তুরস্কের আগ্রি প্রদেশের দোগুবেয়াজিত জেলায় জাহাজের আকৃতির একটি ভূতাত্ত্বিক কাঠামোকে ঘিরে নতুন করে অনুসন্ধান চালিয়েছেন গবেষকরা। দীর্ঘদিন ধরে অনেকে কাঠামোটিকে নূহ (আ.)-এর নৌকার সম্ভাব্য ধ্বংসাবশেষ বলে মনে করলেও, সাম্প্রতিক গবেষণায় এখনো এর পক্ষে নিশ্চিত কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
সিভাস জুমহুরিয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বাধীন একটি গবেষক দল সম্প্রতি এলাকাটিতে মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান শেষ করেছে। গবেষণায় কাঠামোটির বিভিন্ন স্থান থেকে প্রায় এক হাজার মাটির নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। পাশাপাশি কোর ড্রিলিংয়ের মাধ্যমে ভূগর্ভের নমুনা নেওয়া এবং আধুনিক রাডার প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাটির নিচের গঠন পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।
গবেষক দলের উপপ্রধান ও মার্কিন গবেষক অ্যান্ড্রু জোনসের মতে, প্রাথমিক অনুসন্ধানে কাঠামোটির প্রকৃতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। আগে ধারণা করা হয়েছিল, দীর্ঘদিনের ক্ষয়প্রক্রিয়ায় কোনো বিশাল পাথর জাহাজের মতো আকৃতি ধারণ করেছে। কিন্তু কোর ড্রিলিংয়ের সময় বিভিন্ন গভীরতা থেকে ধারাবাহিকভাবে মাটির নমুনা পাওয়া গেছে। ফলে কাঠামোটিকে নিছক একটি পাথরের খণ্ড হিসেবে ব্যাখ্যা করার বিষয়টি নতুন করে পর্যালোচনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
তবে এ পর্যবেক্ষণ থেকে কাঠামোটি মানুষের তৈরি বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। গবেষকরা ভূগর্ভে পাওয়া গাঢ় রঙের মাটির নমুনা বিশেষভাবে পরীক্ষা করছেন। এগুলো পচে যাওয়া কাঠের অবশেষ, নাকি প্রাকৃতিক কিংবা অন্য কোনো মানবিক কর্মকাণ্ডের ফল—তা পরীক্ষাগারের বিশ্লেষণের পরই বোঝা যাবে। গত আগস্টে পরিচালিত রাডার স্ক্যানেও কাঠামোটির নিচে কিছু অস্বাভাবিক গঠনের সংকেত পাওয়া গেছে।
গত মে মাসে শুরু হওয়া এই গবেষণার নেতৃত্ব দিচ্ছেন সিভাস জুমহুরিয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক সেনকার আতিলা। পাঁচটি দেশের প্রায় ২০ জন বিজ্ঞানী এতে অংশ নেন। তেলচেকার ও উজেঙ্গিলি গ্রামের মধ্যবর্তী এলাকায় প্রায় ৯০ দিন ধরে চলে মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান।

গবেষণার অংশ হিসেবে ড্রোনের সাহায্যে এলাকার ভূখণ্ডের বিস্তারিত মডেল তৈরি করা হয়। মাটির নিচের গঠন শনাক্ত করতে ব্যবহার করা হয় আধুনিক রাডার প্রযুক্তি। এ ছাড়া বিভিন্ন স্থান থেকে মাটির নমুনা সংগ্রহ ও কোর ড্রিলিংয়ের মাধ্যমে ভূগর্ভের উপাদান পরীক্ষা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সংগৃহীত নমুনাগুলো পরীক্ষার জন্য গবেষণাগারে পাঠানো হয়েছে।
নূহ (আ.)-এর নৌকার সঙ্গে এই কাঠামোর সম্পর্ক নিয়ে আগ্রহের সূত্রপাত ১৯৫৯ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। ওই দিন তুরস্কের ম্যাপিং ইঞ্জিনিয়ার ইলহান দুরুপিনার পূর্ব আনাতোলিয়া অঞ্চলে বিমান থেকে জরিপ চালানোর সময় জাহাজের মতো দেখতে কাঠামোটির সন্ধান পান। এরপর থেকে তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশের গবেষক ও অনুসন্ধানকারীদের আগ্রহের কেন্দ্র হয়ে ওঠে এলাকাটি।
সাম্প্রতিক গবেষণাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কয়েকটি গণমাধ্যমে নূহ (আ.)-এর নৌকার সন্ধান নিশ্চিত হওয়ার দাবি ছড়িয়ে পড়েছে। তবে এ ধরনের দাবিকে এখনই গ্রহণ না করার আহ্বান জানিয়েছেন গবেষক অ্যান্ড্রু জোনস।
তিনি জানান, গবেষণার কাজ এখনো শেষ হয়নি। রাডার থেকে পাওয়া তথ্য, মাটির নমুনা এবং কোর ড্রিলিংয়ের ফলাফল একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে তবেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব। আগামী বছরের এপ্রিল বা মে মাসে গবেষণার চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হতে পারে।
সব মিলিয়ে, তুরস্কের এই রহস্যময় কাঠামো নিয়ে গবেষণায় ভূগর্ভস্থ কিছু অস্বাভাবিক গঠন ও মাটির নমুনা পাওয়া গেলেও সেগুলো নূহ (আ.)-এর নৌকার ধ্বংসাবশেষ—এমন দাবি সমর্থন করার মতো নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। গবেষণাগারের পরীক্ষার ফলাফল ও পরবর্তী বিশ্লেষণই এ রহস্যের বিষয়ে আরও স্পষ্ট ধারণা দিতে পারে।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর