ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের প্রায় সাত মাস পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন যুদ্ধের ফলাফলকে ‘বিজয়’ হিসেবে উপস্থাপনের জন্য হলিউডধাঁচের প্রচারণা চালাচ্ছে বলে দাবি করেছে ইরানের মেহর নিউজ এজেন্সি (এমএনএ)।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে এমএনএ বলেছে, যুদ্ধের ময়দান থেকে কাঙ্ক্ষিত বিজয়ের স্পষ্ট চিত্র না পাওয়ায় এখন মার্কিন প্রশাসন ও গণমাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য ‘বিজয়গাথা’ তৈরির চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। এর অংশ হিসেবে ইরানের ভূখণ্ডে ভূপাতিত মার্কিন যুদ্ধবিমানের এক পাইলটকে উদ্ধারের ঘটনাকে ব্যাপকভাবে প্রচার করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, উদ্ধার অভিযানকে কেন্দ্র করে বিশেষ বাহিনী, সামরিক বিমান, আহত পাইলট, পাহাড়ি এলাকা এবং জটিল সামরিক অভিযানের নাটকীয় দৃশ্য তুলে ধরা হয়েছে। এমএনএর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এতে যুদ্ধবিমানের ভূপাতিত হওয়ার ঘটনাকে আড়ালে রেখে পাইলটকে সফলভাবে উদ্ধার করে দেশে ফেরানোর বিষয়টিকেই গল্পের মূলকেন্দ্রে রাখা হয়েছে।
মেহরের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরু করেছিল সামরিক ও প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব কাজে লাগিয়ে ইরানকে ওয়াশিংটনের দাবি মেনে নিতে বাধ্য করা এবং দ্রুত বিজয় অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে। কিন্তু এখন যুদ্ধের রাজনৈতিক লক্ষ্য কতটা অর্জিত হয়েছে, ইরানের আচরণে কী পরিবর্তন এসেছে কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সাফল্য কী—এসবের বদলে পাইলট উদ্ধারের ঘটনাই গুরুত্বপূর্ণ প্রচারণার বিষয় হয়ে উঠেছে।
প্রতিবেদনটিতে পাইলট উদ্ধারের বর্ণনা নিয়েও কিছু প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এতে বলা হয়, পাইলটের পিঠ, হাত ও কাঁধে গুরুতর আঘাতের কথা উল্লেখ করা হলেও দুর্ঘটনার পর তিনি প্রায় ৭ হাজার ফুট উচ্চতার একটি পাহাড়ি এলাকায় পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছিলেন বলে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এমএনএর মতে, বিস্তারিত চিকিৎসা ও সামরিক ব্যাখ্যা ছাড়া এই দুই তথ্যের মধ্যে অসামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
তবে উদ্ধার অভিযানটি জটিল ও সফল ছিল—এ বিষয়টি অস্বীকার করা যায় না বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু মেহরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, একটি সামরিক অভিযান সফল হওয়া এবং পুরো যুদ্ধে বিজয় অর্জন করা এক বিষয় নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ জনমতের প্রসঙ্গ তুলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য যুদ্ধের একটি ‘বিজয়ী’ বয়ান তৈরি করা রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মেহর কুইনিপিয়াক বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি জরিপের বরাত দিয়ে দাবি করেছে, ৬০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন ইরানে সামরিক অভিযান চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যে ব্যয় করেছে, তা সার্থক হয়নি। একইভাবে সিবিএস ও ইউগভের এক জরিপে ৬৯ শতাংশ মার্কিনি যুদ্ধটিকে ব্যয়সাপেক্ষ বলে মনে করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মেহর আরও দাবি করেছে, মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের দপ্তর ‘৬০ মিনিটস’ অনুষ্ঠানে ওই পাইলটদের উপস্থিতির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে অনুসরণ করেছিল। তবে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর এ ধরনের রাজনৈতিক ব্যবহারের ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, সামরিক সদস্যদের অংশগ্রহণ ছিল স্বেচ্ছামূলক।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যুদ্ধের কৌশলগত অর্জন স্পষ্ট না হলে পাইলট উদ্ধারের মতো নাটকীয় ঘটনাকে বিজয়ের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হতে পারে। এতে যুদ্ধের মূল প্রশ্ন—যুক্তরাষ্ট্র তার রাজনৈতিক লক্ষ্য কতটা অর্জন করেছে—তা আড়ালে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মন্তব্য করেছে মেহর।
মেহরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ওয়াশিংটন এখন হয়তো যুদ্ধের সুস্পষ্ট সাফল্যের চেয়ে ‘বিজয়ের ছবি’ তৈরিতে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। একটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার পর পাইলটকে উদ্ধার করা সামরিক অভিযানের সাফল্য হতে পারে, কিন্তু সেটিকে পুরো যুদ্ধের কৌশলগত বিজয়ের প্রমাণ হিসেবে দেখানো যায় কি না—সেটিই মূল প্রশ্ন।
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর
সারাবিশ্ব এর সর্বশেষ খবর