দক্ষিণ কোরিয়ায় অবস্থান করেও খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার একটি মারামারি মামলায় আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ফিরোজ আলম শাওনের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, শাওনের পরিবর্তে অন্য এক ব্যক্তিকে ‘ফিরোজ আলম শাওন’ সাজিয়ে আদালতে হাজির করে জামিন নেওয়া হয়।
এ ঘটনায় শাওন ও তার আইনজীবী সরদার শাহজাহান আলীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এরই মধ্যে শাওনের ভাই ফেরদৌস আলম সেতুকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গত শনিবার রাতে তাকে গ্রেপ্তারের পর রোববার আদালতে হাজির করা হলে বিচারক তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
মামলার এজাহার ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, জমিজমা নিয়ে বিরোধের জেরে ২০২৫ সালের ১৫ মার্চ রাতে দিঘলিয়া উপজেলার সেনহাটি বরইতলা ঘাট এলাকায় প্রতিবেশী তরিকুল আমিনকে মারধরের অভিযোগ ওঠে ফিরোজ আলম শাওন ও তার স্বজনদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় তরিকুল আমিন বাদী হয়ে শাওনসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন। পরে আদালতের নির্দেশে দিঘলিয়া থানা পুলিশ মামলাটি তদন্ত করে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই জামিল হোসেন তদন্ত শেষে গত বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর শুধু ফিরোজ আলম শাওনকে অভিযুক্ত করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন। বর্তমানে মামলাটি খুলনার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে।
বাদীপক্ষের আইনজীবী আজমল হোসেন জানান, মামলায় চার্জ গঠনের দিন ধার্য হওয়ার পর তারা জানতে পারেন, গত ১৬ মার্চ শাওন আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন নিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ হলে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শাওন দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ কোরিয়ায় অবস্থান করছেন এবং জামিন নেওয়ার সময়ও তিনি দেশে ছিলেন না।
পরে বাদী তরিকুল আমিন বিষয়টি আদালতের নজরে আনেন। জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৪-এর বিচারক ফাতেমা জান্নাত বিষয়টি তদন্ত করেন। তদন্তে শাওনের পরিবর্তে অন্য ব্যক্তিকে আদালতে হাজির করে জামিন নেওয়ার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়।
আদালতের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, সিআর ৬৩/২০২৫ (দিঘলিয়া) মামলার আসামি ফিরোজ আলম শাওন গত ১৬ মার্চ অ্যাডভোকেট সরদার শাহজাহান আলীর ওকালতনামার মাধ্যমে আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করেন। অভিযোগটি জামিনযোগ্য হওয়ায় আদালত তাকে ১০০ টাকা বন্ডে জামিন দেন।
তবে ২৩ এপ্রিল বাদী আদালতে আবেদন করে জানান, শাওন দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে অবস্থান করছেন। তিনি দেশে না ফিরেই কীভাবে আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন নিলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বাদী।
এর পরদিন আসামিপক্ষের আইনজীবী সরদার শাহজাহান আলী তার ওকালতনামা প্রত্যাহারের আবেদন করেন। আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, তার ওকালতনামা ব্যবহার করে ভিন্ন একজনকে শাওন সাজিয়ে আদালতে হাজির করে জামিন নেওয়া হয়েছে।
বিষয়টি তদন্তের পর গত ২২ জুলাই জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৪-এর বিচারক ফাতেমা জান্নাত খুলনার মুখ্য মহানগর হাকিমের কাছে প্রতিবেদন দেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, শাওন দক্ষিণ কোরিয়ায় অবস্থানকালে তার পরিবর্তে অন্য একজনকে আদালতে হাজির করে জামিন নেওয়া হয়েছে। প্রতারণার মাধ্যমে জামিন নেওয়ার ঘটনায় ওই ব্যক্তি, সংশ্লিষ্ট আইনজীবী, আদালতের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী কিংবা অন্য কেউ জড়িত কি না, তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
এরপর ২ আগস্ট আদালত অভিযোগটি মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করার জন্য খুলনা সদর থানার ওসিকে নির্দেশ দেন। আদালতের নির্দেশে ৬ আগস্ট ফিরোজ আলম শাওনকে প্রধান আসামি এবং আইনজীবী সরদার শাহজাহান আলীকে দ্বিতীয় আসামি করে সদর থানায় মামলা করা হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সদর থানার এসআই মেহেদী হাসান খান বলেন, একটি সিআর মামলায় মূল আসামির পরিবর্তে ভুয়া ব্যক্তিকে আদালতে হাজির করে জামিন নেওয়ার অভিযোগে কোর্ট পিটিশনের মাধ্যমে মামলাটি করা হয়েছে।
তিনি বলেন, মূল আসামি ফিরোজ আলম শাওন দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ কোরিয়ায় বসবাস করছেন। দেশে থাকা অবস্থায় একটি মারামারির ঘটনায় তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। পরে তিনি দক্ষিণ কোরিয়ায় চলে যান। এরপর মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য তার পরিবর্তে অন্য একজনকে আদালতে হাজির করে জামিন নেওয়া হয়েছে বলে তদন্তে প্রাথমিকভাবে উঠে এসেছে।
এখন পুলিশের তদন্তের মূল বিষয় হলো—দক্ষিণ কোরিয়ায় থাকা শাওনের পরিবর্তে কে আদালতে ‘শাওন’ সেজে হাজির হয়েছিল এবং তাকে আদালতে হাজির করার সঙ্গে আর কারা জড়িত ছিলেন। পাশাপাশি আদালতের নথিতে ওই ব্যক্তির পরিচয় কীভাবে যাচাই করা হয়েছিল, সেটিও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর