কক্সবাজারের উখিয়ায় টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা মামলায় গুরুতর অপরাধের ধারা বাদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় মামলার রেকর্ডিং অফিসার ও উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মজুমদারকে তলব করেছেন আদালত।
আগামী বুধবার (২৯ অক্টোবর) সশরীরে হাজির হয়ে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা ও বিভাগীয় শাস্তির নির্দেশ দেওয়া হবে না কেন, তার ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) বিকেলে উখিয়ার আমলী আদালতের বিচারক ও কক্সবাজারের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আসাদ উদ্দিন মো. আসিফ এ আদেশ দেন।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, গত ১৭ অক্টোবর দায়ের করা মামলায় দণ্ডবিধির ৩০৪ ধারা অন্তর্ভুক্ত না করে তুলনামূলক কম শাস্তির বিধানসংবলিত ৩০৪-ক, ৩৩৮ ও ৩৪ ধারায় মামলা রেকর্ড করা হয়। পরে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ৩০৪ ধারা সংযোজনের আবেদন করেন। এ পরিস্থিতিতে মামলা রেকর্ডের সময় গুরুতর ধারাটি কেন অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, সে বিষয়ে ওসির ব্যাখ্যা চেয়েছেন আদালত।
গত ১৭ অক্টোবর রাতে কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ সড়কের ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এ ঘটনায় ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পর্যটকদের প্রাণহানির এই ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। অগ্নিকাণ্ডের রাতেই উখিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আশিস সূত্রধর বাদী হয়ে অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে মামলা করেন।
মামলায় রিসোর্টের একজন মালিক ও তিন ব্যবস্থাপককে এজাহারনামীয় আসামি করা হয়। এ ছাড়া রিসোর্টের ১৯ জন কর্মচারীকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। এ মামলার চার নম্বর আসামি জাহিদ হোসেন সুমন (২৯) গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে কক্সবাজার জেলা কারাগারে রয়েছেন। তার রিমান্ড আবেদনের শুনানি মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
মামলার এফআইআর, এজাহার ও অন্যান্য নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, রিসোর্টটির ফায়ার লাইসেন্স ছিল না। সেখানে অগ্নিনির্বাপণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ও ফায়ার এক্সিট পয়েন্টও ছিল না বলে মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের সময় পর্যটকেরা বের হওয়ার পথ না পেয়ে প্রাণ হারান বলে অভিযোগ উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে মামলাটি রেকর্ড করার সময় দণ্ডবিধির ৩০৪ ধারা অন্তর্ভুক্ত না করার বিষয়টি আদালতের নজরে আসে। দণ্ডবিধির ৩০৪ ধারায় অপরাধের ধরন ও পরিস্থিতি অনুযায়ী যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
অন্যদিকে, মামলায় প্রথমে অন্তর্ভুক্ত করা ৩০৪-ক, ৩৩৮ ও ৩৪ ধারার ক্ষেত্রে অপরাধের ধরন অনুযায়ী শাস্তির বিধান ভিন্ন। ৩০৪-ক ধারায় অবহেলাজনিত মৃত্যুর জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ১৭ অক্টোবর ৩০৪-ক, ৩৩৮ ও ৩৪ ধারায় মামলাটি রেকর্ড করা হয়। এর পরদিন ১৯ অক্টোবর তদন্তকারী কর্মকর্তা মামলায় ৩০৪ ধারা সংযোজনের আবেদন করেন। কিন্তু মামলা রেকর্ডের সময় ওসি আতিকুর রহমান কেন ওই ধারাটি অন্তর্ভুক্ত করেননি, সে বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়েছেন বিচারক।
আগামী বুধবার আদালতে হাজির হয়ে ওসিকে ব্যাখ্যা দিতে হবে, কেন তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এবং বিভাগীয় শাস্তির নির্দেশ দেওয়া হবে না।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উখিয়া থানার এসআই রোমন ঘোষ গণমাধ্যমে বলেন, ‘মামলার তদন্তের স্বার্থে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে যা করার, তা-ই করা হচ্ছে।’
মামলার অভিযোগপত্র দেওয়ার আগে এজাহারে ধারা সংযোজনের সুযোগ আছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটি একটি তদন্তাধীন মামলা। এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না।’
অন্যদিকে, কক্সবাজার জেলা পুলিশের ফোকাল পারসন ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. অহিদুর রহমান গণমাধ্যমে বলেন, আদালত চাইলে যে কাউকে তলব করতে পারেন। তলব করা হলে সংশ্লিষ্ট রেকর্ডিং অফিসার লিখিত জবাব দেবেন। তবে উখিয়া থানার ওসিকে তলবের বিষয়ে পুলিশ এখনো কোনো আদেশ পায়নি বলে জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, যে মামলায় ওসিকে তলব করা হয়েছে বলে বলা হচ্ছে, সেই মামলায় নতুন একটি ধারা সংযোজনের আবেদন করা হয়েছে এবং আদালত তা গ্রহণ করেছেন।
মামলা তদন্তাধীন থাকা অবস্থায় ধারা সংযোজনের সুযোগ রয়েছে কি না, জানতে চাইলে অহিদুর রহমান বলেন, মামলা রেকর্ডের সময় কোনো ভুল হলে তা সংশোধন বা সংযোজনের সুযোগ রয়েছে।
কক্সবাজার আইন কলেজের প্রভাষক সেজান এহেছান বলেন, সাধারণত এজাহার একবারই দায়ের করা হয়। এজাহার সংশোধন, সংযোজন, বিয়োজন বা পরিমার্জনের আইনগত সুযোগ নেই। তবে তদন্ত চলাকালে তদন্তকারী কর্মকর্তা যদি দেখেন, অপরাধটি অত্যন্ত গুরুতর ও মারাত্মক, সে ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট ধারা উল্লেখ করে আদালতকে অবহিত করে তদন্ত চালাতে পারেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
স্বাধীন/সা.এ.
সর্বশেষ খবর