গাজীপুরের টঙ্গীর আউচপাড়া এলাকায় একটি আবাসিক মাদ্রাসায় ছয় বছর বয়সী শিশুকে যৌন নিপীড়ন ও অভিযুক্ত শিক্ষককে মারধরের পর বিষয়টি নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছেন শিশুটির বাবা শাহজালাল রুমি।
তিনি বলেন, ‘আমি আমার সন্তানের বিচার চাইতে মাদ্রাসায় গিয়েছিলাম, মব সৃষ্টি করতে নয়। প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, আমি নাকি মব সৃষ্টি করেছি এবং ফ্ল্যাট দখল করতে গিয়েছি। আমি কেন মব সৃষ্টি করব? যদি আমি মব সৃষ্টি করতাম, তাহলে সেখানে ২০০ লোক ছিল, তারা সবাই আমাকে মারল না কেন? আমি তো একজন বাবা হিসেবে আমার সন্তানের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিচার চাইতে গিয়েছিলাম।’
শনিবার (২৪ অক্টোবর) দিনগত রাত ৩টার দিকে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি নিজের অবস্থান তুলে ধরেন। এসময় তিনি মেয়ের প্রতি নির্যাতনের অভিযোগের বিচার দাবি করেন এবং দেশবাসীর সহযোগিতা কামনা করেন।
মাদ্রাসায় ভাঙচুরের অভিযোগের বিষয়ে রুমি বলেন, “আমি স্বীকার করছি, সেখানে একটি ছোট কাচের গ্লাস ভেঙেছিল। এর ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথাও আমি বলেছি। তবে শিক্ষক আসার আগেই গ্লাসটি ভেঙেছিল। ওই সময়ের ভিডিও রেকর্ডও রয়েছে। আমি ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো কিছু ভাঙতে চাইনি।”
মাদ্রাসা থেকে ১৭ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগের জবাবে রুমি বলেন, “প্রতিষ্ঠানে সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে। আমি কোথায় ১৭ লাখ টাকা নিয়ে গেছি, তা সিসিটিভি ফুটেজ যাচাই করলেই পরিষ্কার হবে। মাদ্রাসায় এত টাকা কীভাবে রাখা হয়, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার। আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোরও নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত।”
মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে রুমি আরও বলেন, “আমি মাদ্রাসা বা শিক্ষকদের বিরুদ্ধে নই। দ্বিনি শিক্ষা গ্রহণের জন্যই আমি আমার মেয়েকে সেখানে পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু যেখানে আমার সন্তান নিরাপদ থাকবে না, সেখানে এমন ঘটনা ঘটলে একজন বাবা হিসেবে আমার করণীয় কী? আমি ইসলাম কিংবা প্রকৃত আলেমদের বিরুদ্ধে কথা বলছি না। যারা ধর্মীয় পরিচয়কে ব্যবহার করে অপরাধ করে এবং সত্য আড়াল করার চেষ্টা করে, আমি তাদের বিরুদ্ধেই কথা বলছি।”
ঘটনার পর নিজের মানসিক অবস্থার কথা তুলে ধরে রুমি বলেন, ‘এই ঘটনার পর আমি এক রাতও ঠিকমতো ঘুমাতে পারিনি। আমার দিন কীভাবে কাটছে, তা আল্লাহই ভালো জানেন। আমার জায়গায় অন্য কেউ থাকলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারত। আমি একজন বাবা। আমার সন্তানের সঙ্গে এমন ঘটনা ঘটার কথা শোনার পর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছিল।’
মাদ্রাসার অধ্যক্ষের কাছে অভিযোগ জানিয়েও প্রতিকার না পাওয়ার দাবি করে তিনি বলেন, ‘ঘটনার বিষয়ে আমি তিন দিন আগেই অধ্যক্ষকে অভিযোগ জানিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি বারবার বলেছেন, তিনি কিছু জানেন না। আমি তার কক্ষের বাইরে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেছি। পরে তার সঙ্গে কথা বলতে গেলে এমন আচরণ করেছেন, যেন তিনি আমার সঙ্গে দেখা করতেই চান না। আমি জানতে চেয়েছি, অভিযোগ জানানোর পরও কেন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি?’
রুমি আরও দাবি করেন, মেয়েদের নিরাপত্তার জন্য কক্ষে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। সেই আশ্বাসের ভিত্তিতে তিনি আবারও মেয়েকে মাদ্রাসায় পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তী ঘটনা সামনে আসার পর তিনি আরও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তার ভাষ্য, অভিযুক্ত ব্যক্তি শিশুটির নানাকে বার্তা দিয়ে ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ না করার কথা জানিয়েছিলেন।
শিশুকে ভয় দেখানোর অভিযোগ তুলে রুমি বলেন, ‘আমার বাচ্চাকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল- বাসায় গিয়ে কাউকে কিছু বললে তাকে মেরে ফেলা হবে। এ কারণে শিশুটি ভয়ে তিন দিন কিছু বলতে পারেনি বলে আমি জানতে পেরেছি। পরে মায়ের কাছে বিষয়টি প্রকাশ করে। একজন শিশুর সঙ্গে এমন ঘটনা ঘটলে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করা জরুরি।’
নিজের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার বিষয়ে রুমি বলেন, “বিকেলে জানতে পেরেছি, আমার নামে মামলা হয়েছে। আইন যদি মনে করে আমি অপরাধী, তাহলে যে শাস্তি হবে, তা মেনে নেব। আইনের প্রতি আমার শ্রদ্ধা রয়েছে এবং আমি মামলায় লড়ব। তবে আমার সন্তানের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনারও সুষ্ঠু বিচার চাই।”
দেশবাসীর কাছে সহযোগিতা চেয়ে রুমি বলেন, “আমার মেয়ের সঙ্গে যে ঘটনার অভিযোগ উঠেছে, তা যদি আপনাদের নিজের সন্তানের সঙ্গে ঘটত, তাহলে কি আপনারা মেনে নিতে পারতেন? আমি আপনাদের সহযোগিতা চাই। আমার সন্তানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য সবাই এগিয়ে আসুন।”
রুমি আরও বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির পরিচয়ের ভিত্তিতে অন্ধভাবে বিশ্বাস না করে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি। একই সঙ্গে তিনি শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দাবি জানান। এ সময় কনটেন্ট ক্রিয়েটর রুমির বন্ধু তাজ উপস্থিত ছিলেন।
কুশল/সাএ
সর্বশেষ খবর
জেলার খবর এর সর্বশেষ খবর