তরুণদের আত্মহত্যা প্রতিরোধে নীরবতা ভেঙে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উন্মুক্ত আলোচনা, সামাজিক কলঙ্ক দূর করা এবং ঝুঁকিতে থাকা তরুণদের জন্য কার্যকর ও সহজলভ্য সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁরা বলেন, আত্মহত্যাকে কেবল ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সমস্যা হিসেবে দেখলে এর কার্যকর প্রতিরোধ সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা, সরকারি প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও গণমাধ্যমের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে মোকাবিলা করতে হবে।
বুধবার রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ‘নীরবতা থেকে পদক্ষেপ: তরুণদের আত্মহত্যা বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন’ শীর্ষক এক বিশেষ সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানে এসব বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়। আঁচল ফাউন্ডেশন ও হিউম্যান রাইটস ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (এইচআরডিসি) যৌথভাবে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডা. এম. এ. মুহিত বলেন, জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে আত্মহত্যার চিন্তা আসতে পারে। এ সময়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা না পেলে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। তিনি বলেন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে সরকার পাবনা মানসিক হাসপাতালের আধুনিকায়ন, ঢাকার মানসিক স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালীকরণ এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবার কাঠামো তৈরিতে কাজ করছে। এছাড়া জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে সরকার নিরলসভাবে কাজ করছে। আত্মহত্যা মোকাবিলায় সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, এককভাবে সরকারের পক্ষে এটি সম্ভব নয়, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
আঁচল ফাউন্ডেশনের সভাপতি মোহাম্মদ তানসেন বলেন, একটি তরুণ জীবনকে সংকট থেকে ফিরিয়ে আনতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ও গণমাধ্যমসহ পুরো সমাজকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকিয়াট্রি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মহসিন আলী শাহ বলেন, আত্মহত্যা করতে চাওয়া অনেক মানুষই প্রকৃতপক্ষে বেঁচে থাকতে চান। তবে তীব্র মানসিক সংকট ও বিষণ্নতার কারণে তাঁরা আত্মহত্যাকে একমাত্র পথ হিসেবে বেছে নেন। তিনি বলেন, বিষণ্নতার যথাযথ চিকিৎসা না হলে একজন ব্যক্তি পুনরায় আত্মহত্যার চেষ্টা করতে পারেন। তাই ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিকে দ্রুত মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর কাছে নিয়ে যেতে হবে।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সাইফুন নাহার বলেন, আত্মহত্যার প্রবণতা রয়েছে এমন ব্যক্তিদের দূরে সরিয়ে না দিয়ে তাঁদের পাশে দাঁড়াতে হবে। তাঁদের অপরাধী হিসেবে বিবেচনা না করে কেন এমন অনুভূতি হচ্ছে, তা জানতে হবে এবং প্রয়োজনীয় মানসিক সহায়তা দিতে হবে।
লেখক ও গবেষক গওহর নঈম ওয়ারা বলেন, মানুষের সঙ্গে কথা বলার সময় ব্যবহৃত কঠোর বা আঘাতমূলক শব্দও একজন মানুষকে আত্মহত্যার মতো চরম সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাই তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় শিক্ষকদের দায়িত্বশীল ও সহানুভূতিশীল আচরণ নিশ্চিত করা জরুরি।
ইনসাইট ফর চেঞ্জ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার নওফল জমির বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাকে যথাযথভাবে স্বীকৃতি দিয়ে এ বিষয়ে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। আত্মহত্যা একটি স্পর্শকাতর বিষয়, যার সঙ্গে আইন ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়গুলোও জড়িত।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক জাতীয় পেশাজীবী কর্মকর্তা হাসিনা মমতাজ বলেন, আত্মহত্যার চিন্তা বা প্রবণতা থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে একটি বড় অংশ পরবর্তী সময়ে আত্মহত্যার দিকে এগিয়ে যেতে পারেন, তাই সময়মতো হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ও এইচআরডিসির পরিচালক জিয়ানুর কবির আত্মহত্যা নিয়ে নীরবতা ও কুসংস্কার ভাঙার আহ্বান জানান। সমাপনী বক্তব্যে এইচআরডিসির সিইও মাহবুল হক জানান, দশটি জেলায় কমিউনিটি-ভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে দুই শতাধিক মানুষকে আত্মহত্যার চিন্তা থেকে বেরিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সহায়তা করা হয়েছে। তিনি অন্যান্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকেও একই ধরনের উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন এটিএন বাংলার কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর একরামুল হক সায়েম।
রোহান/সা.এ.
সর্বশেষ খবর