আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী নীল-সাদা জার্সিতে ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচটি খেলে ফেললেন সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার লিওনেল মেসি। মহাতারকার বিদায়টা আরও রঙিন হতে পারত, যদি ২০২৬ বিশ্বকাপের ট্রফি হাতে তুলে দিতে পারতেন আর্জেন্টিনাকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই স্বপ্ন অধরাই থেকে গেছে।
বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে একপেশে লড়াইয়ে ১-০ গোলে হেরে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন ভেঙে যায় আর্জেন্টিনার। সেই পরাজয়ের পর থেকেই ছড়িয়ে পড়ে নানা ধরনের ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’। এত দিন সেসব নিয়ে নীরব থাকলেও আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানানোর রাতে অবশেষে মুখ খুললেন মেসি।
বিশ্বকাপ-পরবর্তী ফিফা নির্ধারিত প্রথম আন্তর্জাতিক উইন্ডোতেই মেসির বিদায়ী ম্যাচের আয়োজন করে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। বুয়েনস আয়ার্সের ঐতিহ্যবাহী এস্তাদিও মনুমেন্তালে অনুষ্ঠিত সেই প্রীতি ম্যাচে আফ্রিকার দেশ বেনিনকে ৩-০ গোলে হারিয়েছে লিওনেল স্কালোনির দল।
নিজের বিদায়ী ম্যাচটিকে স্মরণীয় করে রাখতে মেসি নিজেই করলেন একটি দারুণ গোল, পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে করালেন আরও দুটি। তাঁর জোড়া অ্যাসিস্ট ও অসাধারণ এক গোলে বিদায়ের আবেগ আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। আর্জেন্টিনার হয়ে বাকি দুটি গোল করেন আরেক বিদায়ী তারকা নিকোলাস ওতামেন্দি এবং তরুণ প্রতিভা নিকো পাজ।
ম্যাচ শেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত বিদায়ী বক্তব্যে বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক স্পষ্ট করে দেন—শেষ বিশ্বকাপে টানা দ্বিতীয়বার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন পূরণে তারা মাঠে নিজেদের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে জাতীয় দলকে ঘিরে বাইরে থেকে ছড়ানো সমালোচনা, গুজব ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সতীর্থদের ঐক্যবদ্ধ থাকার বার্তাও দেন তিনি।
ক্যারিয়ারজুড়ে স্বল্পভাষী হিসেবে পরিচিত মেসি বিদায়ের মুহূর্তে অবশ্য নিজেকে মেলে ধরেন অন্যভাবে। স্বভাবসুলভ শান্ত ভঙ্গিতে, কিন্তু দৃঢ় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তিনি তুলে ধরেন শেষ বিশ্বকাপের কঠিন বাস্তবতা।
হাজারো সমর্থককে আবেগাপ্লুত করে মেসি বলেন, ‘আমার ইচ্ছে করে আমি চিরকাল এই জার্সিতে এখানে থেকে যাই। তবে আমার মনে হচ্ছে, বিদায় জানানোর জন্য এটাই সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। শেষ বিশ্বকাপটা আমার জন্য সত্যিই ভীষণ কঠিন ও মানসিক চাপের ছিল। আমরা আবারও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন বুকে লালন করেছিলাম এবং সেই ট্রফির একেবারে কাছাকাছিও পৌঁছে গিয়েছিলাম।’
ষড়যন্ত্রের নানা তত্ত্বের জবাব দিতে গিয়ে আর্জেন্টাইন অধিনায়ক আরও বলেন, ‘সত্যি বলতে, কিছু মানুষ যেভাবে কাল্পনিক কথা বা অস্বাভাবিক বিষয় ছড়াচ্ছেন, বাস্তবে তেমন কিছুই ঘটেনি। আমরা নিজেদের শতভাগ উজাড় করে দিয়েছিলাম। বিশেষ করে কোয়ার্টার বা সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কঠিন ম্যাচটি শারীরিক ও মানসিকভাবে আমাদের প্রচণ্ড ক্লান্ত করে দিয়েছিল। বাস্তবতা হলো, সেই চরম ধকল কোনোমতে সামলে নিয়েই আমরা ফাইনালের মাঠে নেমেছিলাম।’
মঙ্গলবার মনুমেন্তালে মেসির বিদায়ী বক্তব্য শোনার সময় আবেগ ধরে রাখতে পারেননি গ্যালারিতে থাকা হাজারো সমর্থক। কান্নায় ভেঙে পড়েন তাঁর বিশ্বকাপজয়ী সতীর্থ এনজো ফার্নান্দেজও। পুরো স্টেডিয়াম যখন অশ্রুসিক্ত, তখন মেসি ছিলেন remarkably শান্ত ও সংযত।
বিদায়ী বক্তব্যে শুধু অতীতের স্মৃতি কিংবা বিশ্বকাপের হতাশার কথাই বলেননি তিনি। শেষ বিশ্বকাপ ঘিরে ছড়িয়ে পড়া নানা রহস্য ও গুজবের বাস্তবতা তুলে ধরার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কঠিন সময় মোকাবিলায় ঐক্য, আত্মবিশ্বাস ও লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও মনে করিয়ে দেন আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি অধিনায়ক।
নীল-সাদা জার্সিতে তাঁর শেষ রাতটি তাই শুধু একটি বিদায়ী ম্যাচ হয়ে থাকেনি; হয়ে উঠেছে একটি যুগের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর
স্পোর্টস এর সর্বশেষ খবর