সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘কোরিয়ান গ্লাস স্কিন’ কিংবা উজ্জ্বল, মসৃণ ত্বক পাওয়ার নানা কৌশল প্রায়ই ভাইরাল হয়। এসব ভিডিও দেখে অনেকে নতুন নতুন প্রসাধনী ব্যবহার করেন, কেউ আবার একসঙ্গে একাধিক উপাদান দিয়ে শুরু করেন ত্বকের পরিচর্যা। কিন্তু জনপ্রিয় কোনো ভিডিওতে দেখানো পদ্ধতি সবার ত্বকের জন্য উপযোগী নাও হতে পারে। ভুল পণ্য বা অতিরিক্ত উপাদান ব্যবহারে ত্বকে জ্বালাপোড়া, শুষ্কতা ও ব্রণের সমস্যা বাড়তে পারে।
বিশেষ করে জেনারেশন জি বা জেন জি প্রজন্মের তরুণ-তরুণীদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সৌন্দর্যচর্চার নানা প্রবণতা পরিচিত। তবে সুন্দর ত্বকের জন্য দামি প্রসাধনী কিংবা দীর্ঘ স্কিনকেয়ার রুটিনই একমাত্র উপায় নয়। ত্বকের ধরন বুঝে নিয়মিত ও উপযুক্ত পরিচর্যাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্রের আমেরিকান একাডেমি অব ডার্মাটোলজির (এএডি) পরামর্শ অনুযায়ী, ত্বকের যত্নে কয়েকটি সাধারণ ভুল এড়িয়ে চলা জরুরি।
১. ভাইরাল ভিডিও দেখেই প্রসাধনী ব্যবহার নয়
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো প্রসাধনী বা স্কিনকেয়ার পদ্ধতি জনপ্রিয় হলেই তা সবার জন্য কার্যকর হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। একজনের ত্বকে যে পণ্য ভালো কাজ করছে, অন্যের ত্বকে সেটি জ্বালাপোড়া বা অস্বস্তির কারণ হতে পারে।
ত্বকের ধরন, সংবেদনশীলতা এবং বিদ্যমান সমস্যার ওপর নির্ভর করে পরিচর্যার পদ্ধতি নির্বাচন করা উচিত। বিশেষ করে নতুন কোনো পণ্য ব্যবহারের আগে তার উপাদান ও ব্যবহারের নির্দেশনা জেনে নেওয়া প্রয়োজন। কোনো পণ্য ব্যবহারের পর ত্বকে অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিলে সেটি ব্যবহার বন্ধ করে প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
মনে রাখতে হবে, ‘গ্লাস স্কিন’ পাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া ভিডিও কোনো চিকিৎসাবিষয়ক প্রমাণের বিকল্প নয়।

২. বারবার মুখ ধুলেই কি কমবে তেল ও ব্রণ?
ত্বক তৈলাক্ত হলে অনেকেই বারবার মুখ ধুয়ে ফেলেন। তাঁদের ধারণা, এতে ত্বকের অতিরিক্ত তেল দূর হবে এবং ব্রণ কমবে। কিন্তু অতিরিক্ত মুখ ধোয়া, শক্তিশালী ক্লিনজার ব্যবহার কিংবা জোরে ঘষে ত্বক পরিষ্কার করা উল্টো জ্বালাপোড়া বাড়াতে পারে।
আমেরিকান একাডেমি অব ডার্মাটোলজির পরামর্শ হলো, সাধারণভাবে দিনে দুবার—সকালে ও রাতে—মৃদু ক্লিনজার দিয়ে মুখ ধোয়া যেতে পারে। অতিরিক্ত ঘাম হলে তখনও মুখ পরিষ্কার করা প্রয়োজন হতে পারে।
মুখ ধোয়ার সময় আঙুলের ডগা দিয়ে আলতোভাবে ক্লিনজার ব্যবহার করা ভালো। স্ক্রাব, শক্ত ব্রাশ কিংবা অন্য কোনো উপকরণ দিয়ে অতিরিক্ত ঘষাঘষি না করাই ভালো। ত্বক তৈলাক্ত হলেও উপযুক্ত ময়েশ্চারাইজার ব্যবহারের প্রয়োজন থাকতে পারে।
৩. ভিটামিন সি, রেটিনল ও অ্যাসিড একসঙ্গে ব্যবহারে সতর্কতা
ত্বকের যত্নে ভিটামিন সি, রেটিনল এবং এক্সফোলিয়েটিং অ্যাসিডযুক্ত পণ্যের ব্যবহার বেশ পরিচিত। তবে একসঙ্গে অনেকগুলো সক্রিয় উপাদান ব্যবহার করা কিংবা ঘন ঘন প্রয়োগ করার ফলে ত্বকে জ্বালাপোড়া, শুষ্কতা, লালচে ভাব ও খোসা ওঠার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
এ কারণে সব উপাদান একসঙ্গে ব্যবহার শুরু না করে প্রয়োজন অনুযায়ী ধীরে ধীরে পরিচর্যার রুটিন তৈরি করা ভালো। কোনো উপাদান কত ঘন ঘন ব্যবহার করতে হবে, তা পণ্যের ধরন, ঘনত্ব এবং ত্বকের সহনশীলতার ওপর নির্ভর করে।
একটি পণ্য ব্যবহারে ত্বকে অস্বস্তি দেখা দিলে একই সময়ে আরও নতুন পণ্য যোগ না করাই ভালো। সমস্যা স্থায়ী হলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
৪. ব্রণ খোঁটাখুঁটি করলে বাড়তে পারে দাগের ঝুঁকি
মুখে ব্রণ দেখা দিলে তা নখ দিয়ে খোঁটা বা চেপে বের করার অভ্যাস অনেকেরই রয়েছে। কিন্তু এতে ব্রণ সেরে উঠতে বেশি সময় লাগতে পারে। পাশাপাশি প্রদাহ বাড়া, কালচে দাগ তৈরি হওয়া এবং স্থায়ী ক্ষতচিহ্নের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
ব্রণ হলে বারবার হাত দেওয়া বা চেপে ধরার পরিবর্তে উপযুক্ত পরিচর্যা করা জরুরি। ব্রণ দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে, ব্যথাযুক্ত গুটি তৈরি হলে কিংবা দাগ পড়তে শুরু করলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা নিলে ব্রণ নিয়ন্ত্রণ এবং দাগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
৫. শুধু গরমকালে নয়, সানস্ক্রিন ব্যবহারের গুরুত্ব সারা বছর
অনেকে মনে করেন, সানস্ক্রিন শুধু গরমের দিনেই ব্যবহার করতে হয়। বাস্তবে দিনের বেলায় বাইরে থাকলে সারা বছরই সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি থেকে ত্বক সুরক্ষিত রাখা গুরুত্বপূর্ণ। মেঘলা দিনেও অতিবেগুনি রশ্মির সংস্পর্শে আসার আশঙ্কা থাকে।
আমেরিকান একাডেমি অব ডার্মাটোলজি বাইরে যাওয়ার সময় ব্রড-স্পেকট্রাম, এসপিএফ ৩০ বা তার বেশি এবং সম্ভব হলে পানি প্রতিরোধী সানস্ক্রিন ব্যবহারের পরামর্শ দেয়। দীর্ঘ সময় বাইরে থাকলে পণ্যের নির্দেশনা অনুযায়ী সাধারণত প্রতি দুই ঘণ্টা পরপর এবং ঘামলে বা পানির সংস্পর্শে এলে প্রয়োজনমতো আবার সানস্ক্রিন লাগাতে হয়।
তবে সানস্ক্রিনই একমাত্র সুরক্ষা নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী ছায়ায় থাকা, সুরক্ষামূলক পোশাক পরা এবং প্রখর রোদ এড়িয়ে চলাও গুরুত্বপূর্ণ।

ত্বকের যত্নে সহজ রুটিনই হতে পারে কার্যকর
সুস্থ ত্বকের জন্য অনেক প্রসাধনী ব্যবহার করতেই হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। বরং মৃদু ক্লিনজার, ত্বকের উপযোগী ময়েশ্চারাইজার এবং দিনের বেলায় উপযুক্ত সানস্ক্রিন দিয়ে সহজ একটি রুটিন শুরু করা যেতে পারে। নির্দিষ্ট সমস্যা থাকলে তার উপযোগী পণ্য বেছে নেওয়া উচিত।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে নতুন কিছু জানার সুযোগ থাকলেও ত্বকের চিকিৎসাসংক্রান্ত পরামর্শ গ্রহণের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি। ভাইরাল ভিডিও অনুসরণ করে একের পর এক পণ্য ব্যবহার না করে নিজের ত্বকের প্রয়োজন বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়াই ভালো। আর ত্বকে দীর্ঘস্থায়ী জ্বালাপোড়া, অ্যালার্জি বা গুরুতর ব্রণের সমস্যা দেখা দিলে নিজে নিজে পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
বাপ্পি/সা.এ
সর্বশেষ খবর