ভারত ও চীনের সীমান্তবর্তী প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানকার উপজাতীয় সম্প্রদায়ের মানুষজন বলছেন, চীনের সেনাবাহিনীর ক্রমশই অগ্রসর হওয়ার কারণে তারা তাদের পৈতৃক চারণভূমি ও শিকারের জমি থেকে পিছু হটতে বাধ্য হচ্ছেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টের হাতে আসা উপগ্রহ চিত্রে দেখা যায়, অরুণাচল প্রদেশে ভারত-চীন বিতর্কিত সীমান্ত বরাবর ও এর কাছাকাছি একাধিক স্থানে দ্রুত অবকাঠামোগত সম্প্রসারণ ঘটিয়েছে বেইজিং। এর মধ্যে রয়েছে নতুন ভবন, রাস্তা এবং হেলিপ্যাড।
হিমালয়ের দুর্গম এই অংশের সীমান্ত নিয়ে দুই দেশের মধ্যে রয়েছে আঞ্চলিক দাবি-পাল্টা দাবি। দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সেখানে ভারতীয় বাহিনীর স্থায়ী উপস্থিতি বজায় রাখা কঠিন। পুরো অরুণাচল প্রদেশকেই চীন নিজেদের অংশ দাবি করে একে ‘জাংনান বা দক্ষিণ তিব্বত’ বলে ডাকে। অরুণাচল প্রদেশে সীমান্ত থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন স্থানীয় বাসিন্দা তাকোক ম্রা। ম্রা জানান, পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করলে তিনি চীনা সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতেও প্রস্তুত।
ম্রা বলেন, ‘চীনারা এখন আমাদের পূর্বপুরুষের জমি দখল করছে। এই ভূখণ্ড থেকেই আমরা খাবার সংগ্রহ করি, বেঁচে থাকি এবং জীবিকা নির্বাহ করি; এটা আমাদেরই জমি। তারা ইতিমধ্যে ভারতীয় ভূখণ্ডের অনেক ভেতরে ঢুকে পড়েছে। তারা ঠিক কত কিলোমিটার জায়গা দখল করেছে তা সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারব না, তবে তারা অনেক বড় এলাকা দখল করে নিয়েছে।’
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এতোমধ্যেই নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন। শনিবার তিনি দেশটিতে পৌঁছান। সেখানে তার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকও করেছেন তিনি। বছরের পর বছর ধরে দুই দেশের মধ্যকার বৃহত্তম চীনা প্রতিনিধি দলের এই সফরকে কেন্দ্র করে উভয় সরকারই সীমান্ত উত্তেজনাকে কম গুরুত্ব দিয়ে দেখানোর চেষ্টা করছে।
স্যাটেলাইট চিত্র এবং সীমান্ত গ্রামের বাসিন্দাদের সাক্ষ্য অনুযায়ী, বিতর্কিত ভূখণ্ডে চীনাদের ধারাবাহিক অগ্রগতি এবং অবকাঠামো নির্মাণের স্পষ্ট প্রমাণ মিলছে, যা এখনও দুই দেশের কূটনৈতিক ও সামরিক পর্যায়ের আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে আছে। ভ্যান্টর-এর সরবরাহ করা স্যাটেলাইট চিত্রে বিশ্লেষকরা আপার সুবনসিরি উপত্যকায় একাধিক স্থানে সাম্প্রতিক নির্মাণ ও অবকাঠামোগত পরিবর্তনের কথা জানিয়েছেন। তাকোক ম্রার গ্রাম ‘গেলেমো’ এই অঞ্চলেই অবস্থিত।
আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত গোয়েন্দা তথ্য সংস্থা ‘জেনস’-এর তথ্য অনুযায়ী, তিব্বতের লহুনজে কাউন্টির উত্তরে ঝারি শহরের কাছাকাছি দুটি এলাকায় সবচেয়ে স্পষ্ট নির্মাণযজ্ঞ দেখা গেছে। এই এলাকাটি বর্তমানে রয়েছে বেইজিংয়ের নিয়ন্ত্রণে। জেনসের বিশ্লেষকরা বলেন, ‘স্যাটেলাইট চিত্র নিশ্চিত করছে যে সীমান্তবর্তী এসব এলাকায় সম্প্রতি নির্মাণকাজ চালানো হয়েছে।’ স্যাটেলাইট চিত্রের ওপর ভারত ও চীন উভয়ের দাবি করা সীমান্তরেখা বসালে দেখা যায়—এই অবকাঠামোগুলোর কিছু অংশ দুই দেশেরই দাবি করা বিতর্কিত অঞ্চলের একেবারে ভেতরে পড়েছে বলেও জানান তারা।
ঝারি শহরের দক্ষিণে একটি স্থানে ২০১৯ সালের শুরুর দিকে নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল, যার প্রথম কাঠামো চোখে পড়ে ওই বছরের আগস্টে। ওই কাজ এখনও চলমান রয়েছে। স্থানটিতে জমি সমান করা, প্রকৌশল যানের উপস্থিতি এবং সিমেন্ট তৈরির প্ল্যান্ট বসানোর প্রমাণ মিলেছে। বিশ্লেষকরা দ্য ইন্ডিপেনডেন্টকে জানিয়েছেন, এটি সামরিক কাজে ব্যবহারের সম্ভাবনা কোনোভাবেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
শহরের ভেতরে অপর একটি নির্মাণস্থল সামরিক স্থাপনা হওয়ার সম্ভাবনাও সমানভাবে রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কাছাকাছি একটি সড়কের প্রশস্ততা বাড়ানো হয়েছে এবং খাড়া ঢাল কমানো হয়েছে। লহুনজের দক্ষিণে দুটি ছোট হেলিপ্যাডের বদলে একটি নতুন বড় হেলিপ্যাড তৈরি করা হয়েছে এবং এর আরও দক্ষিণে গড়ে তোলা হয়েছে আরেকটি নতুন হেলিপ্যাড।
২০২৬ সালের আগস্টের সর্বশেষ স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, অন্তত একটি ভবনের ছাদ তৈরি সম্পন্ন হয়েছে, যা প্রমাণ করে নির্মাণকাজ পুরোদমে চলছে। ভবনের নকশা, সামরিক যানের সাথে মিল থাকা গাড়ির উপস্থিতি এবং সংলগ্ন প্রশিক্ষণ এলাকা দেখে বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন যে এটি সম্ভবত একটি সামরিক ঘাঁটি। এছাড়া ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে শহরের সঙ্গে সংযোগকারী একটি নতুন সড়কও তৈরি করা হয়েছে।
এমন এক স্পর্শকাতর সময়ে এই অভিযোগগুলো সামনে এলো যখন চীন-ভারত সম্পর্ক অত্যন্ত সংবেদনশীল পর্যায়ে রয়েছে। ২০২০ সালে গালওয়ান উপত্যকার সীমান্ত সংঘর্ষের পর—যা দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশের সম্পর্ককে কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে এনেছিল—শি জিনপিংয়ের এটিই প্রথম দিল্লি সফর। এই সফরে তার সঙ্গে প্রায় ৪০০ কর্মকর্তার একটি বিশাল প্রতিনিধি দল রয়েছে।
চীনা তৎপরতা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বাড়তে থাকায় দুটি স্বাধীন অনুসন্ধানী দল পূর্ব হিমালয়ের ভারত-চীন সীমান্ত থেকে প্রায় ১৫-২০ কিলোমিটার দূরের প্রত্যন্ত পাহাড়ি গ্রাম গেলেমো ও তাকসিং সফর করে সরেজমিন পরিস্থিতি মূল্যায়ন করেছে।
অরুণাচলের তাগিন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন অল তাগিন স্টুডেন্টস ইউনিয়নের (এটিএসইউ) সভাপতি তাদাক পাকবা আট সদস্যের একটি দল নিয়ে গেলেমো ও তাকসিং সফর করেন। তারা স্থানীয় বাসিন্দা, আদিবাসী জনগোষ্ঠী এবং সেনাবাহিনীর রসদ বহনকারীদের (পোর্টার) কাছ থেকে সরাসরি তথ্য সংগ্রহ করেন।
পাকবা জানান, বর্তমানে যেভাবে চীনা অনুপ্রবেশ ঘটছে, তা অতীতে কখনো দেখা যায়নি। সীমান্তের গ্রামগুলোতে কেবল আতঙ্কই বিরাজ করছে না, এটিই এখনকার মাঠপর্যায়ের কঠিন বাস্তবতা। ভারতীয় সেনাবাহিনী পিছু হটছে এবং চীনা সেনাবাহিনী সামনের দিকে এগিয়ে আসছে। গত ১১ থেকে ১৩ আগস্টের মধ্যে স্থানীয় নেতা পাকবা ও তার দল তিন দিনের মাঠপর্যায়ের তদন্ত চালান। তারা জানান, সাধারণত ভারতীয় সেনাবাহিনী যেসব এলাকায় টহল দিত, এমন বেশ কয়েকটি স্থানে চীনা বাহিনী প্রবেশ করেছে।
অনুসন্ধানী দলটি আপার সুবনসিরির ডেপুটি কমিশনার এবং মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরে একটি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে, যা দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট দেখতে পেয়েছে। প্রতিবেদনে তাকসিং-গেলেমো সীমান্ত অঞ্চলে 'চীনা পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) উপস্থিতি ও তৎপরতা বন্ধে অবিলম্বে হস্তক্ষেপের দাবি জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, এটিকে কোনো সাধারণ উন্নয়নমূলক সমস্যা হিসেবে না দেখে কৌশলগত ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
রোহান/সা.এ.
সর্বশেষ খবর