নদী শুকিয়ে গেলে শুধু পানির প্রবাহ থেমে যায় না, থমকে যায় একটি অঞ্চলের জীবন-জীবিকা, মৎস্যসম্পদ, কৃষি ও নৌ-অর্থনীতি। নেত্রকোনার হাওরবেষ্টিত খালিয়াজুরী উপজেলার ধনু নদীকে ঘিরে এখন দেখা দিয়েছে এমন আশঙ্কা। নদীর বিভিন্ন স্থানে অবৈধ মাছের ঘের, বাঁশের বেড়া, নিষিদ্ধ মাছ ধরার ফাঁদ, অবৈধ বালু উত্তোলন ও চাঁদাবাজির অভিযোগ নদীটির স্বাভাবিক প্রবাহ ও পরিবেশকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে হাজারো জেলে, কৃষক, নৌযান শ্রমিক ও হাওরবাসীর জীবন-জীবিকায়।
নদী রক্ষায় প্রশাসনের অভিযান শুরু হলেও সংশ্লিষ্টদের মতে, বিচ্ছিন্ন অভিযান দিয়ে ধনু নদীর সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, মাছের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র, কৃষির পানি ব্যবস্থাপনা এবং নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
নদী ও জলাভূমির বিস্তৃত সংযোগ
খালিয়াজুরী উপজেলার নদী ব্যবস্থার মধ্যে ধনু নদী অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় ধনু নদীর দৈর্ঘ্য ৫৫ কিলোমিটার, মরা ধনু ৩ দশমিক ৬০ কিলোমিটার, পুরাতন সুরমা ৩২ কিলোমিটার এবং পিয়াইন নদী ২২ কিলোমিটার। এসব নদী ও শাখা জলপ্রবাহ হাওরের পানি চলাচল, মাছের বিচরণ এবং নৌ-যোগাযোগের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
মাছের প্রজনন ও জীববৈচিত্র্যে ঝুঁকি
হাওরের মৎস্যসম্পদ টিকিয়ে রাখতে নদী, বিল, খাল ও প্লাবনভূমির স্বাভাবিক সংযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্ষা ও প্রাক্বর্ষা মৌসুমে নদী থেকে মাছ বিল-হাওরে যায়, আবার পানি কমলে নদীতে ফিরে আসে। এই স্বাভাবিক চলাচলের মধ্য দিয়েই মাছের খাদ্য গ্রহণ, প্রজনন ও বংশবিস্তার সম্পন্ন হয়।
বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের ২০১৭ সালের Impact Assessment of Structural Interventions in Haor Ecosystem and Innovations for Solution শীর্ষক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে হাওরের মাছের বৈচিত্র্য কমে যাওয়ার পেছনে আবাসস্থল সংকোচন, পানিদূষণ, অপরিকল্পিত মৎস্য ব্যবস্থাপনা, ক্ষতিকর মাছ ধরার সরঞ্জাম ব্যবহার, পোনা ও প্রজননক্ষম মাছ আহরণ এবং জলাশয় সম্পূর্ণ শুকিয়ে মাছ ধরার মতো কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে।
ধনু নদীতে বাঁশের বেড়া দিয়ে মাছের ঘের তৈরি, ভীম জাল স্থাপন এবং পানির প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হলে একই ধরনের পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে মাছের প্রজনন মৌসুমে চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে দীর্ঘমেয়াদে মাছের উৎপাদন ও প্রজাতির বৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর প্রভাব পড়তে পারে বোয়াল, আইড়, চিতল, বাগাড়, শোল, রুই ও কাতলাসহ দেশীয় মাছের ওপর।
অভিযান চলছে, প্রয়োজন স্থায়ী নজরদারি
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬ সালের জুন থেকে ধনু নদীতে অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযান পরিচালিত হয়েছে। চাঁদাবাজির অভিযোগে দুটি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। অবৈধ ঘের উচ্ছেদে ছয়টি অভিযান চালানো হয়েছে। বাঁধ কাটার অভিযোগে চারটি অভিযানে ৬৫ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। এ ছাড়া আটটি অবৈধ জাল জব্দ করা হয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য চার লাখ টাকার বেশি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অলিদুজ্জামান জানিয়েছেন, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, নৌ-চলাচল ও জনস্বার্থ রক্ষায় এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
কৃষি ও নৌ-অর্থনীতির প্রাণ ধনু নদী
খালিয়াজুরীর অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি বোরো ধান। হাওরের কৃষি উৎপাদন অনেকাংশে নদী, খাল ও বিলের পানি প্রবাহ এবং সময়মতো পানি নিষ্কাশনের ওপর নির্ভরশীল। নদীর তলদেশে পলি জমা, খালের মুখ বন্ধ, অবৈধ বাঁধ কিংবা পানি চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলে বর্ষায় জলাবদ্ধতা বাড়তে পারে। অন্যদিকে শুকনো মৌসুমে সেচের পানির সংকট দেখা দিতে পারে।
ধনু নদী হাওরাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথও। কৃষিপণ্য, ধান, মাছ ও অন্যান্য পণ্য পরিবহনে এ নদীর ভূমিকা রয়েছে। বিভিন্ন স্থানে অবৈধ ঘের, বাঁশের বেড়া ও জাল বসানো হলে নৌযান চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। বাড়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি, পরিবহন ব্যয় ও সময়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হন নৌযানের মালিক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ যাত্রীরা।
নদীর নাব্যতা ও প্রবাহ সচল রাখা গেলে সারা বছর নৌ-যোগাযোগের সুযোগ বাড়বে। কম খরচে কৃষিপণ্য ও মৎস্যসম্পদ পরিবহন সম্ভব হবে। পাশাপাশি নদীকেন্দ্রিক বাজার, কর্মসংস্থান ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটতে পারে।
আইনের প্রয়োগে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
দেশে নদী ও অভ্যন্তরীণ জলাশয়ের মৎস্যসম্পদ রক্ষায় আইন ও বিধিমালা রয়েছে। মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ আইন, ১৯৫০ এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালায় নিষিদ্ধ সরঞ্জাম, মাছ ধরার পদ্ধতি ও নির্দিষ্ট মৌসুমে মাছ আহরণ নিয়ন্ত্রণের বিধান রয়েছে।
তবে আইন কার্যকর করতে উপজেলা প্রশাসনের পাশাপাশি মৎস্য অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড, পরিবেশ অধিদপ্তর, নৌ-পুলিশ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। নদীর সীমানা নির্ধারণ, অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিতকরণ, নিয়মিত নজরদারি এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
নদী রক্ষায় পাঁচ দফা করণীয়
১. সীমানা নির্ধারণ ও দখলমুক্তকরণ: সরকারি নকশা ও জরিপের ভিত্তিতে নদীর প্রকৃত সীমানা চিহ্নিত করে অবৈধ দখল, ঘের ও স্থায়ী প্রতিবন্ধকতা উচ্ছেদ।
২. মৎস্য অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠা: মাছের প্রজনন ও পোনা বেড়ে ওঠার উপযোগী স্থান চিহ্নিত করে বিজ্ঞানভিত্তিক অভয়াশ্রম গড়ে তোলা এবং প্রজনন মৌসুমে মাছ আহরণ নিয়ন্ত্রণ।
৩. নিষিদ্ধ জাল ও ফাঁদ বন্ধ: ভীম জালসহ ক্ষতিকর ও নিষিদ্ধ মাছ ধরার সরঞ্জামের ব্যবহার, উৎপাদন ও বিপণন বন্ধে নিয়মিত অভিযান।
৪. বালু উত্তোলন ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ: পরিবেশ ও নৌপথের ক্ষতিকর অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ এবং চাঁদাবাজির অভিযোগ তদন্ত করে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা।
৫. স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ: জেলে, কৃষক, মৎস্যজীবী, জনপ্রতিনিধি ও পরিবেশকর্মীদের নিয়ে নদী রক্ষা কমিটি গঠন। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত জেলে পরিবারকে বিকল্প কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনা।
ধনু নদী বাঁচলে খুলবে সম্ভাবনার দুয়ার
ধনু নদীকে পরিকল্পিতভাবে রক্ষা করা গেলে খালিয়াজুরীর হাওর অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র অক্ষুণ্ন থাকলে উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছের উৎপাদন বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে। এতে জেলে পরিবারগুলোর আয় বৃদ্ধি, মাছের বাজার সম্প্রসারণ ও স্থানীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
একই সঙ্গে নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা গেলে কৃষিপণ্য পরিবহন সহজ হবে, নৌপথে যাতায়াত নিরাপদ হবে এবং হাওরের পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার উন্নতি ঘটবে। পরিকল্পিত মৎস্য অভয়াশ্রম, পরিবেশবান্ধব পর্যটন ও নদীকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যের বিকাশও স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
গণমাধ্যমকর্মী ও পরিবেশকর্মী শামছুল হক বলেন, ধনু নদীকে কেন্দ্র করে অবৈধ কর্মকাণ্ড বন্ধ করা গেলে হাওরাঞ্চলের মানুষের যাতায়াত, মৎস্য আহরণ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও নিরাপদ ও স্বাভাবিক হবে। তবে শুধু অভিযান নয়, নদীটির দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষায় কার্যকর পরিকল্পনা ও নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন।
নদী ও পরিবেশসংশ্লিষ্ট সচেতন মহলের মতে, ধনু নদীকে রক্ষা করা মানে শুধু একটি নদীকে বাঁচানো নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাওরের মৎস্যসম্পদ, জীববৈচিত্র্য, কৃষি উৎপাদন, নৌ-যোগাযোগ এবং হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকা। তাই বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, ধনু নদী রক্ষায় প্রয়োজন স্থায়ী ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা।
নদী বাঁচলে মাছ বাঁচবে, মাছ বাঁচলে জেলে বাঁচবে; সচল থাকবে হাওরের কৃষি, যোগাযোগ ও অর্থনীতি। ধনু নদী রক্ষার উদ্যোগকে সাময়িক অভিযান থেকে দীর্ঘমেয়াদি নদী ও মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনায় রূপ দেওয়াই এখন সময়ের দাবি।
সাজু/নিএ
সর্বশেষ খবর
এক্সক্লুসিভ এর সর্বশেষ খবর