ভারতে সরকারবিরোধী ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) পর এবার আলোচনায় এসেছে নতুন প্ল্যাটফর্ম ‘মাছি জনতা পার্টি’ (এমজেপি)। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামকেন্দ্রিক এই উদ্যোগ আত্মপ্রকাশের মাত্র ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ৪০ লাখের বেশি ভিউ এবং ৩ লাখ ৩০ হাজারের বেশি অনুসারী অর্জন করেছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
রাজনৈতিক ও সামাজিক ঘটনাকে ব্যঙ্গের মাধ্যমে তুলে ধরা এই প্ল্যাটফর্ম ইতোমধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একই সঙ্গে ককরোচ জনতা পার্টির সঙ্গে যোগাযোগ করে যৌথ কর্মসূচি পালনের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখছে সংগঠনটি।
প্রধান বিচারপতির মন্তব্য থেকে নামের অনুপ্রেরণা
ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে মাছি জনতা পার্টির আত্মপ্রকাশ। ‘মাছি মারতে হাতুড়ি ব্যবহার করা যায় না’—প্রধান বিচারপতির এই পর্যবেক্ষণ থেকেই সংগঠনটির নামকরণের অনুপ্রেরণা এসেছে।
গত ৯ অক্টোবর একটি পিটিশনের শুনানিতে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ দিল্লিতে ইন্টারনেট, মেট্রো ও ট্রেন চলাচলে ব্যাপক বিধিনিষেধ আরোপের বিরোধিতা নিয়ে আলোচনা করে। এর আগে ১০ অক্টোবর ককরোচ জনতা পার্টি ‘দিল্লি স্তব্ধ’ কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছিল।
শুনানিতে প্রধান বিচারপতি পর্যবেক্ষণ করেন, নিরাপত্তার প্রয়োজনে গণপরিবহন নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে, তবে পুরো ব্যবস্থাকে অচল করে দেওয়া যুক্তিসংগত নয়। এ প্রসঙ্গেই তিনি বলেন, ‘একটা মাছি মারতে তো আর হাতুড়ি ব্যবহার করা চলে না।’
এই মন্তব্যের পরই ইনস্টাগ্রামে সক্রিয় হয়ে ওঠে মাছি জনতা পার্টি। এক পোস্টে সংগঠনটি লিখেছে, ‘খোদ প্রধান বিচারপতিই যখন বলেছেন মাছি মারতে হাতুড়ি ব্যবহার করা যাবে না, তখন সেই মাছিই এবার গর্জে উঠে বলছে যে সে-ও কারও চেয়ে কম নয়!’
ইনস্টাগ্রামকেন্দ্রিক ব্যঙ্গাত্মক প্ল্যাটফর্ম
মাছি জনতা পার্টি মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক উদ্যোগ। ডিজিটাল রেকর্ড অনুযায়ী, অ্যাকাউন্টটি ২০২১ সালের জুনে তৈরি হয়েছিল। তবে কয়েক দফা নাম পরিবর্তনের পর বর্তমানে ‘makhijantaparty.ig’ ব্যবহারকারীনামে সক্রিয় রয়েছে।
আর্যন (Aaryan) নামের এক শিক্ষার্থী নিজেকে সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। সম্প্রতি সংগঠনটির পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুখপাত্র নিয়োগের বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করা হয়েছে।
আত্মপ্রকাশের পর অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুলসংখ্যক দর্শক ও অনুসারী যুক্ত হওয়ায় প্ল্যাটফর্মটি নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। নিজেদের বক্তব্যে এমজেপি জানিয়েছে, তারা ককরোচ জনতা পার্টির সঙ্গে যোগাযোগ করছে এবং বিভিন্ন প্রতিবাদী কর্মসূচির প্রতি সংহতি প্রকাশ করছে।
কীভাবে আলোচনায় আসে ককরোচ জনতা পার্টি?
মাছি জনতা পার্টির আগে ভারতে আলোচনায় আসে ককরোচ জনতা পার্টি। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত মে মাসে একটি শুনানির সময় বেকার তরুণদের একাংশকে ‘ককরোচ’ বা আরশোলার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছিল। ওই মন্তব্যের পর ব্যঙ্গাত্মক প্রতিবাদী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে সিজেপির আত্মপ্রকাশ ঘটে।
পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিতি পাওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন ইস্যুতে প্রতিবাদ কর্মসূচির উদ্যোগ নেয় সংগঠনটি। পরীক্ষা-সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগে যন্তর মন্তরে তাদের আন্দোলনও আলোচনায় আসে।
সম্প্রতি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে ১০ অক্টোবর যন্তর মন্তরে জমায়েতের ডাক দিয়েছিল সিজেপি। তবে নির্ধারিত সময়ের অন্তত ১০ দিন আগে আবেদন না করা এবং শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে দিল্লি পুলিশ কর্মসূচির অনুমতি বাতিল করে। পরে যন্তর মন্তর এলাকার প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যৌথ কর্মসূচির পরিকল্পনা
নিজেদের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে দেওয়া বক্তব্যে মাছি জনতা পার্টি জানিয়েছে, ককরোচ জনতা পার্টির সঙ্গে যোগাযোগ করে যৌথভাবে কর্মসূচি পালনের সম্ভাবনা যাচাই করা হচ্ছে।
এ ছাড়া সাম্প্রতিক প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া আন্দোলনকারীদের প্রতিও সংহতি প্রকাশ করেছে সংগঠনটি। বিশেষ করে যন্তর মন্তরে প্রতিবাদ ঘিরে সিজেপির নেতাদের আটকের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছে তারা।
এমজেপির বক্তব্য, প্রতিবাদের জন্য নির্ধারিত স্থানেও যদি আন্দোলনকারীরা নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ না পান, তাহলে গণতান্ত্রিক অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
নেতাদের আটক নিয়ে নিন্দা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইসা (AISA) নেত্রী নেহা বোরার আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে মাছি জনতা পার্টি। একই সঙ্গে আইন মেনে ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানিয়েছে তারা।
মঙ্গলবার যন্তর মন্তরে জোরপূর্বক প্রবেশ করে ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলনের অভিযোগে ককরোচ জনতা পার্টির নেতা আশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাসকে আটক করা হয়। তাঁদের আটকের ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে এমজেপি প্রশ্ন তুলেছে, প্রতিবাদের জন্য নির্ধারিত স্থানেও যদি মানুষকে কথা বলতে দেওয়া না হয়, তাহলে গণতন্ত্রের অর্থ কী?
সংগঠনটির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘দূরত্ব নয়, গণতন্ত্রে প্রয়োজন সংলাপের।’
ব্যঙ্গাত্মক প্রতিবাদের নতুন মাত্রা?
ককরোচ জনতা পার্টির পর মাছি জনতা পার্টির আবির্ভাব ভারতের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক প্রতিবাদের নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আদালতের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে সংগঠনের নামকরণ, অল্প সময়ে বিপুলসংখ্যক অনুসারী অর্জন এবং বিদ্যমান প্রতিবাদী প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যোগাযোগের উদ্যোগ—সব মিলিয়ে বিষয়টি নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে।
তবে ইনস্টাগ্রামকেন্দ্রিক এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে কতটা সংগঠিত রাজনৈতিক বা সামাজিক আন্দোলনে রূপ নেবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। আপাতত ব্যঙ্গাত্মক বক্তব্য প্রকাশ এবং বিভিন্ন আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানানোর মধ্য দিয়েই নিজেদের পরিচিতি বাড়ানোর চেষ্টা করছে মাছি জনতা পার্টি।
সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর