বহুজাতিক অনলাইন খাদ্য সরবরাহকারী প্ল্যাটফর্ম ফুডপ্যান্ডার বিরুদ্ধে কমিশনের বাইরে নানা ধরনের হিডেন চার্জ, জটিল ভাবে হিসাব সরবরাহ, অর্ডার বাতিলের একতরফা জরিমানা ও রিফান্ডের নামে টাকা কেটে নেওয়াসহ ৬টি সুস্পষ্ট অভিযোগ তুলে প্ল্যাটফর্মটি বয়কট অব্যাহত রেখেছে চট্টগ্রাম মহানগরীর রেস্তোরাঁ মালিকদের বড় একটি অংশ।
আজ সকাল সাড়ে ১১টায় বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি, চট্টগ্রাম মহানগরের উদ্যোগে এবং চট্টগ্রাম নগরীর রেস্তোরাঁ মালিকদের বড় একটি অংশগ্রহণে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ফুডপ্যান্ডার বিরুদ্ধে একতরফা ও বৈষম্যমূলক নীতির তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়৷ একই সাথে ৬ দফা দাবি উপস্থাপন করা হয়৷
বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সভাপতি মো. ইমতিয়াজ উদ্দিন নওশাদ'র সভাপতিত্বে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মনজুরুল হক।
সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ জানানো হয়, আন্তর্জাতিক ফ্রাঞ্চাইজভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম ‘ফুডপ্যান্ডা’ বর্তমানে যে শোষণমূলক নীতি চাপিয়ে দিয়েছে, তাতে চট্টগ্রামের হাজার হাজার রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী, লক্ষাধিক শ্রমজীবী মানুষ এবং তাদের পরিবার আজ গভীর সংকটের মুখোমুখি। ইতিমধ্যে বিগত বেশ কয়েকদিন যাবৎ নগরীর রেস্তোরাঁ মালিকদের উল্লেখ যোগ্য একটি অংশ ফুডপ্যান্ডা প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে খাবার সরবরাহ বন্ধ রেখেছে৷ অবিলম্বে তাদের যৌক্তিক দাবি মেনে নেয়া না হলে স্থায়ী ভাবে ফুডপ্যান্ডা প্ল্যাটফর্মটি স্থায়ীভাবে বর্জনের ঘোষনা দিতে বাধ্য হবেন বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়৷
এই আন্দোলনটি বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির কেন্দ্র তথা রাজধানী ঢাকাসহ অন্যান্য শহর গুলোতে হচ্ছে না, শুধু চট্টগ্রাম শহরেই কেন ফুডপ্যান্ডা প্ল্যাটফর্মটির বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছে বিডি২৪লাইভ এর এমন প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক মনজুরুল হক বলেন, বাংলাদেশের নানান আন্দোলন সংগ্রামের সুতিকাগার এই চট্টগ্রাম৷ এই চট্টগ্রাম থেকে ঐতিহাসিক অনেক আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল৷ তিনি আশা করছেন এই আন্দোলন শীঘ্রই ঢাকাসহ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়বে৷ আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ইতিমধ্যে ফুডপ্যান্ডার বিকল্প দেশীয় একাধিক প্ল্যাটফর্ম তাদের সার্ভিস বাড়িয়েছে। ফলে বিগত কয়েকদিনের ফুড ডেলিভারির যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে তা দেশীয় প্ল্যাটফর্ম গুলোর মাধ্যমে পূরণ হচ্ছে৷ সকলের সহযোগীতা পেলে চট্টগ্রামের রেস্তোরাঁ মালিকদের উদ্যোগে নতুন ফুড ডেলিভারি প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা হতে পারে বলেও জানান মনজুরুল হক।
ফুডপ্যান্ডার প্রধান অনিয়ম ও হয়রানিগুলো:
১. লুকানো চার্জ ও অতিরিক্ত ফি: চুক্তিপত্রে নির্দিষ্ট কমিশনের বাইরে অনলাইন পেমেন্ট চার্জ, কমিশনের ওপর ভ্যাট, ট্যাব ফি এবং ইন্টারনেট ফি কেটে নেওয়া হয়, যা ব্যবসায়ীদের লাভের অংশ মারাত্মকভাবে কমিয়ে দিচ্ছে।
২. অস্পষ্ট ও জটিল ইনভয়েস: মাসের হিসাব এতই জটিল যে কোনো সাধারণ হিসাবরক্ষক বা মালিক তা বুঝতে পারেন না। কোন খাতে কেন টাকা কাটা হলো, তার কোনো পরিষ্কার ব্যাখ্যা থাকে না।
৩. অর্ডার বাতিলের একতরফা দায়: ফুডপ্যান্ডার নিজস্ব প্রযুক্তিগত বা ডেলিভারি জটিলতায় অর্ডার বাতিল হলে, তৈরি করা খাবারের পুরো লোকসান রেস্তোরাঁকেই বহন করতে হয়।
৪. AWTF ও লেট চার্জের অত্যাচার: রাইডার দেরিতে খাবার সংগ্রহ করলে গ্রাহক অর্ডার বাতিল করেন, আর তার খেসারত ও জরিমানা চাপানো হয় রেস্তোরাঁ মালিকের ওপর।
৫. একতরফা রিফান্ড কর্তন: কোনো প্রমাণ যাচাই বা রেস্তোরাঁর বক্তব্য না শুনেই গ্রাহকের অভিযোগে একতরফাভাবে রেস্তোরাঁর পাওনা টাকা কেটে নেওয়া হয়।
৬. টাকা আটকে রাখা: বিক্রির টাকা পরিশোধে ১৩ দিন বা তারও বেশি সময় লাগানো হয়, ফলে চলতি মূলধনের সংকটে পড়ে কর্মচারীদের বেতন ও দোকান ভাড়া দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
সুনির্দিষ্ট ৬ দফা দাবি:
১. কমিশনের বাইরে সকল প্রকার লুকানো চার্জ অবিলম্বে বাতিল করে রেস্তোরাঁগুলোর জন্য সর্বোচ্চ ফ্ল্যাট ১৫% কমিশন (অল ইনক্লুসিভ) নির্ধারণ করতে হবে।
২. সহজ, স্পষ্ট ও খাতওয়ারি হিসাবসহ স্বচ্ছ ইনভয়েস প্রদান করতে হবে।
৩. রেস্তোরাঁর দোষ ছাড়া বাতিল অর্ডারের খাবারের সম্পূর্ণ খরচ ফুডপ্যান্ডাকে বহন করতে হবে।
৪. রাইডারদের দেরির জন্য রেস্তোরাঁর ওপর AWT ও লেট চার্জ চাপানো অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
৫. গ্রাহকের অভিযোগে একতরফা রিফান্ড কাটা বন্ধ করে, আগে প্রমাণ যাচাই ও রেস্তোরাঁর বক্তব্য শুনতে হবে।
৬. প্রতি সপ্তাহে নির্দিষ্ট দিনে (সর্বোচ্চ ৭ দিনের মধ্যে) বিক্রির টাকা পরিশোধের ব্যবস্থা করতে হবে।
বিকল্প ব্যবস্থা ও হুশিয়ারি:
বাজারে দেশীয় ফুড ডেলিভারি প্ল্যাটফর্মগুলো (যেমন: ফুডি) মাত্র ১৫% অল-ইনক্লুসিভ কমিশনে অত্যন্ত স্বচ্ছতার সাথে ব্যবসা পরিচালনা করছে। দেশীয় প্রতিষ্ঠান যদি লাভজনকভাবে ব্যবসা করতে পারে, তবে ফুডপ্যান্ডার শোষণমূলক ও অতিরিক্ত কমিশন নীতি কেন আমাদের ওপর বলবৎ করা হবে?
আগামীতে ফুডপ্যান্ডা কর্তৃপক্ষ যৌক্তিক দাবিগুলো মেনে না নিলে, চট্টগ্রাম মহানগরের সকল রেস্তোরাঁ মালিক একযোগে ফুডপ্যান্ডা প্ল্যাটফর্মে সম্পূর্ণভাবে অর্ডার গ্রহণ স্থগিত বা বন্ধ রাখার মতো কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করতে বাধ্য হবে। এর সম্পূর্ণ দায়ভার ফুডপ্যান্ডা কর্তৃপক্ষকেই বহন করতে হবে বলে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি চট্টগ্রাম মহানগর শাখার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে ৷
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর