বাংলাদেশে শতভাগ রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক খাতে দুর্ঘটনায় নিহত অথবা স্থায়ীভাবে অক্ষম শ্রমিকদের, প্রতিবন্ধী এবং মৃত শ্রমিকের উত্তরাধিকারীদের দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক সুবিধা প্রদান ও কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনাজনিত আর্থিক ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ-বিল্স ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা-আইএলও এর যৌথ উদ্যোগে বাস্তবায়িত এমপ্লয়মেন্ট ইনজুরি স্কিম (ইআইএস) মডেল অনুসরণ করে সকল খাতের শ্রমিকের জন্য এটি বাস্তবায়ন করা এবং সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতকে এর আওতায় আনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) বিল্স আয়োজিত একটি মিডিয়া ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠানে বক্তারা এ কথা বলেন। ইআইএস পাইলট প্রকল্পের অগ্রগতি তুলে ধরার উদ্দেশ্যে এই মিডিয়া ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠানটির আয়োজন করা হয়।
বিল্স-এর ভাইস চেয়ারম্যান ও ইআইএস গভর্ন্যান্স বোর্ডের সদস্য আনোয়ার হোসাইনের সভাপতিত্বে ও ইআইএস গভর্ন্যান্স বোর্ডের সদস্য তৌহিদুর রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিল্স-এর নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ এবং আইএলও-ইআইএস এর চীফ টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজার সৈয়দ সাদ হুসাইন গিলানী। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিল্স-এর যুগ্ম-মহাসচিব সাকিল আখতার চৌধুরী। মিডিয়া ব্রিফিং পেপার এর ওপর মন্তব্য করেন শ্রমিক নিরাপত্তা ফোরামের সদস্য সচিব সেকেন্দার আলী মিনা; ইন্ডাস্ট্রিঅল বাংলাদেশ কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন স্বপন এবং ন্যাশনাল কোঅর্ডিনেশন কমিটি ফর ওয়ার্কার্স এডুকেশন (এনসিসিডব্লিউই)-এর সদস্য সচিব আহসান হাবিব বুলবুল। অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নোত্তর পর্বে কথা বলেন ইআইএস গভর্ন্যান্স বোর্ডের সদস্য রাজেকুজ্জামান রতন ও তৌহিদুর রহমান; জিআইজেড-এর সিনিয়র টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজার সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন এবং ইআইএস স্পেশাল ইউনিটের বিশেষ উপদেষ্টা মো. শফিকুল ইসলাম। সমাপনী বক্তব্য ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বিল্স-এর ভাইস চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসাইন। অনুষ্ঠানে জাতীয় ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন ও শ্রমিক সংগঠনসমূহের প্রতিনিধিগণ, নারী ও যুব শ্রমিক নেতৃত্ব, গবেষক, লেখক, সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।
স্বাগত বক্তব্যে সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ বলেন, এই প্রকল্পটি তৈরি পোশাক খাতে পাইলট হিসেবে কাজ করছে। এখনো দেশে যিনি আয় করেন তার অনুপস্থিতিতে সামগ্রিক পরিবার অচল হয়ে পড়ে। সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই প্রকল্পটি শ্রমিক ও তার পরিবারের আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার মাধ্যমে সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করতে চায়।
সৈয়দ সাদ হুসাইন গিলানী বলেন, এটি বাংলাদেশে সামাজিক সুরক্ষা বিষয়ক প্রথম প্রকল্প। এটি শ্রমিক ও তার পরিবারকে তিন ধরণের সুবিধা প্রদান করতে সক্ষম। প্রথমত, আর্থিক সহায়তা, যা মজুরির পঞ্চাশ ভাগ। দ্বিতীয়ত, এটি অক্ষম শ্রমিককে পূনর্বাসনের সুবিধা প্রদান করে। তৃতীয়ত, এটি কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রেও উক্ত সুবিধা প্রদান করে।
মূল প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়, ইআইএস বর্তমান মোট সুবিধাভোগী ৫৭৪ জন। এই প্রকল্পের আওতায় এখন পর্যন্ত মোট ২৪৮টি দুর্ঘটনায় ১৬১ জন মৃত শ্রমিকের পোষ্যগণ এবং ৮৭ জন স্থায়ীভাবে অক্ষম শ্রমিক ইআইএস এর আওতায় ৪,২৮,৩১,৫৭২ টাকা ক্ষতিপূরণ হিসেবে পেয়েছেন। এছাড়া ইআইএস শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রের ঝুঁকি মোকাবিলা, আয় হারানোর ঝুঁকি কমানো, সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ, শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক উন্নয়ন, আইন ও মানবিক দায়িত্ব পালন এবং দারিদ্র্য হ্রাসে অবদান রেখেছে। শ্রমজীবি জনগোষ্ঠী ও তাঁদের পরিবারের জন্য একটি নিরাপদ, সুরক্ষিত, মর্যাদাকর ও ন্যায্য কর্মক্ষেত্র এবং জীবিকা নিশ্চিত করতে এই মিডিয়া ওরিয়েন্টেশনে সুপারিশ মূলত তিনটি। প্রথমত, এই মডেল অনুসরণ করে সকল খাতের শ্রমিকদের জন্য এমপ্লয়মেন্ট ইনজুরি স্কিল বাস্তবায়ন করা। দ্বিতীয়ত, সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতকে এমপ্লয়মেন্ট ইনজুরি স্কিম এর আওতায় আনা। তৃতীয়ত, ইআইএস পাইলট শেষ হলে (২০২৭) প্রয়োজনীয় বিধি/আইন প্রণয়ন করে এমপ্লয়মেন্ট ইনজুরি স্কিমকে সর্বজনীন ঘোষণা করা।
ইন্ডাস্ট্রিঅল বাংলাদেশ কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন স্বপন বলেন, প্রকল্পটি ২০২২ সালে শুরু হয় এবং এর ফলে ক্ষতিপূরণের বিষয়টি শ্রম আইনে সন্নিবেশিত হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা আশা করি, আইএলও উদ্যোগ নিয়ে সরকার ও মালিকপক্ষের সহযোগিতায় যৌথভাবে এই উদ্যোগটি চলমান রাখুক।
শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ)-এর যুগ্ম সমন্বয়কারী এএএম ফয়েজ হোসেন বলেন, এই পাইলট প্রকল্পটি যখন শুরু হয় তখন এটি কেবল তৈরি পোশাক খাতের জন্য ছিল, আমরা চাই সকল শ্রমিকের জন্য একে সর্বজনীন করা হোক।
সমাপনী বক্তব্যে বিল্স-এর ভাইস চেয়ারম্যান ও ইআইএস গভর্ন্যান্স বোর্ডের সদস্য আনোয়ার হোসাইন এই প্রকল্পটি মানুষের কাছে সহজবোধ্য করে তুলতে গণমাধ্যমকর্মীদের সহযোগিতা চান।
উল্লেখ্য, রানা প্লাজা এবং তাজরিন দুর্ঘটনার পর তৈরি পোশাক শিল্প খাতে নিয়োজিত শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০২২ সালের জুন থেকে এমপ্লয়মেন্ট ইনজুরি স্কিম পাইলট (ইআইএস পাইলট) প্রকল্পের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। এর আওতায় তৈরি পোশাক শিল্প খাতে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় নিহত শ্রমিকের উত্তরাধিকারীদের অথবা স্থায়ীভাবে অক্ষম শ্রমিকদের দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক সুবিধা প্রদান করা হয়। ইআইএস পাইলট প্রকল্পটি আইএলও বাংলাদেশ এবং জিআইজেড এর কারিগরি এবং নেদারল্যান্ড, কানাডা এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত হচ্ছে। এ উদ্যোগের অধীনে প্রদেয় আর্থিক সুবিধা আইএলও এমপ্লয়মেন্ট ইনজুরি ফেনিফিট কনভেনশন ১২১ (১৯৬৪ সাল) এর সাথে সামঞ্জস্য বিধান করে নির্ধারণ করা হয়েছে।
ইতোমধ্যেই, বাংলাদেশেম শ্রম আইন ২০২৬ এর সর্বশেষ সংশোধনীতে ইআইএস তহবিল গঠনের প্রবিধান যুক্ত হয়েছে। আশা করা যায়, বাংলাদেশ শ্রমবিধিমালার চলমান সংশোধনী প্রক্রিয়ায় বিষটি যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে শ্রমজীবীদের জন্য সামাজিক সুরক্ষার বিষয়টি সুনিশ্চিত হবে।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর