ভারতের উত্তর প্রদেশে গরু পাচারের অভিযোগে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের পায়ে গুলি করে আহত করার একের পর এক ঘটনা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়ভাবে ‘অপারেশন ল্যাংড়া’ নামে পরিচিত এ ধরনের ঘটনায় আহতদের অধিকাংশই মুসলিম। মানবাধিকারকর্মীদের অভিযোগ, অপরাধ দমনের নামে বিচারবহির্ভূত শাস্তির শিকার হচ্ছেন তাঁরা।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তর প্রদেশে গরু পাচারের অভিযোগে আটক বা সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের পায়ে, বিশেষ করে হাঁটুর নিচে গুলি করার অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে। পুলিশের দাবি, সন্দেহভাজনরা পালানোর চেষ্টা করলে কিংবা পুলিশের ওপর হামলা চালালে আত্মরক্ষার্থে গুলি করা হয়। তবে গুলির আঘাতের ধরন ও ঘটনার পুনরাবৃত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকারকর্মীরা।
২০২০ সাল থেকে প্রায় ৬৫০টি গুলির ঘটনা
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেটের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে উত্তর প্রদেশে গরু পাচারের অভিযোগে প্রায় ৬৫০টি ঘটনায় সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের গুলি করে আহত করা হয়েছে।
এর মধ্যে ২০০টির বেশি ঘটনা স্বাধীনভাবে যাচাই করেছে এপি।
গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া ৬২৭টি ঘটনার মধ্যে ৯০ শতাংশের বেশি আহত ব্যক্তি মুসলিম।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পুলিশের প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে এসব ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। ফলে প্রকৃত ঘটনার সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
হাঁটুর নিচে গুলি, প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা
বেশির ভাগ ঘটনায় সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের হাঁটুর নিচে গুলি লাগার বিষয়টি বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
উত্তর প্রদেশের ফরেনসিক চিকিৎসাবিদ্যার অধ্যাপক মোহাম্মদ কলিম খান বলেন, দূর থেকে পালিয়ে যাওয়া কোনো ব্যক্তির পায়ের পেশিতে এমনভাবে গুলি লাগা, যাতে হাড় ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, অত্যন্ত অস্বাভাবিক।
তাঁর মতে, এ ধরনের আঘাত কাছ থেকে পরিকল্পিতভাবে গুলি করার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিতে পারে।
মানবাধিকার আইনজীবী ও অধিকারকর্মীদের আশঙ্কা, অপরাধ প্রমাণের আগেই সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের স্থায়ীভাবে শারীরিক ক্ষতির মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। এতে আইনের শাসন ও নাগরিক অধিকারের সুরক্ষা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থানীয়ভাবে ‘অপারেশন ল্যাংড়া’ নামে পরিচিত এ ধরনের গুলির ঘটনা উত্তর প্রদেশের বাইরেও ভারতের অন্যান্য রাজ্যে দেখা যাচ্ছে।
ধর্মীয় পক্ষপাতের অভিযোগ অস্বীকার পুলিশের
অভিযোগ অস্বীকার করে উত্তর প্রদেশের জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা অমিতাভ যশ জানিয়েছেন, পুলিশকে কেবল আত্মরক্ষার প্রয়োজনে গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের পায়ে গুলি করার কোনো নীতিগত নির্দেশনা নেই।
আহতদের মধ্যে মুসলিমদের সংখ্যা বেশি হওয়ার বিষয়ে তাঁর ব্যাখ্যা, গবাদিপশুর ব্যবসায় মুসলিম সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ তুলনামূলক বেশি।
তবে পুলিশের প্রতিটি অভিযানের যথাযথ জবাবদিহি থাকা প্রয়োজন বলেও স্বীকার করেছেন তিনি।
রাজ্য পুলিশের দাবি, অপরাধের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।
পুলিশের গুলিতে নিহত ৩১৬ জন, এক-তৃতীয়াংশ মুসলিম
এপির সংগ্রহ করা উত্তর প্রদেশ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের মার্চে যোগী আদিত্যনাথ মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে চলতি বছরের ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত পুলিশের সঙ্গে কথিত সংঘর্ষে ৩১৬ জন সন্দেহভাজন নিহত হয়েছেন।
নিহতদের মধ্যে ১১০ জন মুসলিম, যা মোট সংখ্যার প্রায় ৩৫ শতাংশ। অথচ উত্তর প্রদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ মুসলিম।
একই সময়ে পুলিশের গুলিতে আহত হয়েছেন ১২ হাজার ৮৯০ জন সন্দেহভাজন ব্যক্তি।
অন্যদিকে এসব অভিযানে ১৮ পুলিশ সদস্য নিহত এবং ১ হাজার ৯৫৩ জন আহত হয়েছেন বলে পুলিশের পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে গুলিবিদ্ধ সব সন্দেহভাজন ব্যক্তির ধর্মীয় পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়নি।
সমালোচকদের অভিযোগ, অপরাধ দমনের কঠোর নীতির আড়ালে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হচ্ছেন। যদিও রাজ্য পুলিশ এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
গুলিতে পঙ্গুত্ব, অনিশ্চয়তায় পরিবার
পুলিশের গুলিতে আহত ব্যক্তিদের শারীরিক ক্ষতির পাশাপাশি তাঁদের পরিবারগুলোও ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে বলে এপির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
বার্তা সংস্থাটি গুলিবিদ্ধ ছয় মুসলিম ব্যক্তির স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেছে। প্রতিশোধের আশঙ্কায় তাঁরা নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করতে রাজি হননি।
তাঁদের স্বজনদের কেউ কারাগারে রয়েছেন, আবার কেউ আত্মগোপনে আছেন।
দুই মা জানিয়েছেন, তাঁদের ছেলেরা মহিষের ব্যবসা করতেন। তাঁদের দাবি, মহিষ গরু সুরক্ষাসংক্রান্ত আইনের আওতায় পড়ে না। অথচ পুলিশের গুলিতে আহত হওয়ার পর তাঁদের ছেলেরা স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা ও কাজ করার সক্ষমতা হারিয়েছেন।
ফলে পরিবারগুলো এখন অন্যের সহায়তা ও ছোট অঙ্কের ঋণের ওপর নির্ভর করে জীবনযাপন করছে।
এক মা জানান, তাঁর ছেলে এখন খুঁড়িয়ে হাঁটেন। আগের মতো কাজ করতে না পারায় পরিবারের আয় বন্ধ হয়ে গেছে। অন্যের সাহায্যেই তাঁদের দিন কাটছে।
আইনের শাসন ও মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগ
উত্তর প্রদেশে পুলিশের এ ধরনের অভিযান নিয়ে মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী ও বিচারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
তাঁদের মতে, কোনো ব্যক্তি অপরাধে জড়িত কি না, তা নির্ধারণের দায়িত্ব আদালতের। বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে শারীরিকভাবে অক্ষম করে দেওয়ার অভিযোগ সত্য হলে তা মৌলিক মানবাধিকার ও আইনের শাসনের পরিপন্থী।
এদিকে পুলিশের দাবি, অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার সময় আইন মেনেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তবে এপির অনুসন্ধানে উঠে আসা বিপুলসংখ্যক গুলির ঘটনা, আহতদের ধর্মীয় পরিচয় এবং আঘাতের ধরন ভারতের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকাণ্ডে জবাবদিহি ও নিরপেক্ষতার প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনেছে।
সূত্র: এপি
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর
সারাবিশ্ব এর সর্বশেষ খবর