কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়ক ধরে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার এগোলেই ইনানীর পাটুয়ারটেক। সমুদ্রসৈকতঘেঁষা এই এলাকায় পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে গড়ে উঠেছে অর্ধশতাধিক রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁ। কাঠ ও বাঁশ দিয়ে তৈরি এসব স্থাপনার অনেকগুলো দেখতে দৃষ্টিনন্দন। কিন্তু পর্যটকদের রাতযাপনের এসব স্থাপনায় অগ্নিনিরাপত্তার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা, ফায়ার লাইসেন্স, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র এবং নির্মাণের প্রয়োজনীয় অনুমোদন রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সম্প্রতি পাটুয়ারটেকের টুপটুপ রেস্ট্রো অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির ঘটনার পর এসব স্থাপনার নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের তথ্য, হোটেল-মোটেল মালিকদের সংগঠনের বক্তব্য এবং প্রশাসনের স্বীকারোক্তিতে উঠে এসেছে, কক্সবাজারের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে বিপুলসংখ্যক হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁ প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই ব্যবসা করছে।
জেলা শহর থেকে রামুর পেঁচারদ্বীপ, উখিয়ার ইনানী ও আশপাশের পর্যটন এলাকাগুলোতে ছোট-বড় মিলিয়ে ছয় শতাধিক হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য। এর মধ্যে পাঁচ শতাধিক প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও লাইসেন্সের ঘাটতি রয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের। অনেক প্রতিষ্ঠান স্থানীয় পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুধু ট্রেড লাইসেন্স নিয়েই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।
ফলে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকা বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের অনুমোদন, তদারকি ও জবাবদিহির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
কক্সবাজারে পর্যটকদের আবাসনের জন্য গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি বড় অংশের অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কর্মকর্তারা।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের লাইসেন্স শাখার কক্সবাজারের পরিদর্শক শফিকুল ইসলাম বলেন, চলতি বছরে মাত্র ৫০টি হোটেল ফায়ার লাইসেন্স নবায়ন করেছে। নতুন ও নবায়নের জন্য আবেদন জমা পড়েছে সর্বোচ্চ ১০০টি। অথচ এর আগে প্রায় ২০০টি হোটেলের ফায়ার লাইসেন্স ছিল।
তিনি বলেন, লাইসেন্স নবায়ন না করায় অনেক হোটেলকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। জনবলসংকটের কারণে নিয়মিত অভিযান চালানো সম্ভব হচ্ছে না। তবে লাইসেন্স নেওয়ার জন্য মালিকদের নোটিশ পাঠানো হচ্ছে।
শফিকুল ইসলামের ভাষ্য, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো ট্রেড লাইসেন্স দেওয়ার সময় ফায়ার লাইসেন্স আছে কি না, তা যাচাই করলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। এতে অনেক প্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে অগ্নিনিরাপত্তার অনুমোদন নিত।
তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন সভায় কক্সবাজারের হোটেল-মোটেলের অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু ব্যবসায়ীরা সচেতন না হলে শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কক্সবাজারের উপপরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ বলেন, জেলায় ব্যাঙের ছাতার মতো হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। এগুলোর সঠিক পরিসংখ্যান কোনো দপ্তরের কাছে নেই। তারপরও জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরাপত্তাব্যবস্থার আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
ইনানীর রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ওই রিসোর্টকে আগে দুইবার নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কর্তৃপক্ষ সতর্ক হয়নি এবং অগ্নিনিরাপত্তার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়নি।
তার মতে, শুধু আইন প্রয়োগ করে অগ্নিকাণ্ড ঠেকানো সম্ভব নয়। এ জন্য ব্যবসায়ীদেরও সচেতন হতে হবে এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
শুধু তাই নয়, অগ্নিনিরাপত্তার পাশাপাশি কক্সবাজারের হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁগুলোর পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, অনেক প্রতিষ্ঠানে কার্যকর পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা নেই। কোথাও কোথাও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও অপর্যাপ্ত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র না থাকার বিষয়টি।
পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজারের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ মোর্শেদ বলেন, জেলায় সর্বোচ্চ ৫০টি হোটেলের পরিবেশগত ছাড়পত্র রয়েছে।
তিনি জানান, প্রয়োজনীয় পরিবেশগত ছাড়পত্র না থাকা এবং সংশ্লিষ্ট বিধি লঙ্ঘনের কারণে গত এক বছরে ৫৮টি হোটেল, মোটেল, রেস্তোরাঁ, রিসোর্ট ও কটেজকে প্রায় দেড় কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একই সময়ে পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকা বা ইসিএতে অবস্থিত শতাধিক হোটেলের বিরুদ্ধে ২৮টি মামলা করা হয়েছে।
খন্দকার মাহমুদ মোর্শেদ বলেন, সাধারণত ২০ কক্ষের কমসংখ্যক কক্ষবিশিষ্ট আবাসিক হোটেলের ক্ষেত্রে পরিবেশগত ছাড়পত্র প্রয়োজন হয় না। একইভাবে ৩০ লাখ টাকার কম বিনিয়োগের রেস্তোরাঁর ক্ষেত্রেও ছাড়পত্রের বাধ্যবাধকতা নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তার মতে, কিছু ব্যবসায়ী এই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছেন। তবে পরিবেশগত ছাড়পত্রের বাধ্যবাধকতা প্রতিষ্ঠানভেদে প্রযোজ্য বিধি ও শ্রেণিবিন্যাসের ওপর নির্ভর করে। ফলে কোনো প্রতিষ্ঠানের ছাড়পত্র না থাকার বিষয়টি যাচাই করতে হলে সেটির ধরন, আয়তন, অবস্থান ও প্রযোজ্য বিধি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের দুই শতাধিক হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ অনুমোদনের জন্য আবেদন করেছে। এর মধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থাকায় প্রায় ৫০টি প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে কতটি প্রতিষ্ঠানের ফায়ার লাইসেন্স নেই, কতটি পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়াই চলছে এবং কতটি নির্মাণের অনুমোদন নেয়নি, তার সমন্বিত ও হালনাগাদ হিসাব পাওয়া যায়নি।
কক্সবাজারের পর্যটন এলাকাগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে নতুন নতুন স্থাপনা গড়ে উঠলেও সেগুলোর অনুমোদন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা যাচাইয়ের দায়িত্ব কোন দপ্তর কতটা পালন করেছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
কক্সবাজার হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম বলেন, সমিতির তালিকাভুক্ত অধিকাংশ হোটেলের প্রয়োজনীয় অনুমোদন রয়েছে। তবে জেলার বেশির ভাগ রিসোর্ট ও কটেজের অনুমোদন নেই। এসব প্রতিষ্ঠান নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করেই ব্যবসা করছে বলে তিনি অভিযোগ করছেন।
আবুল কাশেম বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানকে সমিতির অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তবে তাদের একটি নিয়মের মধ্যে আনা প্রয়োজন। প্রশাসনের উচিত প্রয়োজনীয় বিধিবিধান নিশ্চিত করে পর্যটনশিল্পকে এগিয়ে নেওয়া।
কক্সবাজার নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও বিএনপি নেতা রাশেদ মুহাম্মদ আলী মনে করেন, কোনো দুর্ঘটনা ঘটার পর প্রশাসনের তৎপরতা দেখা গেলেও তার আগে নজরদারির ঘাটতি থেকে যায়।
তিনি বলেন, একটি দুর্ঘটনা ঘটলেই প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। তদন্ত কমিটি গঠন করে। কিন্তু এর আগে তারা কোথায় থাকে? কক্সবাজার জেলায় কতগুলো আবাসিক হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ রয়েছে, তার হিসাবও নেই। অথচ পর্যটন সেল, বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটিসহ কত কমিটি রয়েছে।
রাশেদ মুহাম্মদ আলীর মতে, শুধু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অনিয়ম তদন্ত করলেই হবে না, প্রশাসনিক তদারকির ঘাটতির কারণও খতিয়ে দেখা দরকার।
তিনি বলেন, সরকারের উচিত সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক দপ্তরগুলোর ভূমিকা তদন্ত করে দেখা। প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও ফায়ার লাইসেন্স ছাড়া কীভাবে এতগুলো প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর ব্যবসা করছে, তা বের করা প্রয়োজন।
অধিকাংশ হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট ও কটেজের প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেই বলে স্বীকার করেছেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান।
তিনি বলেন, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর, পর্যটন করপোরেশন, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক) ও জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক বলেন, কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে পর্যটন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হবে। এরপর সেখান থেকে যে নির্দেশনা দেওয়া হবে, তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
স্বাধীন/সা.এ.
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর