চলতি বছরের শক্তিশালী ‘সুপার এল নিনো’র প্রভাবে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪ লাখ ৫১ হাজার অতিরিক্ত মানুষের মৃত্যু হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিজ্ঞানীরা। বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোতে এর প্রভাব বেশি পড়তে পারে।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু গবেষণা সংস্থা ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের বুধবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ আশঙ্কার কথা জানানো হয়েছে। গবেষকেরা বিশ্বের ২৪ হাজার ৩৭৮টি অঞ্চলের তাপমাত্রা ও অতিরিক্ত মৃত্যুর সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে এই হিসাব করেছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন থেকে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এল নিনোর কারণে স্বাভাবিক বছরের তুলনায় অতিরিক্ত তাপজনিত মৃত্যুর সংখ্যা ৪ লাখ ৫১ হাজার পর্যন্ত হতে পারে। এ সময় স্বাভাবিকের তুলনায় অত্যন্ত গরম দিনের সংখ্যা ৪৪ শতাংশ বাড়তে পারে।
গবেষকেরা এবারের এল নিনোকে ‘ভবিষ্যতের পোস্টকার্ড’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাদের মতে, আগামী কয়েক দশকে যে ধরনের তাপমাত্রা স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারে, এবারের পরিস্থিতি তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
কী এই সুপার এল নিনো
এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্ব নিরক্ষীয় অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অন্তত দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যাওয়ার একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু প্রবণতা। কয়েক বছর পরপর এটি দেখা যায় এবং এর বিপরীত শীতল পর্যায়কে বলা হয় লা নিনা।
সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা কয়েক মাস ধরে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি বাড়লে সেটিকে ‘সুপার এল নিনো’ বলা হয়। এবারের এল নিনো গত মাসে ২ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে। কিছু পূর্বাভাসে নভেম্বর-ডিসেম্বরে এটি ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুক্তরাজ্যের রিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ুমণ্ডলবিষয়ক গবেষক অক্ষয় দেওরাস বলেন, এ বছর ইন্দোনেশিয়া থেকে শক্তিশালী বায়ুপ্রবাহ উষ্ণ পানি পূর্ব দিকে সরিয়ে নেওয়ায় শক্তিশালী এল নিনো তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে যেসব দেশ
ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত তাপজনিত মৃত্যুর দিক থেকে নাইজেরিয়ায় প্রায় ৩১ হাজার ৪০০, ইন্দোনেশিয়ায় ১৯ হাজার ৩০০ এবং সুদানে ১৭ হাজার ৬০০ মৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছে।
আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলের নাইজার, চাদ, নাইজেরিয়া ও সুদানে অতিরিক্ত মৃত্যুর সংখ্যা ৬৬ হাজার ৮০০ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ায় সম্মিলিতভাবে আরও প্রায় ১৯ হাজার ৪০০ মৃত্যুর আশঙ্কা করা হয়েছে।
এল নিনোর প্রভাব আগামী বছর পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হলে উত্তর গোলার্ধের ভারত ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলোর ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
তবে গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, অতীতে এমন মাত্রার এল নিনো দেখা যায়নি বলে এর আঞ্চলিক প্রভাব সুনির্দিষ্টভাবে অনুমান করা কঠিন।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব
ইমপেরিয়াল কলেজ লন্ডনের জলবায়ুবিজ্ঞানী ফ্রিডেরিকে অটো বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এল নিনোর প্রভাব আরও তীব্র হচ্ছে। জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর কারণে বৈশ্বিক তাপমাত্রার যে ভিত্তি ইতোমধ্যে বেড়েছে, তার ওপর এল নিনোর অতিরিক্ত উষ্ণতা যুক্ত হচ্ছে।
এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের ধরনও বদলে যেতে পারে। কোথাও খরা, আবার কোথাও অতিবৃষ্টি ও বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। এর প্রভাব কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য সরবরাহেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ মৃত্যুর পূর্বাভাস নিয়ে কিছুটা সংশয়ও রয়েছে। যুক্তরাজ্যের মেট অফিসের বিজ্ঞানী অ্যাডাম স্কাইফ বলেছেন, এল নিনোর প্রভাব এর শক্তির সঙ্গে ঠিক সমানুপাতিক হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
অক্ষয় দেওরাসও মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট সংখ্যা ও অঞ্চলভিত্তিক পূর্বাভাস নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তার মতে, তবে আগামী ১২ মাসে অতিরিক্ত মৃত্যু, সম্পদ ও অবকাঠামোর ক্ষতি এবং অর্থনৈতিক প্রভাবের আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা উচ্চ ঝুঁকির এলাকায় আগাম সতর্কতা জারি, হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত জনবল প্রস্তুত রাখা, শীতল আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন এবং খোলা জায়গায় কাজ করা শ্রমিকদের সুরক্ষায় ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর
সারাবিশ্ব এর সর্বশেষ খবর