রাখিব নিরাপদ, দেখাবো আলোর পথ’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে নরসিংদী জেলা কারাগারটির সার্বিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতা নীতিতে কারাগারে এসেছে দৃশ্যমান পরিবর্তন। কারাগার কেবল ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করার স্থান নয়, এটি মানুষের ভেতরের অপরাধবোধ দূর করে নতুনভাবে জীবন গড়ার একটি সংশোধনাগার। সম্প্রতি সাংবাদিকদের সাথে সাক্ষাৎকারে কারাগারটির সার্বিক চিত্র ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেছেন জেল সুপার মো: তারেক কামাল । ২০২৫ সালের ৫ অক্টোবর যোগদানের পর থেকেই তিনি কঠোর শৃঙ্খলা বজায় রাখার পাশাপাশি নানামুখী সংস্কারমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে চলেছেন বলে দাবি করেছেন।
সাক্ষাৎকারে মাদক ও অপরাধচক্রের বিষয়ে জেল সুপার বলেন, কারা অভ্যন্তরে যেকোনো ধরনের অনৈতিক কার্যক্রম বা মাদক সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য চিরতরে বন্ধ করতে পুরো এলাকা সিসি ক্যামেরা দ্বারা সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হচ্ছে। শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়, বন্দিদের জীবনযাত্রার মান বদলাতে নেওয়া হয়েছে বহুমুখী কর্মসংস্থানমূলক উদ্যোগ। পুরুষ বন্দিরা নিপুণ হাতে বেতের মোড়া, চেয়ার ও টেবিল তৈরি করছেন, পাশাপাশি নারী বন্দিরা নকশী কাঁথা সেলাইয়ের কাজ করছেন । উৎপাদিত এসব পণ্যের বিক্রয়লব্ধ লাভের অর্থের ৫০ শতাংশ সরাসরি বন্দিদের নিজ হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে।
শুধু তাই নয়, কারাবন্দিদের মানবাধিকার ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে খাবারের তালিকায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। সপ্তাহে দুই দিন সকালের নাস্তায় রুটি, পাঁচ দিন পুষ্টিকর খিচুড়ি পরিবেশন করা হচ্ছে। পাশাপাশি দুপুরের খাবারে মানসম্মত সবজি-ডাল এবং রাতে পরিমাণমতো মাছ বা মাংস নিশ্চিত করায় বন্দিদের পুষ্টির মান বহুঅংশে উন্নত হয়েছে। বন্দিদের দীর্ঘমেয়াদী সুস্থতা ও মানবিক পরিবেশ রক্ষায় বিশুদ্ধ পানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, উন্নত পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাসহ সু-চিকিৎসার সুব্যবস্থা করা হয়েছে।
তবে এসব কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি কিছু বাস্তবভিত্তিক চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান ও সমস্যা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন জেল সুপার । তিনি জানান,বর্তমানে ৩৪৪ জন ধারণক্ষমতার বিপরীতে এই কারাগারে ১০৯০ জন বন্দি অবস্থান করছেন। তবে এই চাপ কমানোর জন্য কিছু বন্দী কিশোরগঞ্জ ও কাশিমপুর কারাগারে পাঠানো হচ্ছে। এর বাইরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক উন্নীতকরণের কাজ চলমান থাকায় কারাগার এলাকাটি তুলনামূলক নিচু হয়ে গেছে, যার ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই কারাগারের ভেতরে সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। তবে আগামী ছয় মাসের মধ্যে ১৫০০ জন ধারণক্ষমতার নবনির্মিত নতুন কারাগারে স্থানান্তরিত হওয়া গেলে এই দীর্ঘমেয়াদী সমস্যার স্থায়ী সমাধান মিলবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে কারাগারে ক্ষত কাটিয়ে আলোর পথে নিয়ে আসার বিষয়ে জেল সুপার জানান, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় দুষ্কৃতিকারীরা নজিরবিহীন হামলায় কারাগারটির অফিসিয়াল সব নথিপত্র ও ডাটাবেজ পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। সে সময় ৮৫টি অস্ত্র ও ৮১৬৫টি গুলি লুট হওয়ার পাশাপাশি অনেক বন্দি পালিয়ে গিয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় অধিকাংশ অস্ত্র, গুলি ও বন্দি উদ্ধার ও আত্মসমর্পণ করলেও বর্তমানে ৩২টি অস্ত্র, উল্লেখযোগ্য গুলিসহ ১৬৬ জন বন্দির সন্ধান মেলেনি। ডাটাবেজ পুড়ে যাওয়ায় কিছুটা জটিলতা তৈরি হলেও অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে প্রশাসন কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া, কারাবন্দিদের স্বজনদের উদ্দেশ্যে বিশেষ সতর্কবার্তা দিয়ে তিনি বলেন, কারা কর্তৃপক্ষ কখনো কোনো সেবার বিনিময়ে টাকা দাবি করে না। তাই অপরিচিত নম্বর থেকে আসা প্রতারক চক্রের ফোন কল থেকে সবাইকে সাবধান ও সর্তক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর