একটি দিয়াশলাইয়ের বাক্সের আয়ু কত? আগুন জ্বালানোর পর কয়েক মুহূর্ত—তারপরই হয়তো সেটি চলে যায় ডাস্টবিনে। কিন্তু সেই ফেলে দেওয়া ম্যাচবক্সই যদি কারও কাছে হয়ে ওঠে অমূল্য সম্পদ? ঢাকার শাকিল হকের কাছে ঠিক সেটিই সত্যি।
মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোডের ভাড়া বাসার একটি কক্ষজুড়ে তাঁর বিচিত্র সংগ্রহ। কাচের আলমারির তাকে তাকে সাজানো দেশ-বিদেশের ম্যাচবক্স। কোনোটি কাঠের, কোনোটি কার্ডবোর্ডের, কোনোটি টিনের; আবার কোনোটি তৈরি চামড়া দিয়ে। আকৃতিতেও বিস্ময়ের শেষ নেই—বই, সিলিন্ডার, তাঁবু থেকে শুরু করে অতি ক্ষুদ্র ম্যাচবক্সও রয়েছে তাঁর সংগ্রহে। শাকিলের দাবি, ১৩২ দেশের ২২ হাজারের বেশি ম্যাচবক্স*এখন তাঁর সংগ্রহে।
ম্যাচবক্সের প্রতি শাকিলের এই অদ্ভুত ভালোবাসার শুরু ছোটবেলায়। তাঁর বাবা ডাকটিকিট, মুদ্রা ও ম্যাচবক্স সংগ্রহ করতেন। বাবার সংগ্রহ দেখেই ছেলের মধ্যে তৈরি হয় কৌতূহল। শৈশবে ম্যাচবক্স সংগ্রহ শুরু করলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে যায় সেই সংগ্রহ। প্রায় দুই দশক পর ২০১২ সালে নতুন করে ম্যাচবক্স সংগ্রহ শুরু করেন শাকিল। এরপর একে একে বাড়তে থাকে সংগ্রহের সংখ্যা।
এখন তাঁর কাছে প্রতিটি ম্যাচবক্সই যেন সন্তানের মতো। কোনোটি প্লাস্টিক বাক্সে, কোনোটি আবার বিশেষ প্রটেক্টরে মুড়িয়ে যত্নে রাখা।
শাকিলের সংগ্রহের গল্পের সবচেয়ে চমকপ্রদ অংশগুলোর একটি হলো—তিনি শুধু দোকান বা সংগ্রাহকদের কাছ থেকেই ম্যাচবক্স সংগ্রহ করেন না। কখনো রাস্তা থেকে, এমনকি ডাস্টবিন থেকেও ম্যাচবক্স তুলে এনেছেন। কোথাও দুর্লভ কোনো ম্যাচবক্সের সন্ধান পেলেই সেটি সংগ্রহের চেষ্টা করেন। তাঁর সংগ্রহে রয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার ম্যাচবক্স, রানি এলিজাবেথের ৭৫তম জন্মদিন উপলক্ষে তৈরি ম্যাচবক্স এবং ১৮ শতকের শুরুর দিকের ম্যাচবক্সের নমুনা।

আকারেও রয়েছে বিস্ময়। তাঁর দাবি অনুযায়ী, পৃথিবীর অন্যতম ক্ষুদ্র ম্যাচবক্স রয়েছে তাঁর সংগ্রহে, যার আকার এক ইঞ্চির চার ভাগের এক ভাগের চেয়েও কম। আবার আছে বিশাল আকৃতির বুকম্যাচ।
কোনো কোনো বাক্সে রাখা যায় এক হাজার পর্যন্ত দিয়াশলাই কাঠি।
সংগ্রহ বাড়াতে শাকিলের যোগাযোগ রয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ফিলুমেনিস্টদের সঙ্গে। স্লোভেনিয়ার সংগ্রাহক স্যান্ডি তাঁর অন্যতম বড় সরবরাহকারী। কখনো এমনও হয়েছে, একদিনে তিনটি দেশ থেকে ডাকযোগে এসেছে প্রায় ১ হাজার ৫০০ ম্যাচবক্স। এভাবেই বছরের পর বছর ধরে ছোটবেলার শখ পরিণত হয়েছে বিশাল সংগ্রহে।
এই সংগ্রহের একটি আন্তর্জাতিক নামও আছে—ফিলুমেনি (Phillumeny)। ম্যাচবক্স, ম্যাচের লেবেল, ম্যাচবুক ও এ-সংক্রান্ত সামগ্রী সংগ্রহের শখকে বলা হয় ফিলুমেনি। আর যারা এসব সংগ্রহ করেন, তারা পরিচিত ফিলুমেনিস্ট (Phillumenist) নামে।
শাকিল হকের গল্প এখানেই শেষ নয়। তিনি শুধু ম্যাচবক্স সংগ্রহ করেন না, নিজেই ম্যাচবক্সের নকশাও করেন। চট্টগ্রাম সরকারি চারুকলা কলেজে পড়াশোনা করা শাকিল পেশায় গ্রাফিক ও ইন্টেরিয়র ডিজাইনার। ২০১৬ সাল থেকে তিনি ম্যাচবক্স ডিজাইন করা শুরু করেন। এ পর্যন্ত তাঁর তৈরি নকশার সংখ্যা পাঁচ শতাধিক। তাঁর নকশায় উঠে এসেছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, চে গুয়েভারা, মাইকেল জ্যাকসন, মেরিলিন মনরোসহ নানা পরিচিত ব্যক্তিত্ব। এমনকি ইতিহাসের বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব ও বিভিন্ন সামাজিক-রাজনৈতিক ঘটনাও স্থান পেয়েছে তাঁর নকশায়।
২০১৫ সালে জামিল গ্রুপ তাঁর ‘বাংলার রঙ’ শিরোনামের ১২টি ম্যাচবক্স ডিজাইন কিনে নেয়।
ম্যাচবক্স তাঁর কাছে ক্ষুদ্র শিল্পকর্ম
শাকিলের কাছে ম্যাচবক্স শুধু আগুন জ্বালানোর উপকরণ নয়। এর গায়ে আঁকা ছবি, লেখা, রং ও নকশার মধ্যে তিনি খুঁজে পান একটি সময়ের ইতিহাস। একটি ম্যাচবক্সে ফুটে উঠতে পারে কোনো দেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, খাবার, স্থাপত্য কিংবা জনপ্রিয় কোনো ব্যক্তিত্ব। আবার কোনো নকশা হয়ে উঠতে পারে নির্দিষ্ট সময়ের সামাজিক বা ঐতিহাসিক ঘটনার দলিল। তাই ম্যাচবক্সের নকশাকে শিল্পের অংশ হিসেবেই দেখতে চান তিনি।
তাঁর মতে, বাংলাদেশে ম্যাচবক্সের নকশায় সৃজনশীলতার জায়গাটি এখনও যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। অনেক ক্ষেত্রে শুধু বাণিজ্যিক প্রয়োজনেই একই ধরনের নকশা বছরের পর বছর ব্যবহার করা হয়।

গড়ে তুলেছেন সংগ্রাহকদের ক্লাব
ম্যাচবক্স সংগ্রহকে একটি সংগঠিত রূপ দিতে ২০১৬ সালে শাকিল গড়ে তোলেন বাংলাদেশ ম্যাচবক্স কালেক্টরস ক্লাব (BMCC)। সংগ্রাহকদের মধ্যে যোগাযোগ তৈরি ও ম্যাচবক্স সংগ্রহের সংস্কৃতিকে পরিচিত করার পাশাপাশি সংগঠনটি অনলাইন প্রদর্শনীরও আয়োজন করেছে। ২০১৮ সালে নিজের বিশাল সংগ্রহ নিয়ে ঢাকার দৃক গ্যালারিতে প্রথম ম্যাচবক্স প্রদর্শনী করেন শাকিল। পরে ফিলুমেনিস্টদের জন্য ‘দেশলাই’ নামে একটি ত্রৈমাসিক জার্নাল প্রকাশের সঙ্গেও যুক্ত হন তিনি।
যে ম্যাচবক্স বিক্রি হওয়ার কথা ছিল, হয়ে গেল ইতিহাস
সময়ের সঙ্গে ম্যাচের ব্যবহার কমছে। গ্যাসের চুলা, ইলেকট্রিক ইগনিশন ও লাইটারের মতো বিকল্পের কারণে দিয়াশলাই অনেকের দৈনন্দিন জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। শাকিলের আশঙ্কা, একসময় ম্যাচবক্সও হয়তো হারিয়ে যাবে মানুষের স্মৃতি থেকে। তাই তাঁর সংগ্রহে থাকা প্রতিটি বাক্স যেন সেই হারিয়ে যাওয়া সময়ের একটি ক্ষুদ্র দলিল। নিজের তৈরি ম্যাচবক্সও বিক্রি করেন তিনি। নকশা অনুযায়ী দাম ২৫ টাকা থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত। তবে বিক্রির চেয়ে সংগ্রহ এবং এই শিল্পকে ছড়িয়ে দেওয়াই তাঁর কাছে বড়।
স্বপ্ন একটি স্থায়ী ম্যাচবক্স জাদুঘর
হাজার হাজার ম্যাচবক্স নিয়ে শাকিলের এখন সবচেয়ে বড় স্বপ্ন—একটি স্থায়ী ম্যাচবক্স জাদুঘর। যেখানে মানুষ শুধু ম্যাচবক্স দেখবে না; জানবে এর ইতিহাস, নকশা, সংস্কৃতি এবং সংগ্রহের গল্প। প্রজন্মের পর প্রজন্ম যাতে এই সংগ্রহ দেখতে পারে, সেটিই তাঁর আকাঙ্ক্ষা। শাকিল বলেন, “ম্যাচবক্সের সঙ্গে আমার আত্মিক সম্পর্ক।” এই সম্পর্কের গভীরতা বোঝাতে তাঁর আরেকটি অভিজ্ঞতাই যথেষ্ট। অসুস্থ হলে নিজের সংগ্রহের পাশে গিয়ে দাঁড়ান তিনি। হাজার হাজার ম্যাচবক্সের দিকে তাকিয়ে খুঁজে পান মানসিক শক্তি।
একসময় যে ছোট্ট বাক্স আগুন জ্বালাত, আজ সেই বাক্সই শাকিল হকের জীবনে জ্বালিয়ে রেখেছে অন্য এক আলো—স্মৃতি, শিল্প আর ইতিহাসের আলো।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর
ভিন্ন স্বাদের খবর এর সর্বশেষ খবর