দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে ইবোলা। ইতোমধ্যে ৮ হাজার ৩০০ জনের বেশি আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছে, মৃত্যু ছাড়িয়েছে ৪ হাজার। স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর হামলা, স্থানীয়দের অবিশ্বাস ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাড়ছে চ্যালেঞ্জ।
আফ্রিকার দেশ ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে (ডিআর কঙ্গো) ইবোলার ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ৮ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষের শরীরে ইবোলা শনাক্ত হয়েছে। তাঁদের মধ্যে মারা গেছেন ৪ হাজার ১৮ জন। অর্থাৎ শনাক্ত রোগীদের প্রায় অর্ধেকই প্রাণ হারিয়েছেন।
চলমান এই প্রাদুর্ভাবকে ইতোমধ্যে কঙ্গোর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ও প্রাণঘাতী ইবোলা প্রাদুর্ভাব হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। রোগটি ছড়ানোর গতিও আগের অনেক প্রাদুর্ভাবের তুলনায় বেশি। মার্কিন রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) জানিয়েছে, চলতি প্রাদুর্ভাবের প্রথম ১০০ দিনেই ৫ হাজার ৪৫৮টি নিশ্চিত সংক্রমণ এবং ২ হাজার ৬০৬ জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছিল।
চলতি প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ী ভাইরাসটি হলো বুন্দিবুগিও ভাইরাস (Bundibugyo virus)—ইবোলা ভাইরাসের একটি বিরল প্রজাতি। গত ১৫ মে কঙ্গো সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন প্রাদুর্ভাবের ঘোষণা দেয়।
এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে এখনো কোনো অনুমোদিত নির্দিষ্ট চিকিৎসা বা টিকা নেই। ফলে আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত করা, সংক্রমিত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা মানুষদের নজরদারিতে রাখা এবং সংক্রমণ ঠেকানোই নিয়ন্ত্রণ প্রচেষ্টার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
প্রথম দিকে ইতুরি প্রদেশে সংক্রমণের বড় অংশ শনাক্ত হলেও পরে দেশের পূর্বাঞ্চলের অন্যান্য এলাকায়ও ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ে। উত্তর কিভু প্রদেশের কিছু এলাকায়ও সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে। সম্প্রতি দক্ষিণ উবাঙ্গি প্রদেশেও সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ভাইরাসটির নতুন নতুন স্বাস্থ্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার গতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এতে সীমিত স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা সরঞ্জামের ওপর আরও চাপ তৈরি হচ্ছে।
ইবোলা নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হয়ে দাঁড়িয়েছে স্থানীয় জনগণের একাংশের মধ্যে স্বাস্থ্যকর্মী ও সরকারি কর্তৃপক্ষের প্রতি অবিশ্বাস। অতীতের ইবোলা মোকাবিলায় সরকারের ভূমিকা, দুর্নীতি এবং দীর্ঘদিনের সামাজিক-রাজনৈতিক সংকটের কারণে এই অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
কিছু এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ এখনো ইবোলার অস্তিত্ব নিয়েই সন্দেহ প্রকাশ করছেন। ফলে আক্রান্তদের শনাক্ত করা, সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা এবং চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
নিরাপত্তা পরিস্থিতিও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ইবোলা মোকাবিলার সরকারি উদ্যোগকে সমর্থন করায় চলতি সপ্তাহে উত্তর কিভুর বুতেম্বো এলাকায় এক স্থানীয় রাজনীতিক হামলার শিকার হয়ে নিহত হন। তাঁর বাড়িতেও আগুন দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। ঘটনাটি স্বাস্থ্যকর্মী ও কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে স্থানীয় ক্ষোভ ও উত্তেজনার মাত্রা তুলে ধরেছে।
আফ্রিকা সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (আফ্রিকা সিডিসি) জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে নিশ্চিত রোগীর সংখ্যা কিছুটা কমেছে। তবে এর অর্থ সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।
সংঘাতপূর্ণ এলাকায় নিরাপত্তাহীনতা এবং স্থানীয় জনগণের সহযোগিতার অভাবের কারণে অনেক আক্রান্ত ব্যক্তির তথ্য সময়মতো শনাক্ত বা রিপোর্ট না হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে বাস্তব সংক্রমণের চিত্র সরকারি পরিসংখ্যানের চেয়ে বড় হতে পারে বলে উদ্বেগ রয়েছে।
সিডিসির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চলতি প্রাদুর্ভাবের দ্রুত বিস্তার আগের বড় ইবোলা প্রাদুর্ভাবগুলোর তুলনায় নজিরবিহীন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত রোগী শনাক্তকরণ, সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের অনুসরণ, পরীক্ষার সক্ষমতা বাড়ানো, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সংক্রমণ প্রতিরোধ এবং স্থানীয় জনগণের আস্থা ফেরানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
এখন পর্যন্ত কঙ্গোর এই প্রাদুর্ভাব বিশ্বজুড়ে ইবোলা মোকাবিলায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে নজরদারি ও আক্রান্ত এলাকাগুলোতে দ্রুত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া না গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র: সিয়াটল টাইমস
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর
সারাবিশ্ব এর সর্বশেষ খবর