পুরো নাম সাজেদা পারভীন সাজু। বয়স ৪৭ বছর। ১৯৯১ সালে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে অধ্যায়নরত অবস্থায় ১১ বছর বয়সে তার বিয়ে হয়। তখন তিনি চকরিয়া দিগরপানখালী উচ্চ বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেন। পড়ালেখা অবস্থায় ১৯৯৪ সাল থেকে সংসার শুরু করেন। একদিকে সংসার অন্যদিকে লেখাপড়া। শত বাধা পেরিয়ে ১৯৯৬ সালে এসএসসি পাস করেন। নিজেই শিকার হয়েছিলেন বাল্য বিবাহের। ২০১০ সাল পর্যন্ত সুখেই ছিল তার সংসার। ২০১১ সালে এসে তার স্বামী জড়িয়ে পরেন পরকীয়া প্রেমে। নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনে আর সংসারটা করা হয়ে উঠেনি। অবশেষে ভেঙ্গে যায় সংসার। স্বামী পরিত্যাক্ত হয়ে নিজের বাবার বাড়ি বান্দরবানের লামা উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ইয়াংছা হিমছড়ি এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। দুই ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে কেটে যাচ্ছে তার জীবন। তিনি মৃত হাজী মোস্তাক আহমেদ ও মৃত রাবেয়া খাতুনের মেয়ে।
২০১১ সালে স্বামীর নির্যাতন আর অবহেলায় বুঝতে পারেন, একজন মেয়ের জীবন কত কষ্টের। তখন থেকে শপদ নেন, তার মত কোন নির্যাতিত নারী বা শিশু দেখলেই পাশে দাঁড়াবেন। সেই থেকে সংসার জীবনের ফাঁকে বাকী সময়টা নির্যাতিত নারী ও শিশুর জন্য কাজ করে যাচ্ছেন সাজেদা পারভীন সাজু। এলাকায় সবাই তাকে ‘সাজু আপা বা মানবাধিকার সাজু’ নামে চিনে। কাজ করতে গিয়ে অনেক মানবাধিকার সংগঠনের সাথেও সম্পৃক্ত হয়েছেন। এই পর্যন্ত তিনি ৫৩টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় সরাসরি কাজ করেছেন। এরমধ্যে ৩টি মামলায় আসামীদের সাজা হয়েছে, স্বামী ও তার পরিবার কর্তৃক নির্যাতিত ৩০ জন নারী তাদের সংসারে ফিরে গেছেন এবং ২০টি মামলা এখনো বিভিন্ন আদালতে চলমান রয়েছে।
সাজেদা পারভীন বলেন, আমাদের পুরুষ শাষিত সমাজ। কোন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হলে সব দোষ নারীদের দিয়ে থাকে। অনেক সময় লোকলজ্জা ও ভয়ে নারীরা চুপ করে যায়। নির্যাতিত একজন নারী ওই সময়ে সবচেয়ে অসহায় হয়ে পড়েন। তখন তার পাশে দাঁড়িয়ে তাকে মানসিক বল দেয়ায় আমার কাজ। আপোষযোগ্য বিষয় হলে তার পাশে থেকে তাকে ন্যায্য বিচার পাইয়ে দেয়ার চেষ্টা করি। এছাড়া চাঞ্চল্যকর বিষয় হলে ভিকটিম আইনী সেবা কোথায় কিভাবে পেতে পারেন তার পরামর্শ দেই। অনেকসময় ভিকটিমের সাথে হাসপাতাল ও থানায় যাই। আমি নারী হিসাবে আমার দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে আমি এই কাজ গুলো করি। সরকারি হাসপাতালে ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি) এবং থানা গুলোতে নারী ও শিশু সেবা সেল গুলো আরো সক্রিয় করা জরুরি। এছাড়া ধর্ষণের শিকার নারী ও শিশুদের পরীক্ষা নিরিক্ষা বা ডিএনএ পরীক্ষায় যেতে গাড়ি ভাড়া সহ অনেক খরচের প্রয়োজন রয়েছে। এখাতে সরকারিভাবে বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন। ভিকটিম গরীব হলে আমাদের বিব্রত হতে হয়। অনেক সময় নিজের থেকে খরচ করি। আমাদেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
গত ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ইং শনিবার ইয়াংছা এলাকার একজন মেয়েকে বিয়ের প্রলোভনে লামা পৌরসভার ৯নং ওয়ার্ড হরিণঝিরি এলাকার এক ছেলে ৬ মাস ধরে বিভিন্ন জায়গায় রেখে শারীরিক সর্ম্পকে লিপ্ত হয়। এখন ছেলের পরিবার ও ছেলে তাকে বউ হিসাবে মেনে নিতে অনিহা জানাচ্ছে। আমরা মেয়ে ও তার অভিভাবক সহ প্রথমে ছেলের বাড়িতে যাই তাদের সাথে আলাপ করার চেষ্টা করি। তারা বিয়ে করাতে অস্বীকৃতি জানালে বিকেলে লামা থানায় আইনী সহায়তা চেয়ে অভিযোগ দায়ের করি।
আমার উল্লেখযোগ্য ঘঠনার মধ্যে ২০১৩ সালে ৬ বছরের শিশু ফাহিমা আক্তার ধর্ষণ, ২০১৪ সালে হাইদারনাশী এলাকায় স্বামী কর্তৃক পারভীন আক্তারকে অমানবিকভাবে নির্যাতন, ২০১৬ সালে বনপুর এলাকায় সালমা আক্তার ধর্ষণ, ২০১৮ সালে জাহেদা বেগম ধর্ষণ এবং ২০২৫ সালে মহিমা আক্তার ধর্ষণের ঘটনা। এইসব মামলা এখনো নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুন্যালে চলমান। অনেক আসামী জেল-হাজতে রয়েছে।
সাজেদা পারভীন নারী ও শিশু নির্যাতনমুক্ত একটি সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনের প্রত্যাশা করেন। সমাজ থেকে সহিংসতা দূর করে নারী ও শিশুদের সার্বিক নিরাপত্তা, অধিকার এবং মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। এইজন্য আইনি সংস্কার ও দ্রুত বিচার নিশ্চিতকরণ, আইনের কঠোর প্রয়োগ, সামাজিক সচেতনতা ও মানসিকতার পরিবর্তন, শিক্ষা কারিকুলামে অন্তর্ভুক্তি, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় জেন্ডার সমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং নৈতিক মূল্যবোধের বিষয়গুলো বাধ্যতামূলক করা, অপসংস্কৃতি রোধ, নারীর ক্ষমতায়ন ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী বিষয় গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। পৃথিবীটা হোক সব মানুষের।
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর