আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ দেওয়াসহ নয় দফা দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। একই সঙ্গে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের পদধারীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ না দেওয়া এবং বিভিন্ন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার দাবি জানিয়েছে দলটি।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) নির্বাচন কমিশনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনসহ নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠক শেষে এসব দাবি তুলে ধরেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। বৈঠকে দলটি ছয় সদস্যের প্রতিনিধিদল উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া বৈঠক সিইসি সঙ্গে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ, ইসি আনোয়ারুল ইসলাম সরকার ও ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে জামায়াতের পক্ষ থেকে লিখিতভাবে নয় দফা দাবি নির্বাচন কমিশনের কাছে দেওয়া হয়। পরে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে গোলাম পরওয়ার বলেন, স্থানীয় নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে এসব দাবি বিবেচনায় নেওয়ার জন্য কমিশনের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে।
তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত ৩০ হাজারের বেশি এমপিওভুক্ত শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়া, ভোট দেওয়া ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেয়ে আসছেন। এমনকি সদ্য অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অনেকে প্রার্থী হয়েছেন। অথচ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তাদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ না দেওয়ার বিষয়ে কমিশনের একটি সুপারিশ রয়েছে।
জামায়াতের এই নেতা বলেন, ‘একজন এমপিওভুক্ত শিক্ষক সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন, কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে পারবেন না—এটা বৈষম্যমূলক। সংবিধানের ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদে নাগরিকদের সমতা ও বৈষম্যহীনতার যে অধিকার দেওয়া হয়েছে, এই সিদ্ধান্ত তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।’
এ কারণে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে অযোগ্য ঘোষণার সুপারিশ বাতিলের দাবি জানিয়েছেন তারা।
নিষিদ্ধ দলের পদধারীদেরও অযোগ্য করার দাবি
নিষিদ্ধ কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা বা পদধারী ব্যক্তি স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না—এমন বিধান রাখার দাবি জানিয়েছে জামায়াত।
গোলাম পরওয়ার বলেন, কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকার পরও ওই দলের কোনো পদধারী ব্যক্তি নির্বাচনে অংশ নিলে সেটিকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবেই দেখা হবে। তাই নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের পদ-পদবি ধরে রাখা ব্যক্তিদের স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া উচিত নয়।
ইসির অতিরিক্ত সচিবের নিয়োগ নিয়ে আপত্তি
নির্বাচন কমিশনে সম্প্রতি নিয়োগ পাওয়া অতিরিক্ত সচিব শামসুল আলমের নিয়োগ নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে জামায়াত। দলটির অভিযোগ, শামসুল আলম অতীতে বিএনপির নির্বাচনবিষয়ক একটি উপকমিটির সদস্য ছিলেন।
গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক পরিচয় রয়েছে—এমন কাউকে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া নিরপেক্ষতার প্রশ্ন তৈরি করে। আমরা নির্বাচন কমিশনকে বিষয়টি সরকারের কাছে জানানোর অনুরোধ করেছি।’
তিনি জানান, কমিশন তাদের উদ্বেগ সরকারের কাছে জানাবে বলে আশ্বস্ত করেছে। তবে নিয়োগের ক্ষেত্রে কমিশনের সরাসরি কোনো কর্তৃত্ব নেই বলেও তাদের জানানো হয়েছে।
রাজনৈতিক নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের প্রার্থী না করার দাবি
সম্প্রতি বিভিন্ন উপজেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যক্তিদের প্রশাসক বা দায়িত্বশীল পদে নিয়োগের বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছে জামায়াত।
গোলাম পরওয়ারের দাবি, এসব নিয়োগকে সামনে রেখে স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে—এমন একটি জনধারণা তৈরি হয়েছে। নির্বাচনের আগে সরকারি সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে এসব ব্যক্তি নিজেদের নির্বাচনী মাঠ প্রস্তুত করতে পারেন বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘যারা রাজনৈতিক বিবেচনায় এসব প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন, তাদের আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনে অযোগ্য করতে হবে। শুধু তফসিল ঘোষণার পর পদত্যাগ করলেই হবে না; এই নির্বাচনে তাদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়।’
প্রচারে মন্ত্রী-এমপিদের অংশগ্রহণ বন্ধের দাবি
স্থানীয় নির্বাচনের প্রচারে মন্ত্রী, সংসদ সদস্যসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ বন্ধে আচরণবিধিতে সুনির্দিষ্ট বিধান রাখার দাবিও জানিয়েছে জামায়াত।
গোলাম পরওয়ার বলেন, আগের আচরণবিধিতে এ বিষয়ে স্পষ্ট বিধান ছিল না। তবে নির্বাচন কমিশন বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার কথা জানিয়েছে।
‘কিছু দাবি কমিশন ইতোমধ্যে বিবেচনায় নিয়েছে’।
জামায়াতের পক্ষ থেকে আগেও এসব দাবি নির্বাচন কমিশনকে জানানো হয়েছিল উল্লেখ করে গোলাম পরওয়ার বলেন, আজকের বৈঠকে কমিশন জানিয়েছে, নয় দফার কয়েকটি ইতোমধ্যে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘সবগুলো দাবি মেনে নেওয়া হয়নি—এমন নয়। কিছু দাবি তারা বিবেচনায় নিয়েছে, আর কিছু বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। যেগুলো এখনো বিবেচনায় নেওয়া হয়নি, সেগুলো গ্রহণের জন্য আমরা জোরালোভাবে অনুরোধ করেছি।’
তবে দাবি পূরণ না হলে স্থানীয় নির্বাচন বর্জনের কোনো সিদ্ধান্ত এখনো নেওয়া হয়নি বলেও জানান তিনি।
গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘নির্বাচন বর্জনের মতো কথা বলার সময় এখনো আসেনি। আমরা এখনো আস্থাশীল। তবে আমাদের পর্যবেক্ষণ হলো, ক্ষমতায় যেহেতু দলীয় সরকার রয়েছে, নির্বাচন কমিশনের ওপর কোথাও কোথাও চাপ রয়েছে। তাদের সঙ্গে কথা বললে মনে হয়, কিছু বিষয় তারা মন খুলে বলতে পারছেন না।’
স্থানীয় নির্বাচনে দলীয়ভাবে প্রার্থী দেবে জামায়াত
স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে না হলেও জামায়াত বিভিন্ন পর্যায়ে প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানান দলটির সেক্রেটারি জেনারেল।
তিনি বলেন, স্থানীয় শাখাগুলোকে প্রার্থী বাছাই ও নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে। তবে নির্বাচন নির্দলীয় হওয়ায় দলীয়ভাবে কোনো প্রার্থী ঘোষণা করা হবে না। প্রার্থীরা ব্যক্তিগতভাবে নির্বাচনে অংশ নেবেন।
১১ দলীয় জোটের বিষয়ে তিনি বলেন, এই ঐক্য কেবল জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে হয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জোটগত কোনো সিদ্ধান্ত নেই। ফলে প্রত্যেক দল নিজ নিজ প্রার্থী দিতে পারবে।
রোহান/সা.এ.
সর্বশেষ খবর