জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রশংসা করেছেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও রাষ্ট্র গঠনের প্রচেষ্টায় জাপানের জোরালো সমর্থনের আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও অভিন্ন মূল্যবোধের ভিত্তিতে দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও জোরদার করার অঙ্গীকারও করেছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তারেক রহমান ও সানায়ে তাকাইচির মধ্যে দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর চার দিনের জাপান সফরের দ্বিতীয় দিনে এই বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে দুই নেতা যৌথ ঘোষণা দেন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সহযোগিতা নিয়ে কয়েকটি সমঝোতা স্মারক বিনিময় করেন। জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত বিবৃতিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
বৈঠকের পর নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ দেওয়া এক পোস্টে তাকাইচি বলেন, গণতন্ত্রের মতো অভিন্ন মূল্যবোধে বিশ্বাসী বন্ধু রাষ্ট্রের নেতা হিসেবে তারেক রহমানের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে অভিনন্দন জানাতে পেরে তিনি আনন্দিত। গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বাংলাদেশের সরকারের রাষ্ট্র গঠন ও জাতীয় উন্নয়নের উদ্যোগগুলোকে জাপান দৃঢ়ভাবে সমর্থন করবে বলেও জানান তিনি।
তাকাইচি বলেন, ‘মুক্ত ও অবাধ ইন্দো-প্যাসিফিক’ অঞ্চল প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ জাপানের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে সংযুক্তকারী বাংলাদেশের কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান দুই দেশের সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বৈঠকে দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। উভয় নেতা বঙ্গোপসাগরীয় শিল্প প্রবৃদ্ধি বলয় বা ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ (বিগ-বি) উদ্যোগকে নতুন কৌশলগত কাঠামোয় এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে একমত হন। ‘শেয়ারিং প্রসপারিটি বিগ-বি’ নামের এই উদ্যোগের মাধ্যমে যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি, দুর্যোগ ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলা এবং আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর নতুন বিনিয়োগ এক ট্রিলিয়ন ইয়েনে পৌঁছাতে পারে। এর মাধ্যমে প্রায় দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছেন তাকাইচি। বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বাড়াতে শিগগিরই একটি অর্থনৈতিক প্রতিনিধিদল পাঠানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছেন তিনি।
বৈঠকে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের পাশাপাশি বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) দ্রুত কার্যকর করা, কৃষি, মৎস্য, পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন ও বিমান চলাচল খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে দুই নেতা একমত হন। বাংলাদেশের ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রতিও প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তাকাইচি। জবাবে বাংলাদেশের সরকার স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করেছে বলে জাপানের সরকারি বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
বৈঠকে নিরাপত্তা সহযোগিতার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। বাংলাদেশের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়াতে জাপান টহলজাহাজ সরবরাহের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানানো হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা অব্যাহত রাখা এবং আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে যৌথভাবে কাজ করার বিষয়েও একমত হয়েছেন দুই প্রধানমন্ত্রী।
তারেক রহমান বৈঠকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরপরই জাপানের স্বীকৃতি এবং দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের উন্নয়নে দেশটির সহযোগিতার কথা স্মরণ করেন। বাংলাদেশের জনগণের কাছে জাপান একটি বিশেষ অংশীদার বলেও উল্লেখ করেন তিনি। দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।
বৈঠকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হয়। উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, অপহরণসংক্রান্ত সমস্যা এবং মিয়ানমারের পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময় করেন দুই নেতা। জাতিসংঘেও পারস্পরিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিষয়ে তাঁরা একমত হন।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী জানান, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের উদ্যোগের মাধ্যমে দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী করা হবে। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও অভিন্ন সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠায় তারেক রহমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার প্রত্যয়ও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর
জাতীয় এর সর্বশেষ খবর