ভাবুন, আপনি এমন এক দেশে বাস করছেন, যেখানে মৃত্যুর পর আপনার দেহ কোথায় সমাহিত হবে, শেষকৃত্য কীভাবে সম্পন্ন হবে—এসব নিয়ে জীবিত থাকতেই ভাবতে হচ্ছে। কোথাও কবরের জায়গা এতটাই সীমিত যে আগেভাগে সমাধিস্থলের ব্যবস্থা করার প্রয়োজন দেখা দেয়, কোথাও আবার মৃত্যুর পর পরিবারের ওপর আর্থিক ও প্রশাসনিক চাপ কমাতে মানুষ নিজের শেষকৃত্যের পরিকল্পনা করে রাখেন। শুনতে অদ্ভুত মনে হলেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মৃত্যু, সমাধিস্থল ও শেষকৃত্য ঘিরে রয়েছে ব্যতিক্রমী সামাজিক রীতি এবং বিশেষ নিয়মকানুন। তবে সত্যিই কি কোনো দেশে নাগরিকদের নিজের মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নেওয়া আইনত বাধ্যতামূলক? নাকি এর পেছনে রয়েছে ভিন্ন বাস্তবতা?
মৃত্যু জীবনের অবধারিত পরিণতি। কিন্তু মৃত্যুর পর কী হবে, কোথায় সমাহিত করা হবে কিংবা শেষকৃত্যের খরচ কে বহন করবে—এসব প্রশ্নের উত্তর সব দেশে এক নয়। কোনো দেশে কবরের জায়গার সংকট, কোথাও শহুরে জনসংখ্যার চাপ, আবার কোথাও ধর্মীয় বিশ্বাস ও পারিবারিক ঐতিহ্য মানুষের শেষযাত্রার পরিকল্পনাকে প্রভাবিত করে। এই বিষয়গুলো থেকেই তৈরি হয়েছে কিছু ব্যতিক্রমী সামাজিক রীতি। কোথাও মানুষ আগেভাগে শেষকৃত্যের খরচ জমিয়ে রাখেন, কোথাও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে রাখেন নিজের শেষ ইচ্ছা, আবার কোথাও কবরের জায়গা ব্যবস্থাপনায় রয়েছে কঠোর নিয়ম।
তবে শুরুতেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন, বিশ্বের কোনো দেশে প্রত্যেক নাগরিককে নিজের মৃত্যুর প্রস্তুতি নিতেই হবে—এমন সর্বজনীন আইন রয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না। এই ফিচারে তাই কথিত ‘মৃত্যুর প্রস্তুতির আইন’-এর বদলে বিভিন্ন দেশের বাস্তব নিয়ম, সামাজিক রীতি ও মৃত্যুকে ঘিরে ব্যতিক্রমী ব্যবস্থাগুলো তুলে ধরা হলো।

জাপান: মৃত্যুর পরের জীবন গুছিয়ে রাখার প্রস্তুতি!
মৃত্যুর আগে নিজের বাড়িঘর, সম্পদ কিংবা ব্যাংক হিসাব গুছিয়ে রাখার কথা আমরা শুনেছি। কিন্তু মৃত্যুর পর পরিবারের সদস্যদের কী করতে হবে, কোন জিনিস কোথায় রাখা আছে, শেষকৃত্য কীভাবে হবে—এসবও যদি লিখে রেখে যান কেউ, তাহলে কেমন হয়?
জাপানে এমন প্রস্তুতির একটি পরিচিত নাম ‘শুকাতসু’ (Shūkatsu)। জাপানি শব্দটি দিয়ে জীবনের শেষ পর্বের জন্য প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো গুছিয়ে রাখার কার্যক্রম বোঝানো হয়। এর মধ্যে রয়েছে শেষকৃত্যের পরিকল্পনা, সম্পদের হিসাব, উত্তরাধিকারসংক্রান্ত তথ্য এবং পরিবারের জন্য ব্যক্তিগত বার্তা রেখে যাওয়া। এই প্রস্তুতির একটি পরিচিত মাধ্যম হলো ‘এন্ডিং নোট’ বা শেষজীবনের নোট। এতে কেউ লিখে রাখতে পারেন, মৃত্যুর পর তাঁর শেষকৃত্য কীভাবে সম্পন্ন হোক, কোন আত্মীয়কে খবর দিতে হবে কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র কোথায় রাখা আছে।
জাপানের সমাজবিষয়ক প্রকাশনা Nippon.com-এর ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশটিতে এ ধরনের নোট সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা থাকলেও তুলনামূলকভাবে কম মানুষ তা লিখে রাখেন। নোটে সম্পদ ও আর্থিক তথ্যের পাশাপাশি শেষকৃত্য এবং সমাধিস্থল সম্পর্কে ইচ্ছার কথাও উল্লেখ করা হয়। তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জাপানে প্রত্যেক নাগরিকের জন্য এন্ডিং নোট লেখা বাধ্যতামূলক নয়। এটি মূলত সামাজিক প্রবণতা ও ব্যক্তিগত প্রস্তুতির অংশ।
এর পেছনে রয়েছে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি, একা বসবাসের প্রবণতা এবং মৃত্যুর পর পরিবারের সদস্যদের ওপর চাপ কমানোর আকাঙ্ক্ষা। একসময় মৃত্যুর পরের অধিকাংশ কাজ পরিবারের সদস্যরা সামলাতেন। কিন্তু পরিবার ছোট হয়ে আসা এবং একা বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের শেষজীবন নিয়ে আগেভাগে ভাবার গুরুত্বও বেড়েছে।

সিঙ্গাপুর: কবর থাকবে, কিন্তু চিরদিনের জন্য নয়!
মৃত্যু ও সমাধিস্থল ঘিরে সবচেয়ে ব্যতিক্রমী সরকারি ব্যবস্থাগুলোর একটি রয়েছে সিঙ্গাপুরে। ছোট আয়তনের এই দেশটিতে আবাসন, পরিবহন, শিল্প ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় স্থাপনার জন্য জমির চাহিদা অনেক। তাই কবরস্থানের জমিও পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করতে হয়।
সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল এনভায়রনমেন্ট এজেন্সি (NEA)-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৮ সালের ১ নভেম্বর থেকে সাধারণ নিয়মে কবরের মেয়াদ ১৫ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। মেয়াদ শেষ হলে কবর খনন করে দেহাবশেষ তুলে নেওয়া হয়। এরপর ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী দেহাবশেষ দাহ করা অথবা ছোট জায়গায় পুনরায় সমাহিত করার ব্যবস্থা করা হয়। অর্থাৎ, সিঙ্গাপুরে কাউকে সমাহিত করার অর্থ এই নয় যে তাঁর কবর অনির্দিষ্টকাল একই জায়গায় থাকবে।
এর মূল কারণ জমির সীমাবদ্ধতা। সরকার মনে করে, একই জমি দীর্ঘদিন একটি কবরের জন্য সংরক্ষিত রাখলে ভবিষ্যতে নতুন সমাধিস্থলের ব্যবস্থা করা কঠিন হয়ে পড়বে। সিঙ্গাপুরে এ জন্য বিশেষ ধরনের সমাধিব্যবস্থাও চালু হয়েছে। ক্রিপ্ট বারিয়াল সিস্টেম (Crypt Burial System)-এ কংক্রিটের তৈরি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে কবর দেওয়া হয়। এর উদ্দেশ্য হলো সীমিত জমির ব্যবহার আরও কার্যকর করা।
ভাবুন, আপনি এমন একটি দেশে বাস করছেন, যেখানে মৃত্যুর পর আপনার সমাধিস্থলও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বরাদ্দ করা হয়! তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রত্যেক নাগরিককে জীবিত অবস্থায় নিজের কবর বুক করতে হয়। নিয়মটি মূলত মৃত্যুর পর সমাধিস্থল ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পর্কিত।

জার্মানি: কবরের জায়গা আগাম নির্ধারণ করা যায়?
জার্মানিতে কবর ব্যবস্থাপনার নিয়ম স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও কবরস্থানের নীতির ওপর নির্ভর করে। দেশটির সরকারি প্রশাসনিক পোর্টালে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শর্তে কোনো ব্যক্তি কবর ব্যবহারের অধিকার পেতে পারেন। স্থানীয় বিধি অনুমতি দিলে মৃত্যুর আগেও কবরের জায়গার ব্যবহারের অধিকার নেওয়া সম্ভব। তবে নির্দিষ্ট কোনো কবরের জায়গা পাওয়ার সর্বজনীন আইনি অধিকার নেই। এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—কবরের জায়গার অধিকার পাওয়া মানেই সেটির মালিক হয়ে যাওয়া নয়। সাধারণত নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কবর ব্যবহারের অধিকার দেওয়া হয়। সেই সময়সীমা, নবায়নের সুযোগ এবং উত্তরাধিকারীর কাছে অধিকার হস্তান্তরের নিয়ম স্থানীয় বিধির ওপর নির্ভর করতে পারে।
জার্মানির এই ব্যবস্থা দেখায়, মৃত্যু-পরবর্তী পরিকল্পনা কেবল ব্যক্তিগত বা ধর্মীয় বিষয় নয়; এর সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন, জমির ব্যবহার এবং আইনি ব্যবস্থাপনাও জড়িত।
হংকং: মৃত্যুর পরও জায়গার হিসাব
বিশ্বের ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলগুলোর একটি হংকং। সেখানে সমাধিস্থলের জায়গা ও দেহাবশেষ সংরক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক বিষয়। হংকংয়ের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সরকারি কবরস্থানে সমাহিত দেহাবশেষ সাধারণত ছয় বছর পর তুলে নেওয়ার নিয়ম রয়েছে। তবে প্রযোজ্য নিয়ম ও ব্যবস্থাপনা অনুযায়ী বিষয়টি নির্ধারিত হয়।
অন্যদিকে, দাহের পর দেহাবশেষ সংরক্ষণের জন্য রয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা, যেখানে পরিবারের সদস্যরা নির্ধারিত স্থানে অস্থি সংরক্ষণ করতে পারেন। সরকারি কোলাম্বারিয়ামে অস্থি রাখার স্থান বরাদ্দের জন্য আবেদন ও নির্দিষ্ট শর্ত রয়েছে। এর পেছনেও রয়েছে জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং সীমিত জমির বাস্তবতা।
তবে হংকংয়ের সব কবরস্থান বা সব ধরনের সমাধির ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রযোজ্য—এমন নয়। সরকারি ও বেসরকারি কবরস্থানের ব্যবস্থাপনায় পার্থক্য থাকতে পারে।
বিভিন্ন দেশের এসব উদাহরণ থেকে বোঝা যায়, নিজের মৃত্যুর প্রস্তুতি নেওয়ার অর্থ সব সময় কবরের জায়গা বুক করা নয়।

এর মধ্যে থাকতে পারে—মৃত্যুর পর শেষকৃত্য কীভাবে সম্পন্ন হবে, সে বিষয়ে নিজের ইচ্ছা জানিয়ে রাখা; গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ও সম্পদের তথ্য পরিবারের কাছে গুছিয়ে রাখা; প্রযোজ্য ক্ষেত্রে উইল তৈরি করা; পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে চিকিৎসা, শেষকৃত্য ও সমাধিস্থল নিয়ে আলোচনা করা; নিজের অনলাইন অ্যাকাউন্ট ও ডিজিটাল তথ্যের ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে নির্দেশনা রেখে যাওয়া।
এ ধরনের পরিকল্পনা মৃত্যুর পর পরিবারের সদস্যদের বিভ্রান্তি ও অপ্রয়োজনীয় চাপ কমাতে পারে। তবে সব দেশের আইন, ধর্মীয় রীতি ও সামাজিক বাস্তবতা এক নয়। তাই কোনো একটি দেশের অভিজ্ঞতাকে সবার জন্য প্রযোজ্য নিয়ম হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
‘যে দেশে নিজের মৃত্যুর জন্যও প্রস্তুতি নিতে হয়’—শিরোনামটি কৌতূহল তৈরি করলেও বাস্তবতা আরও সূক্ষ্ম।
জাপানে নিজের শেষজীবন গুছিয়ে রাখার সামাজিক প্রবণতা রয়েছে। সিঙ্গাপুরে জমির সীমাবদ্ধতার কারণে কবরের মেয়াদ নির্দিষ্ট। জার্মানিতে স্থানীয় বিধি অনুসারে মৃত্যুর আগেই কবর ব্যবহারের অধিকার নেওয়ার সুযোগ থাকতে পারে। হংকংয়েও কবর ও দেহাবশেষ সংরক্ষণে রয়েছে বিশেষ নিয়ম।
কিন্তু এসব উদাহরণের কোনোটিই প্রমাণ করে না যে ওই দেশগুলোর প্রত্যেক নাগরিককে নিজের মৃত্যুর প্রস্তুতি নিতেই হবে।
বরং এগুলো দেখায়, মৃত্যু একটি ব্যক্তিগত ঘটনা হলেও মৃত্যুর পরের ব্যবস্থাপনা সমাজ, পরিবার, আইন এবং পরিবেশের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। জমির সংকট, বয়স্ক জনসংখ্যা, পরিবর্তিত পারিবারিক কাঠামো এবং ব্যক্তিগত ইচ্ছাকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা—সব মিলিয়ে অনেক সমাজে শেষজীবনের পরিকল্পনা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। মৃত্যু নিয়ে কথা বলা অনেকের কাছে অস্বস্তিকর। কিন্তু আগেভাগে কিছু বিষয় গুছিয়ে রাখা কখনো কখনো জীবিত মানুষের জন্যই স্বস্তি বয়ে আনে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু এই নয়—মৃত্যুর পর কোথায় জায়গা হবে? বরং প্রশ্ন হলো, নিজের অনুপস্থিতিতে প্রিয়জনদের জন্য কতটা সহজ করে রেখে যেতে চাই আমরা? মৃত্যুর প্রস্তুতি তাই সব সময় মৃত্যুকে ঘিরে নয়; কখনো কখনো এটি জীবিত মানুষগুলোর প্রতি দায়িত্ববোধেরও প্রকাশ।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর
ভিন্ন স্বাদের খবর এর সর্বশেষ খবর