্যাবাসন বাস্তবে কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জুবায়ের বলেন, ‘মিয়ানমার আমাদের বাঙালি হিসেবে আখ্যায়িত করে। কিন্তু আমাদের নিজস্ব জাতিগত পরিচয় আছে। আমরা রোহিঙ্গা। বাংলাদেশে আমরা আশ্রয় নিয়েছি, কিন্তু আমাদের মাতৃভূমি মিয়ানমার।’
তার মতে, বাংলাদেশের একার পক্ষে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। মিয়ানমারের ওপর কার্যকর আন্তর্জাতিক চাপ এবং রাজনৈতিক সমাধান ছাড়া প্রত্যাবাসন বাস্তবায়ন কঠিন।
২০১৭ সালের পর বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে কয়েক দফা প্রত্যাবাসন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তালিকা হয়েছে, যাচাই হয়েছে, প্রত্যাবাসনের দিনও নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো উদ্যোগই বাস্তব প্রত্যাবাসনে রূপ নেয়নি।
কক্সবাজারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কার্যালয়ের কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশ প্রস্তুত। কিন্তু মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি অনুকূল না হওয়ায় তা শুরু করা যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণ মিয়ানমারে। তাই টেকসই সমাধানের জন্য মিয়ানমারেই এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে, যাতে রোহিঙ্গারা নিরাপদে ও স্বেচ্ছায় ফিরে যেতে পারেন।’
২৫ আগস্টকে রোহিঙ্গারা গণহত্যা স্মরণ দিবস হিসেবে পালন করেন। নয় বছর ধরে এই দিনটি তাদের কাছে শুধু অতীতের সহিংসতার স্মৃতি নয়, বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে যাওয়ার অধিকার ও ন্যায়বিচারের দাবিও জানানোর দিন। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের বিচারসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার দাবিও রয়েছে তাদের।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই বাড়ছে আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উদ্বেগ। উখিয়া ও টেকনাফের পাহাড়, বনভূমি, সড়ক, বাজার, শ্রমবাজার ও জনজীবনে দীর্ঘস্থায়ী এই সংকটের প্রভাব পড়ছে বলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন।
উখিয়ার রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য প্রকৌশলী হেলাল উদ্দিন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার উপস্থিতির কারণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কক্সবাজার নাগরিক ফোরামের সভাপতি আ ন ম হেলাল উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশ মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু সংকট দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় স্থানীয় জনগণের ওপরও এর প্রভাব পড়ছে।
উখিয়ার সুশাসনের জন্য নাগরিকের সভাপতি অধ্যাপক মাসুদ বলেন, ক্যাম্প স্থাপনের সময় পাহাড় ও বনভূমির ওপর ব্যাপক চাপ পড়েছিল। দীর্ঘ সময় ধরে বিপুলসংখ্যক মানুষের অবস্থানের কারণে পরিবেশ ও স্থানীয় অবকাঠামোর ওপরও চাপ বাড়ছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) কক্সবাজার জেলা কমিটির সভাপতি অধ্যাপক অজিত দাশের মতে, শুরুতে ধারণা ছিল রোহিঙ্গারা দ্রুত ফিরে যাবে। এখন সেই ধারণা বদলে গেছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা একটি আন্তর্জাতিক সংকটের মধ্যে পড়ে গেছি। শুরুতে বলা হয়েছিল, রোহিঙ্গারা দ্রুত ফিরে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, নয় বছরেও প্রত্যাবাসন শুরু হয়নি। আবার তাদের জন্য পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক সহায়তার কথাও বলা হয়েছিল। এখন দেখা যাচ্ছে, মানবিক সহায়তাতেও সংকট তৈরি হচ্ছে।’
তার আশঙ্কা, সংকটের দ্রুত সমাধান না হলে বাংলাদেশের ওপর সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়বে।
রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি সমস্যা প্রকট হয়ে উঠছে। তা হলো অর্থের সংকট। ২০২৬ সালের জন্য জাতিসংঘ ও সহযোগী সংস্থাগুলো রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং কক্সবাজার ও ভাসানচরের আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর জরুরি প্রয়োজন মেটাতে ৭১ কোটি ৫ লাখ মার্কিন ডলারের আবেদন জানিয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার ঘাটতি দেখা দিলে খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সুরক্ষাসহ জরুরি সেবাগুলো আরও চাপে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রোহিঙ্গা বিষয়ক বিশ্লেষক সুজা উদ্দিন বলেন, ২০১৭ সালের সহিংসতার পর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হলেও দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান এখনো আসেনি।
তার মতে, ‘এই সংকট শুধু বাংলাদেশের নয়। এটি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংকট। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের অধিকার, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অবস্থানের সমাধান ছাড়া এর স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।’
নয় বছর আগে যারা শিশু ছিলেন, তারা এখন তরুণ। যেসব শিশু ক্যাম্পে জন্মেছে, তাদের অনেকের কাছে মিয়ানমার একটি দেখা নয়, বরং পরিবারের মুখে শোনা দেশ। একটি প্রজন্মের শৈশব কেটে যাচ্ছে ক্যাম্পের ভেতরেই।
মিয়ানমার কয়েক লাখ মানুষকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে যাচাই করার কথা বলেছে। কিন্তু যাচাই থেকে বাস্তব প্রত্যাবাসনের পথ এখনো অনেক দূর। রাখাইনে সংঘাত, নিরাপত্তাহীনতা, নাগরিকত্ব ও জাতিগত পরিচয়ের প্রশ্ন, ভূমির অধিকার এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অচলাবস্থা মিলিয়ে রোহিঙ্গাদের ফেরার পথ আটকে আছে।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর
জাতীয় এর সর্বশেষ খবর