ময়মনসিংহের ভালুকায় চোর সন্দেহে সুজন মিয়া (৩৫) নামের এক যুবককে আটক করে বেঁধে মারধরের পর হত্যার অভিযোগ উঠেছে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার জৈনা বাজার এলাকায় নিয়ে মহাসড়কের পাশে ময়লার স্তূপে ফেলে দেওয়া হয় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। পরে সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়।
ঘটনার পর বিষয়টি নিয়ে এলাকায় এক ধরনের নীরবতা তৈরি হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে জানতে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও ওই রাতে কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে কেউ বিস্তারিত বলতে রাজি হননি। স্থানীয়দের দাবি, ঘটনায় জড়িত থাকতে পারেন—এমন কয়েকজন ঘটনার পর থেকে আত্মগোপনে রয়েছেন।
নিহত সুজন মিয়া শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার ভেলুয়া বাজারসংলগ্ন এলাকার আমিনুল হক কালুর ছেলে। তাঁর মা মৃত ফিরোজা বেগম। বর্তমানে তিনি গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার তেলিহাটি ইউনিয়নের আবদার পাড়ায় তাসলিমা নামের এক নারীর বাড়িতে ভাড়া থাকতেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ৭ সেপ্টেম্বর রাতে ভালুকা উপজেলার জামিরদিয়া মাস্টারবাড়ি এলাকায় ‘মুরাদ ইলেকট্রনিকস’ নামের একটি দোকানে চুরি হয়। চুরির পর দোকানের পেছনের ভাড়া বাসার বাসিন্দারা বিষয়টি জানতে পারেন। এরপর সুজনকে চুরির সঙ্গে জড়িত সন্দেহে আটক করা হয় বলে স্থানীয়রা দাবি করেছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, আটকের পর সুজনকে বেঁধে মারধর করা হয়। এতে তিনি গুরুতর আহত হন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে আহত অবস্থায় তাঁকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে শ্রীপুরের জৈনা বাজার এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মহাসড়কের পাশে ময়লার স্তূপের কাছে তাঁকে ফেলে দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
জৈনা বাজার এলাকায় ময়লার স্তূপের পাশে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয় লোকজন সুজনকে উদ্ধার করেন। তাঁকে জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা করা হয়। তবে কিছুক্ষণ পর তাঁর মৃত্যু হয়।
পরে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে শ্রীপুর থানা-পুলিশ। তবে সুজন আসলে চুরির সঙ্গে জড়িত ছিলেন কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি পুলিশ। চুরির অভিযোগ এবং সুজনকে আটক করে মারধরের ঘটনা—দুটিই তদন্তের বিষয় বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট থানা-পুলিশ।
ঘটনার মধ্যে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও। ভিডিওতে এক যুবককে বেঁধে মারধর করতে দেখা যায় বলে স্থানীয় সূত্রে দাবি করা হয়েছে।
তবে ভিডিওটি সুজন মিয়াকে মারধরের ঘটনারই কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। পুলিশও বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। ভিডিওটির স্থান, সময় এবং সেখানে থাকা ব্যক্তিদের পরিচয় যাচাই করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে ‘মুরাদ ইলেকট্রনিকস’ দোকানে গিয়ে কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলা হয়। তাঁরা জানান, ঘটনার রাতে দোকানে চুরি হয়েছিল। তবে সুজনকে আটক করা, তাঁকে মারধর করা কিংবা পরে তাঁকে শ্রীপুরে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে তাঁরা বিস্তারিত বলতে রাজি হননি।
দোকানের মালিকের বক্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। ফলে সুজনকে আটকের সঙ্গে দোকানের মালিক বা কর্মচারীদের কারও সম্পৃক্ততা ছিল কি না, সে বিষয়ে তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ঘটনার পর জামিরদিয়া মাস্টারবাড়ি এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে ওই রাতের ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করা হয়। তবে স্থানীয়দের অধিকাংশই এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন এমন কয়েকজন ঘটনার পর থেকে এলাকায় নেই। তাঁরা আত্মগোপনে রয়েছেন বলে স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। তবে পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে কারও আত্মগোপনের বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।
শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শাহীনূর আলম বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, ভালুকা উপজেলার মাস্টারবাড়িতে চুরির ঘটনায় সুজনকে চোর সন্দেহে মারধর করা হয়। পরে তাঁকে জৈনা বাজারে ফেলে দেওয়া হলে সেখানে তাঁর মৃত্যু হয়। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে।’
ভালুকা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘ঘটনার পর ভালুকা থানা পুলিশও তদন্ত শুরু করেছে। এ ঘটনায় জড়িতদের শনাক্তে কাজ চলছে।’
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সুজন চুরির সঙ্গে জড়িত ছিলেন কি না, তাঁকে কারা আটক করেছিলেন, তাঁর ওপর কারা মারধর করেছিলেন এবং গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে কারা শ্রীপুরে নিয়ে গিয়েছিলেন এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা চলছে।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর