আগুনে পুড়ে ছাই কাঠের তৈরি রিসোর্ট। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে পুড়ে যাওয়া আসবাব ও স্থাপনার ভগ্নাংশ। সেখানেই হয়তো মিলতে পারে নিখোঁজ একজনের সন্ধান। এ আশায় কক্সবাজারের উখিয়ার পাটুয়ারটেক সৈকতে টুপটুপ রিসোর্টে আবারও তল্লাশি চালিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। এর আগে আগুনের পর ঘটনাস্থল থেকে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হলেও নিখোঁজ আরেকজনের কোনো সন্ধান মেলেনি। অন্যদিকে উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় হাসপাতালের মর্গে অপেক্ষার প্রহর গুনছেন স্বজনেরা।
গত শনিবার সকালে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের পাশে পাটুয়ারটেক সৈকতে অবস্থিত টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে ১০ জনের মৃত্যু হয়। আগুনে মরদেহগুলো এতটাই পুড়ে বিকৃত হয়েছে যে চেহারা দেখে তাদের পরিচয় শনাক্ত করা যাচ্ছে না। পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এদিকে অগ্নিনিরাপত্তার অনুমোদন ছাড়াই রিসোর্টটি পরিচালিত হচ্ছিল বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স।
সংস্থাটির ভাষ্য, ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে চার মাস আগে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করা হয়েছিল। গত ১১ জুন আনুষ্ঠানিক নোটিশও দেওয়া হয়। এরপরও সেখানে ব্যবসায়িক কার্যক্রম চলছিল।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন) লেফটেন্যান্ট কর্নেল আজাদ আনোয়ার বলেন, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিখোঁজের তালিকায় ১১ জনের নাম ছিল। তাদের মধ্যে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। একজন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
তিনি বলেন, আগুনের সময় অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে ধ্বংসস্তূপের সব জায়গায় তল্লাশি চালানো সম্ভব হয়নি। কাঠের তৈরি ওপরের তলাগুলো ভেঙে নিচে পড়ে যাওয়ায় কেউ চাপা পড়ে আছেন কি না, তা দেখতে গতকাল নতুন করে তল্লাশি চালানো হয়। তবে সেখানে কোনো মরদেহ পাওয়া যায়নি। নিখোঁজ ব্যক্তি আগুন লাগার সময় রিসোর্টের ভেতরে ছিলেন, নাকি বাইরে ছিলেন, তা নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছে প্রশাসন।
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান বলেন, নিখোঁজ ব্যক্তির বিষয়ে নিশ্চিত হতে পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) ও তদন্তকারী দল কাজ করছে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের মুঠোফোন নম্বরের নেটওয়ার্ক লোকেশনসহ অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
পরিচয় শনাক্তে ডিএনএ পরীক্ষা আগুনে নিহত ব্যক্তিদের মরদেহ কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গের হিমঘরে রাখা হয়েছে। গতকাল রোববার সন্ধ্যায় অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) মরদেহগুলো থেকে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, বিভিন্ন গণমাধ্যমে নিহত ব্যক্তিদের কয়েকটি পরিবারের ছবি ও পরিচয় প্রকাশিত হয়েছে। তবে উদ্ধার হওয়া ১০টি মরদেহের প্রকৃত পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, ডিএনএ পরীক্ষার জন্য নমুনা ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে। পরীক্ষা শেষে পরিচয় শনাক্ত করে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এ প্রক্রিয়ায় কিছুদিন সময় লাগতে পারে।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) সুবক্তগীন মাহমুদ সোহেল বলেন, অগ্নিকাণ্ডে আহত কোনো রোগী এখন হাসপাতালে ভর্তি নেই। তবে নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে অনেকেই হাসপাতালে আসছেন।
তিনি বলেন, আগুনে মরদেহগুলো বিকৃত হয়ে যাওয়ায় শুধু দেখে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। নারী, পুরুষ কিংবা শিশু হিসেবে আলাদা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। এ কারণে ডিএনএ পরীক্ষার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার সাজেদুর রহমান বলেন, অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১০ জনের মধ্যে একই পরিবারের ছয়জন ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। মরদেহগুলো এতটাই পুড়ে গেছে যে ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া পরিচয় নিশ্চিত করা কঠিন। পরীক্ষার ফল পেতে কিছুদিন সময় লাগতে পারে।
এদিকে নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে কক্সবাজারে ছুটে এসেছেন অনেকে। কেউ হাসপাতালের মর্গে, কেউ পুড়ে যাওয়া রিসোর্টে খুঁজছেন প্রিয়জনকে। কিন্তু আগুনে মরদেহগুলোর চেহারা এমনভাবে বিকৃত হয়েছে যে পরিচিত মুখ দেখেও কাউকে শনাক্ত করার সুযোগ নেই।
স্বজনদের কেউ কেউ হাত, গলা কিংবা পায়ে থাকা অলংকার দেখে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু তাতেও মিলছে না সমাধান। ডিএনএ পরীক্ষার ফল না আসা পর্যন্ত প্রিয়জনের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা নিশ্চিত হতে পারছেন না তারা।
পুলিশ, হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিস, জেলা প্রশাসন ও স্বজনদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ঢাকার বনশ্রীর ইসরাত জাহান (৩০) ও মিলিতা মেহেজাবিন (২৩), খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান (২৭) ও নাফিসতা মীম (২৭), চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩) এবং পাঁচ বছর বয়সী ফায়িজান আহম্মেদের নাম পাওয়া গেছে। তবে তাদের পরিচয়ের বিষয়ে চূড়ান্ত নিশ্চিতকরণের জন্য ডিএনএ পরীক্ষার ফলের অপেক্ষা রয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ ছয়জনকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। তারা হলেন মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন (৩১), তার স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯), মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২)। অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাদের মধ্যে চারজনকে শনিবার বিকেলে বিমানে ঢাকায় পাঠানো হয়।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বর্তমানে অগ্নিকাণ্ডে আহত কোনো রোগী সেখানে ভর্তি নেই।
টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি ছিল কি না, তা নিয়ে ঘটনার পর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। ফায়ার সার্ভিসের দাবি, রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তা লাইসেন্স ছিল না। ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করার পরও কর্তৃপক্ষ ব্যবসা চালিয়ে গেছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ বলেন, জুন মাসে ফায়ার সার্ভিসের একজন পরিদর্শক রিসোর্টটি পরিদর্শন করেন। তখন ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে ১১ জুন আনুষ্ঠানিক নোটিশ দেওয়া হয়।
মহাপরিচালক বলেন, বিধি লঙ্ঘন করে রিসোর্টটি পরিচালনা করা হচ্ছিল। সরাসরি বলতে গেলে, অনুমোদন ছাড়াই এটি ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিল।
ফায়ার সার্ভিসের ভাষ্য অনুযায়ী, ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় প্রায় চার মাস আগে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করা হয়েছিল। তবে সতর্কবার্তা দেওয়ার পরও কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, ভবনটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনো পদক্ষেপ নিয়েছিল কি না এবং সতর্কতার পরও কীভাবে সেখানে পর্যটকদের অবস্থানের সুযোগ ছিল, সেসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় রিসোর্টের মালিক তানভীর আহমদকে মামলার প্রধান আসামি করা হয়েছে। মামলার আরেক আসামি রিসোর্টের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সুমনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মজুমদার জানান, উপপরিদর্শক (এসআই) আশীষ সূত্রধর শনিবার রাতে মামলাটি করেন। এতে চারজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতপরিচয় আরও ১৯ জনকে আসামি করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় হতাহত ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি ঘটনার কারণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। শনিবার সকাল সাতটার দিকে মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন পাটুয়ারটেক সৈকত এলাকার রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট সকাল আটটা ১৫ মিনিটের দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে ঘটনাস্থল থেকে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর