লালমনিরহাটে সমবায় সমিতির আড়ালে অবৈধ ঋণদান, চড়া সুদে কিস্তি আদায় এবং নিম্নমানের পণ্য বিক্রির অনিয়ম নিয়ে সংবাদ প্রকাশের জেরে দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা হয়েছে। সমিতির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়ের করা এই মামলাটি বর্তমানে তদন্তের জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) লালমনিরহাটকে দায়িত্ব দিয়েছেন আদালত।
এদিকে সংবাদ প্রকাশের জেরে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের ও আইনি অপব্যবহারের প্রতিবাদ জানিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন লালমনিরহাটে কর্মরত সাংবাদিক সমাজ।
জানা যায়, গত ১৩ এপ্রিল দৈনিক কালবেলায় "গ্রাহকের ১২ কোটি টাকা নিয়ে উধাও দুই সমিতি" শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে 'তিস্তা সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতি' ও 'তিস্তা ইন্টারন্যাশনাল'-এর স্বত্বাধিকারী এম. এ. হাশেম ওরফে বাবুলের বিরুদ্ধে সাধারণ গ্রাহকদের আমানতের অর্থ আটকে রাখা, শতকরা ২০ থেকে ৩০ শতাংশ চড়া সুদে টাকা লেনদেন এবং সঞ্চয়ের টাকার বিপরীতে নিম্নমানের পণ্য ধরিয়ে দেওয়ার অনিয়ম তুলে ধরা হয়। এছাড়া একই বিষয়ে প্রথমসারির বেশ কয়েকটি পত্রিকায়ও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
উক্ত সংবাদ প্রকাশের পর ক্ষুব্ধ হয়ে ‘তিস্তা সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতি লিঃ’-এর সভাপতি ও বর্তমান নাম পরিবর্তনকারী ‘তিস্তা সমবায় বাজার’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম. এ. হাশেম রংপুর সাইবার ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করেন। মামলায় দৈনিক কা লবেলা র লালমনিরহাট প্রতিনিধি শেখ খায়রুজ্জামান শাহেদ এবং 'নয়া দিগন্ত' (ডিজিটাল)-এর প্রতিনিধি মোঃ জুবাইর আহমেদ খানের বিরুদ্ধে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মানহানিকর তথ্য প্রচারের অভিযোগ আনা হয়। ট্রাইব্যুনাল অভিযোগটি আমলে নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য সিআইডি লালমনিরহাটকে দায়িত্ব প্রদান করেছেন।
মামলা ও সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে ভুক্তভোগী সাংবাদিক শেখ খায়রুজ্জামান শাহেদ বলেন, "আমরা কোনো উদ্দেশ্যে নয়, বরং সমবায় সমিতির নামে সাধারণ মানুষের রক্ত পানি করা টাকা হাতিয়ে নেওয়ার সত্য ঘটনাই তুলে ধরেছিলাম। সরেজমিনে গ্রাহকদের ক্ষোভ ও তাদের অনিশ্চয়তার কথা সংবাদে উপস্থাপিত হয়েছে। আমাদের কণ্ঠরোধ করতে ও অপকর্ম আড়াল করতেই চতুরতার আশ্রয় নিয়ে এই মিথ্যে মামলা দেওয়া হয়েছে।"
সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এ মামলার প্রতিবাদ জানিয়ে প্রেসক্লাবের লালমনিরহাটের আহ্বায়ক আনোয়ার হোসেন স্বপন বলেন, "বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যভিত্তিক সংবাদ প্রকাশের পর তা খণ্ডন না করে সরাসরি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করা মুক্ত ও স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর আঘাত। আমরা এই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং অবিলম্বে তা প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছি।"
প্রতিবাদ জানিয়ে সাংবাদিক নেতা শরিফুল ইসলাম রতন বলেন, "অনিয়মে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা নিজেদের অপরাধ আড়ালের চেষ্টা করে যাচ্ছে। কালবেলা ও নয়া দিগন্ত (ডিজিটাল) প্রতিনিধির বিরুদ্ধে দায়ের করা এই মামলা স্পষ্টতই প্রতিশোধমূলক। সিআইডির নিরপেক্ষ তদন্তে সত্য বেরিয়ে আসবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। অবিলম্বে এই হয়রানি বন্ধ না হলে কঠোর আন্দোলনের ডাক দেওয়া হবে।"
মামলার বিষয়টি নিয়ে অভিযুক্ত সমবায় সমিতির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম. এ. হাশেম ওরফে বাবুলের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, তদন্তাধীন থাকায় মামলার বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি সিআইডি লালমনিরহাটের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।
স্থানীয় ভুক্তভোগী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, সমবায় কর্মকর্তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে যারা কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো সংবাদকর্মীদের বলির পাঁঠা বানানোর চেষ্টা চলছে। ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করে হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন তারা।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর