বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সৌরির রহস্যজনক মৃত্যু ঘিরে নতুন প্রশ্ন তুলেছেন তার বাবা এ কে এম এনায়েতুল করিম। তার দাবি, তাহসিফ একজন দক্ষ সাঁতারু ছিলেন। পাইলট হিসেবে প্রশিক্ষণের সময় সাঁতারের বিশেষ কোর্স সম্পন্ন করে সনদও পেয়েছিলেন তিনি। ফলে ধাওয়ার মুখে তাহসিফের নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার যে দাবি তার বন্ধু দীপ করেছেন, তা মানতে নারাজ বাবা। তার আশঙ্কা, প্রকৃত ঘটনা আড়াল করে তদন্ত ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) পিবিআইয়ের জিজ্ঞাসাবাদে শাহরিয়ার রেজা দীপের দেওয়া বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে গণমাধ্যমকে এসব কথা বলেন তাহসিফের বাবা।
তিনি বলেন, ‘না না, এ ধরনের কিছু হতে পারে না। কেন তাকে ধাওয়া দিতে যাবে? এগুলো বাজে কথা, প্রশ্নই আসে না। আমার ছেলে সাঁতার জানত। ও তো পাইলট। ওদের সুইমিংয়ের কোর্স করা এবং তার ওপর সার্টিফিকেট আছে। সাঁতারের ওপর বড় ধরনের কোর্স করা আছে আমার ছেলের।’
ঘটনা আড়াল কিংবা ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা করছেন কি না, এমন প্রশ্নে এনায়েতুল করিম বলেন, ‘স্বাভাবিকভাবে তো এটাই মনে হয়। ওকে ধাওয়া দেবে কেন লোকজন? ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। বিষয়টিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা চলছে বলে আমার মনে হচ্ছে।’
তাহসিফ নিখোঁজ হওয়ার আগে তার ‘ছোট ভাই’ হিসেবে পরিচিত শাহরিয়ার রেজা দীপের ডাকে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) রাতে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয় পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তর। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাতভর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ সুপার জানান, জিজ্ঞাসাবাদে দীপ দাবি করেছেন, ঘটনার সময় তারা তুরাগ নদের পাড়ে কথা বলছিলেন। হঠাৎ কয়েকজন ব্যক্তি তাদের ধাওয়া করেন। এ সময় তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন এবং তিনি পালিয়ে আসেন।
তবে দীপের এই দাবির সত্যতা এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি তদন্তকারী সংস্থা।
পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক মোস্তফা কামাল জানিয়েছেন, দীপকে হেফাজতে নেওয়ার পর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তদন্তের স্বার্থে এখনই সেগুলো প্রকাশ করা হচ্ছে না।
এদিকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধারের স্থান থেকে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে টঙ্গী পশ্চিম থানার মাজার বস্তি এলাকায় নম্বরপ্লেটবিহীন একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করেছে পিবিআই।
পিবিআই সদর দপ্তরের পুলিশ সুপার আবু ইউসুফ জানান, তুরাগ নদ থেকে আনুমানিক ৫০ গজ দূরে মোটরসাইকেলটি পাওয়া গেছে। এটি তাহসিফের কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট এক পুলিশ সুপারের ভাষ্য অনুযায়ী, দীপের দেখানো স্থান থেকেই মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়। নম্বরপ্লেট না থাকায় এর মালিকানা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
তবে সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, নিখোঁজ হওয়ার দিন তাহসিফও নম্বরপ্লেটবিহীন একটি মোটরসাইকেল নিয়ে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন।
তাহসিফের বাবা জানান, মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় দীপের ফোন পেয়ে বাসা থেকে বের হন তার ছেলে। ওই দিন রাত ১টা ৩৫ মিনিটের দিকে মায়ের মোবাইলে একটি বার্তা পাঠিয়ে জানান, তিনি বাসায় ফিরছেন।
তবে বার্তাটি দেখে তাহসিফকে ব্যস্ত মনে হয়েছিল বলে জানান তার বাবা। এরপর থেকেই তার সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
পরদিন বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর উত্তরখান থানার অধীন তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
অন্যদিকে মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়েছে টঙ্গী পশ্চিম থানার মাজার বস্তি এলাকা থেকে। দুটি স্থানই তুরাগ নদের সঙ্গে সংযুক্ত।
তাহসিফের মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড বলে সন্দেহ করছেন তার বাবা। প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে প্রশাসন ও সরকারের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন তিনি।
এদিকে পিবিআই ঢাকা মেট্রো উত্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ এনায়েত হোসেন মান্নান জানিয়েছেন, দীপকে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন তদন্তকারীরা। তার দেওয়া তথ্যও যাচাই করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘তারা কেন সেখানে গিয়েছিলেন; তাকে কেউ হত্যা করেছে নাকি দুর্ঘটনা নাকি আত্মহত্যা—এসব প্রশ্নের উত্তর আমরা খুঁজছি। এখন পর্যন্ত যেসব উত্তর পাওয়া গেছে, সেগুলো যাচাই করা প্রয়োজন।’
তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না বলেও জানান তিনি।
তাহসিফের মৃত্যু ঘিরে পরিবারের অভিযোগ, দীপের বক্তব্য এবং উদ্ধার হওয়া আলামত এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। তবে কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছে, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর
জাতীয় এর সর্বশেষ খবর